স্বাধীনোত্তর কাল দেশের অর্থনীতিকে মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে সোনালী আঁশখ্যাত কাঁচা পাট। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবছর উদ্বৃত্ত প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার কাঁচাপাট বিদেশে রপ্তানি করা হয়। কাঁচা পাট রপ্তানির সাথে সংশ্লিষ্ট লক্ষাধিক শ্রমিক।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কাঁচা পাটকে শর্তযুক্ত রপ্তানি পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, বৃহত্তর ফরিদপুর, উত্তরবঙ্গসহ দেশের ছোট বড় ৪০টি জুট প্রেস হাউজ বন্ধ হয়ে যায়। কাঁচা পাট রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ে। এ কারণে কৃষকরাও উৎপাদিত পাটের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তাই নয় রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় কাঁচা পাট রপ্তানিকারকরও অসহায় হয়ে পড়েছে। গত ৯ মাসে শতাধিক রপ্তানিকারক গুদাম ও অফিস ভাড়া, ব্যাংক ঋণের সুদ, ইন্সুরেন্স, শ্রমিক, কর্মচারীদের বেতন/হাজিরা বহনে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
কাঁচা পাট রপ্তানির অন্যতম জোন খুলনার দৌলতপুর জুট প্রেস অ্যান্ড বেলিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের ৩৫ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক ৯ মাস যাবৎ পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে, অনাহারে, মানবেতর জীবন যাপন করছেন। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে রাজপথ অবরোধসহ টানা তিনদিন বিক্ষোভ মিছিলও করেছে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। সরকারের কাছে দাবি ঈদুল আযহার আগেই শ্রমিক পরিবারের পুনর্বাসন ও খোরপোশের ব্যবস্থা গ্রহণের।
দৌলতপুর জুট প্রেস এন্ড বেলিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের শ্রমিক উজ্জ্বল খাঁ খুলনা গেজেটকে বলেন, ‘আমাদের মা-বোনেরা আজ ক্ষুধার তাড়নায় রাজপথে নেমে এসেছে। অন্ন নেই, বস্ত্র নেই। কাজ করলে আমরা ভাত খাব, সন্তানেরা ভালো থাকবে। কাজ নেই, রিকশা ভ্যান চালিয়ে জীবন যাপন করা খুবই কষ্টের। আমরা এ দেশের নাগরিক আমাদের বাঁচার অধিকার আছে। আমরা বাঁচতে চাই। সন্তানেরা দু’মুঠো ভাত পাক এটা আমরা চাই। বিগত ৯ মাস হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। অর্ধাহারে, অনাহারে দিন যাপন করছে। কয়েকদিন পর ঈদুল আযহা। মন্ত্রী, এমপি মালিকরা আনন্দের সাথে ঈদ উদযাপন করবে। আর আমরা জুট প্রেসের হাজার হাজার শ্রমিক যারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি, এই পাটের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আনে। সেই শ্রমিকরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর অবহেলিত। এদের কোন নিরাপত্তা নেই, নেই কর্মের নিশ্চয়তা। বেঁচে থাকার মতো অবলম্বনও নেই। জুট প্রেস শ্রমিকদের দ্রুত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে, স্বাভাবিক কর্মচঞ্চল্য যাতে ফিরে আসে, শ্রমিকদের পেটে ভাতের ব্যবস্থা যাতে হয়, পরিবার-পরিজন নিয়ে যাতে সুন্দর ও সুস্থভাবে দিন যাপন করতে পারি সে ব্যবস্থা করার জন্য সরকার প্রধানের কাছে আমরা দাবি জানাচ্ছি।’
দৌলতপুর জুট প্রেস অ্যান্ড বেলিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি মোঃ শফিকুল ইসলাম মিঠু বলেন, ‘গত ১৫ মে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় থেকে যে প্রজ্ঞাপন দেয় তাতে শ্রমিকেরা হতাশ। বিপদগ্রস্তের স্থায়ী সংকেত দেখছে। এ কারণে কাঁচা পাট, কৃষক, শ্রমিক পরিবারকে বাঁচানোর এবং রেমিট্যান্স উদ্ধারের দাবিতে আমরা রাজপথে নেমেছি। বেসরকারি মিলে চাহিদা মিটিয়ে বাকী পাট বিদেশে রপ্তানি শর্ত মুক্তভাবে চালু করতে হবে। আমাদের যে কাজ এ পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে, ঈদের আগে সরকার থেকে শ্রমিকদের পরিবারের পুনর্বাসন ও খোরপোশের ব্যবস্থা করতে হবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে।’
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘একজন যোগ্য, শিল্প, কৃষক-শ্রমিক বান্ধব পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী দেন। যিনি আপনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারবে।’
কাঁচাপাট রপ্তানিকারকদের একমাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জুট আাসোসিয়েশন বিজেএ’র চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির বলেন, ‘বিদেশে কাঁচা পাট রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার পর দৌলতপুর অঞ্চলের ৩৫ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা নিজের ব্যবসায়ীক স্বার্থে বিজেএ’র সাথে কোনরূপ আলোচনা ছাড়াই বেসরকারি জুট মিলগুলোকে এককভাবে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কাঁচা পাটকে শর্তযুক্ত রপ্তানি পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। কৃষকের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতকল্পে, লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মচারীর কর্মসংস্থান রক্ষার্থে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ব্যাহত না হয়, সেই লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনা করে কাঁচা পাটকে শর্তযুক্ত রপ্তানি পণ্যের তালিকা থেকে অব্যাহতি প্রদানের মাধ্যমে রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় চালু করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাচ্ছি।
খুলনা গেজেট/এনএম

