“আজকের পৃথিবীতে সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোনো সংবাদপত্র নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মুহূর্তের মধ্যে হাজারো তথ্য মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু তথ্য আর সংবাদ এক জিনিস নয়। গুজব, অপপ্রচার, অর্ধসত্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার ভিড়ে একটি দায়িত্বশীল সংবাদপত্রের কাজ হলো সত্যকে যাচাই করে পাঠকের সামনে তুলে ধরা।”
একটি সংবাদপত্রের জন্ম কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের আত্মপ্রকাশ নয়; এটি একটি অঞ্চলের বিবেকের নতুন কণ্ঠস্বরের জন্ম। একটি সংবাদপত্র যখন প্রথম বর্ষ অতিক্রম করে, তখন আনন্দের পাশাপাশি আত্মসমালোচনারও সময় আসে। কারণ সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে গতকালের সাফল্য আজকের যোগ্যতার প্রমাণ নয়। প্রতিদিনই নতুন করে বিশ্বাস অর্জন করতে হয়।
‘দৈনিক খুলনা গেজেট’ ২০২০ সালের ১৩ জুলাই অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট (প্রিন্ট সংস্করণের সূচনা-তারিখ অনুযায়ী) মুদ্রিত সংবাদপত্র হিসেবে পথচলা শুরু করে। প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে তাই অভিনন্দনের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আনা জরুরি। কারণ গঠনমূলক সমালোচনাই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত বন্ধু।
দৈনিক খুলনা গেজেট পাঁচ বছর অনলাইন ও এক বছর প্রিন্ট আকারে প্রকাশিত হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তার বয়স ছয় বছর হয়ে গেল। এই ছয় বছরের শিশুটি নিজের পায়ে ভর দিয়ে চলতে শিখেছে। নিজের কথা নিজে সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে পেরেছে। তথাকথিত সংবাদপত্রের কলঙ্কের কালিমা এখনও তার গায়ে স্পর্শ করতে পারেনি। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করার পথে হাঁটিহাঁটি পাপা করে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে। একটি সংবাদপত্রের সকল দিকে নজর রেখে আদর্শ সংবাদপত্র হিসেবে নিজের আসন তৈরি করার চেষ্টায় আছে। দৈনিক খুলনা গেজেট এর প্রতিষ্ঠাতা, সম্পাদক, সংবাদকর্মী, কলাকুশলীগণ এভাবে এগিয়ে গেলে হয়ত একদিন তারা খুলনার গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে।
অনলাইনে খুলনা গেজেট প্রতি মিনিটের সকল গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ আপলোড করতে সক্ষম হয়েছে। তাছাড়া কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সরাসরি ভিডিও চিত্র প্রচার করে থাকে। অনলাইনের এসব প্রচার প্রচারণা একটি সংবাদপত্রকে আরও সমৃদ্ধ করে এবং সমগ্র বিশ্বে তাৎক্ষণিকভাবে সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দেয়। সাথে সাথে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
আজকের পৃথিবীতে সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী আর অন্য কোনো সংবাদপত্র নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মুহূর্তের মধ্যে হাজারো তথ্য মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু তথ্য আর সংবাদ এক জিনিস নয়। গুজব, অপপ্রচার, অর্ধসত্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার ভিড়ে একটি দায়িত্বশীল সংবাদপত্রের কাজ হলো সত্যকে যাচাই করে পাঠকের সামনে তুলে ধরা।
দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু স্থানীয় পত্রিকা সংবাদকে জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করে। কখনো বিজ্ঞাপনের চাপে, কখনো রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে, আবার কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানে সংবাদ পরিবেশনের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে পাঠকের আস্থা কমে যায়। সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ কাগজ, মুদ্রণযন্ত্র কিংবা অফিস নয়— পাঠকের বিশ্বাস।
আরও একটি বড় সংকট হলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অভাব। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংবাদ সীমাবদ্ধ থাকে অনুষ্ঠান, শুভেচ্ছা, ছবি কিংবা প্রেস বিজ্ঞপ্তিকেন্দ্রিক প্রতিবেদনে। অথচ সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন আসে দুর্নীতি, অনিয়ম, পরিবেশ ধ্বংস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, নদী, জলবায়ু, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের গভীরে পৌঁছানো প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
খুলনা অঞ্চল সম্ভাবনার এক বিশাল ভাণ্ডার। সুন্দরবন, উপকূল, নদী, চিংড়ি শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পর্যটন, জলবায়ু পরিবর্তন এসব বিষয় শুধু স্থানীয় নয়; আন্তর্জাতিক গুরুত্বও বহন করে। একটি দূরদর্শী আঞ্চলিক সংবাদপত্র এসব বিষয়কে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরতে পারে।
শিক্ষা নিয়েও সংবাদপত্রের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বিদ্যালয়ের সাফল্যের খবর যেমন প্রকাশ করা উচিত, তেমনি শিক্ষার মান, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষক সংকট, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়েও নিয়মিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। কারণ একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে।
সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতা হওয়া উচিত সমাজের চিন্তার কেন্দ্র। ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা, গবেষণামূলক লেখা, তরুণ লেখকদের সুযোগ এবং স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ একটি পত্রিকাকে দীর্ঘস্থায়ী মর্যাদা এনে দেয়।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিও অপরিহার্য। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় সত্যতা যাচাই যেন কখনো বিসর্জন না পায়। ভুল হলে তা স্বীকার করার সাহসও একটি সংবাদপত্রের মর্যাদা বাড়ায়।
প্রথম বর্ষপূর্তি তাই শুধু উৎসবের উপলক্ষ নয়; এটি নতুন শপথের সময়। শপথ হোক সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে এবং উন্নয়নের পক্ষে। সংবাদপত্র কখনো ক্ষমতার মুখপাত্র হবে না; আবার অকারণ বিরোধিতারও আশ্রয় নেবে না। তার একমাত্র পক্ষ হবে সত্য ও জনস্বার্থ।
আমরা প্রত্যাশা করি, ‘দৈনিক খুলনা গেজেট’ আগামী দিনে এমন একটি সংবাদপত্রে পরিণত হবে, যার প্রতিবেদন শুধু খুলনায় নয়, সমগ্র বাংলাদেশে আলোচনার জন্ম দেবে। যে পত্রিকা সাধারণ মানুষের ভাষা বলবে, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হবে এবং সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজকে আরও আলোকিত করবে।
প্রথম বর্ষপূর্তিতে রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা। একই সঙ্গে রইল এই বিশ্বাস সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা নয়, সত্যের কাছাকাছি থাকা।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা।
খুলনা গেজেট/এএজে

