সোমবার । ১লা জুন, ২০২৬ । ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
সৎ বাবাকে আসামি করে মামলা

ক্ষোভ ও অপমানের প্রতিশোধ নিতে শাশুড়ি ও দুই শিশুকে খুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্ত্রীর প্রথম সংসারের দুই সন্তানকে মেনে নিতে না পারা, শাশুড়ি ও সন্তানদের সঙ্গে ঝগড়া এবং অপমানের প্রতিশোধ নিতেই খুলনায় একই পরিবারের তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে শিশুদের সৎ বাবা রফিকুল হাওলাদার পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ।

গত শনিবার বিকালে নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার দারুল আমান মসজিদ রোড এরাকার একটি ভাড়া বাড়ি থেকে বেবী বেগম (৬২), শামীম (১৩) ও মুস্তাকিম (৪) নামে তিন জনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর মধ্যে দুই ভাই শামীম ও মুস্তাকিমকে শ্বাসরোধ করে এবং তাদের নানী বেবী বেগমকে গলাকেটে হত্যাকরা হয়। মা বেবী বেগম ও দুই সন্তানকে নিয়ে সোনাডাঙ্গার ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন ফাতেমা বেগম মেরি নামের একটি নারী।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শিশু দুটির প্রথম বাবা মাসুম ব্যাপারী বাদি হয়ে রফিকুল হাওলাদারকে আসামি করে সোনাডাঙ্গা থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সন্তানদের মা ফাতেমা বেগম মেরিকে হেফাজতে নিয়েছে।

পরিবারের সদস্য, পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, চার বছর আগে প্রথম স্বামী মাসুম ব্যাপারীর সঙ্গে ডিভোর্স হয় ফাতেমা বেগম মেরীর। প্রথম স্বামীর দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে সোনাডাঙ্গার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন মেরি। কিছুদিন পর মেরী নগরীর মানিকতলা এলাকার বাসিন্দা ট্রাক চালক রফিকুল হাওদারকে বিয়ে করেন। কিন্তু তার বিয়ে বা বেবী বেগম ও বড় সন্তান মেনে নিতে পারেননি।

মেরীর দ্বিতীয় স্বামী রফিকুল হাওলাদার মাঝে মাঝে ওই বাড়িতে যেতেন। এনিয়ে বেবী বেগম ও বড় সন্তান শামীমের সঙ্গে প্রায় ঝগড়া হতো মেরী ও রফিকুলের। গত বৃহস্পতিবার রাতে রফিকুল ওই বাড়িতে গেলে আবারও তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। রাত ১২টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় রফিকুল। শুক্রবার সকালে আবার তিনি ওই বাড়িতে ফিরে আসেন।

ফাতেমা বেগম মেরির উদ্বৃতি দিয়ে পুলিশ জানায়, শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে ঘুম থেকে উঠে মেরি দেখেন তার শোবার ঘরে বাইরে থেকে তালা দেওয়া। তখন দরজায় ধাক্কাধাক্কি করলে রফিকুল দরজার তালা খুলে দেয়। তিনি মেরীকে জানান, সকালে তিনি বাড়িতে প্রবেশ করে দেখতে পান তার মা, দুই সন্তানকে নিয়ে বাইরে বেড়াতে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় তার ঘর ও নাতীদের ঘরে তালা মেরে গেছেন।

দুপুরের পরও তারা না ফেরায় মেরি ও রফিকুল আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে খোঁজাখুজি করেন এবং পরদিন কবিরাজের কাছে গিয়ে সন্ধানের চেষ্টা করবেন বলে আলোচনা করেন। মেরী কয়েকবার দরজার তালা ভাঙতে গেলে রফিকুল বাঁধা দেয়। তিনি সে বলে, ‘ওরা তো ফিরে আসবে তালা ভেঙে কি করবে ?’

এভাবে শুক্রবার রাতে তারা স্বামী-স্ত্রী পাশের ঘরে ঘুমিয়ে দিল। শনিবার দুপুরেও তারা একসঙ্গে খাবার খায়। বিকালে মেরীর এক খালা রেনু বেগম বোনকে দেখতে ওই বাড়িতে আসে। ঘটনা শুনে তিনি বোনের ঘরের তালা ভাঙতে গেলে পচা গন্ধ পান। তখন রফিক দরজার তালা কাটতে হেক্সো ব্লেড কেনার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে পালিয়ে যায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সোনাডাঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) অনিমেষ মন্ডল জানান, স্থানীয়দের সহযোগিতায় দরজা ভেঙে খাটের নিচ থেকে বেবী বেগমের এবং ট্রাংকের ওপরে শামীমের মরদেহ দেখতে পেয়ে তারা পুলিশকে খবর দেয়। তখন পুলিশ ও সিআইডির একটি টিম ঘরের ওয়ারড্রব থেকে মুস্তাকিমের লাশ উদ্ধার। রোববার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ট্রাক চালক রফিকের বিরুদ্ধে এর আগে থানায় একটি চুরির মামলা রয়েছে। মেরী বেগম ও রফিক মাদকাসক্ত। শুক্রবারও তারা একসঙ্গে নেশা করেন। বৃহস্পতিবার রাতে নেশার কারণে শব্দ হলেও মেরী কিছু টের পাননি।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, লাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে ওই তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত রফিককে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাকে গ্রেপ্তার করলে জানা যাবে, হত্যাকাণ্ডের সময় অন্য কেউ উপস্থিত ছিল কি-না। জিজ্ঞাসাবাদের পর দুই সন্তানের মা মেরীকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তে তার সম্পৃক্ততা উঠে আসলে তাকেও এই মামলা গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন