আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-১ আসনে সম্মিলিত জাতীয় জোট মনোনীত প্রার্থী সুনীল শুভ রায় ১২ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইশতেহার ঘোষণা করেন।
এক সময়ের জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী নেতা সুনীল শুভ রায় এবার বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের হয়ে “মোমবাতি” প্রতীক নিয়ে খুলনা ১ আসনে (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার ১২ দফা ইশতেহার হলো-
১. একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করা হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরায়ণতা সম্পূর্ণ দূর করা হবে।
২. দাকোপ ও বটিয়াঘাটার সর্বস্তরের জনগণের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা এবং মৌলিক সকল অধিকার যথাযথভাবে উপভোগ করার নিশ্চয়তা বিধান করা হবে।
৩. দাকোপ ও বটিয়াঘাটাকে সম্পূর্ণভাবে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যু, দখলদারিত্ব এবং মাদকমুক্ত করা হবে।
৪. প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতার মাধ্যমে দাকোপ ও বটিয়াঘাটাকে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই মুক্ত এলাকায় পরিণত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।
৫. পর্যটন শিল্পের ব্যাপক বিকাশসহ পরিবেশগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে শিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয় বেকার সমস্যা দূর করতে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হবে।
৬. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন কল্পে পানখালি ও পোদ্দারগঞ্জ ঘাটে সেতু নির্মাণ সহ জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণের সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।
৭. নদী ভাঙ্গন রোধ করার স্থায়ী কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভরাট নদী বা খাল খনন করা সহ খননকৃত নদী বা খালের দুপাশে বনায়নের ব্যবস্থা ব্যবস্থা করা হবে। একই সাথে ওইসব স্থানে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীনদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। খননকৃত নদী বা খালের পানি কৃষি কাজে সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
৮. প্রয়োজন অনুসারে নতুন রাস্তা নির্মাণ ও পাকাকরণ করা হবে এবং বিদ্যমান সড়কের সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ নিশ্চিত করা হবে।
৯. যেসব এলাকায় সুপেয় পানীয় জলের অভাব রয়েছে সে সকল জায়গায় প্রকল্পের মাধ্যমে প্লান্ট নির্মাণ করে প্লান্ট থেকে পাইপের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে।
১০. শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই দুই উপজেলাতে একাধিক মাধ্যমিক স্কুল, মাদ্রাসা ও মহাবিদ্যালয় সরকারিকরণের উদ্যোগ নেয়া হবে। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে উপজেলার হাসপাতাল গুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং প্রতি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র স্থাপনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।
১১. দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় জনগণের সেবাদানকারী সকল অফিস দুর্নীতি মুক্ত করা হবে। জনগণ যাতে স্বাচ্ছন্দে তাদের নাগরিক সেবা গ্রহণ করতে পারেন তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১২. প্রতিবছর কমপক্ষ একবার এলাকাভিত্তিক কিংবা উপজেলা ভিত্তিক জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে ‘জনতার মুখোমুখি জনপ্রতিনিধি” শীর্ষক সমাবেশ আয়োজনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার আয়োজন থাকবে। সেখানে জনগণের অভিযোগ কিংবা দাবী দাওয়া উত্থাপনের সুযোগ থাকবে এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে জনসাধারণের বাস্তব ভিত্তিক পরামর্শ গ্রহণ করা হবে এবং তা বাস্তবায়ন করার ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
লিখিত বক্তব্যে সুনীল শুভ রায় বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি ৯৯ খুলনা-১ আসনে প্রার্থী হয়েছি। এর আগে দশম এবং একাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হয়ে এই আসনেই নির্বাচন করেছিলাম। কিন্তু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আমার বিরোধ সৃষ্টি হয়। পার্টির চেয়ারম্যান একক সিদ্ধান্তে তার নিজস্ব কিছু ব্যক্তির জন্য আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। আমি একক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচনের তিনদিন পর আমাকে জাতীয় পার্টি থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন।
তিনি বলেন, এরপর আমি জাতীয় পার্টিকে পুনর্গঠনের জন্য ২০২৪ সালের ৯ মার্চ তারিখে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করেছিলাম। কিন্তু বিগত সময়ের নির্বাচন কমিশন আমাদের কাউন্সিলকে স্বীকৃতি না দেওয়ায় আমরা সাংগঠনিকভাবে সফল হতে পারিনি। তারপর আমি রাজনীতি থেকে নিস্ক্রিয় ছিলাম। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সমাগত হলে আমার ঘনিষ্ঠ অনুসারী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী এবং ২০১৮ সালে যারা আমাকে ভোট দিয়ে সংসদে দেখতে চেয়েছিলন-সেই সব সম্মানিত ভোটার বৃন্দ আমাকে একান্তভাবে অনুরোধ করলেন, এবার যেন আমি এই নির্বাচনে প্রার্থী হই। আমার এলাকাবাসীর অনুরোধ আমি উপেক্ষা করতে পারিনি।
সুনীল শুভ রায় বলেন, আমি ২০১৭ সালে গঠিত ‘সম্মিলিত জাতীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছি। এই জোটে অন্তর্ভুক্ত দল বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের “মোমবাতি” প্রতীক নিয়ে খুলনা ১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। আমি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এই অঞ্চলের গণ মানুষকে নিয়ে রাজনীতি করেছি বলে এখানকার সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে আমি অবহিত আছি।
আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি আমার প্রণীত এই ১২ দফা কর্মসূচির বাস্তবায়নই হতে পারে দাকোপ ও বটিয়াঘাটার জনগণের সুখ, শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সমৃদ্ধির সোপান। আমার কর্মজীবনের দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর সময় কাটিয়েছি উন্নয়ন সমৃদ্ধি ও সংস্কারের কারিগর সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাথে। দেশ ও জনগণের উন্নয়নের পথ ও পরিকল্পনা প্রণয়নে এবং তা বাস্তবায়নের সম্যক ধারণা ও অভিজ্ঞতা আমি অর্জন করতে পেরেছি। সেগুলো একবার কাজে লাগাতে পারলে এই অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবে।
আমার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে নেয়ায় আছে অনেক কিছু। ২০১৮ সালের নির্বাচনে যে বিজয় হারিয়েছি এবার তা ফিরে পাওয়ার সুযোগ এসেছে। সেই সাথে গণতান্ত্রিক নব যাত্রায় যে অংশীদার হতে পারছি এটাও অনেক বড় পাওয়া। এই নির্বাচনে আমার মোমবাতি প্রতীক অনেক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। সব আলো যখন নিভে যায় তখন মোমবাতি জ্বালিয়ে অন্ধকার দূর করতে হয়। মোমবাতি নিজে জ্বালে জ্বলে নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত সে তার সাধ্য অনুসারে আলো দিয়ে যায়। আমিও তেমনি জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে নিজেকে উজাড় করে জনগণের সেবা দিয়ে যাবার অঙ্গীকার করছি।
খুলনা গেজেট/সাগর/এনএম

