রাত পোহালেই মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। আর কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে সাতক্ষীরাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাংসের স্বাদ বাড়াতে অপরিহার্য উপাদান ‘চুইঝাল’ কেনার ধুম পড়েছে।
ঈদুল আজহার পশু কোরবানির পর চুইঝাল ছাড়া মাংসের রান্নাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায় এ অঞ্চলের ভোজনরসিকদের কাছে। ফলে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরার বাজারগুলোতে এই বিশেষ মসলাজাতীয় উদ্ভিদের কদর ও চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। চাহিদা বাড়ার এই সুযোগে খুচরা ও পাইকারি বাজারে চুইঝালের দামও বেশ চড়া।
খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে চুইঝালের ঐতিহাসিক জনপ্রিয়তা থাকলেও বর্তমানে দেশের অন্যান্য জেলাতেও ঝাল ও সুগন্ধি হিসেবে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
ঈদের আগে সাতক্ষীরা শহরের ঐতিহ্যবাহী বড় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় ও মাঝারি বিভিন্ন আকারের চুইঝালের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। কোরবানির মাংসের স্বাদ ও সুঘ্রাণ দ্বিগুণ করতে দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। সাধারণ সময়ে বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি চুইঝাল ৪০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হলেও, এখন আকার ও মান অনুযায়ী তা ৮০০ থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
শহরের রাজার বাগান এলাকা থেকে বড় বাজারে আসা মেহেরুন্নেসা নামে এক ক্রেতা বলেন, আমার পরিবারের সবাই চুইঝাল খুবই পছন্দ করে। শুধু গরুর মাংসই না-সব ধরনের মাংস, বড় মাছ ও অন্যান্য মুখরোচক খাবারে আমরা চুইঝাল খাই। তবে কোরবানির ঈদে গরুর মাংসের সাথে চুইঝাল না হলে একদমই চলে না। আগামীকাল ঈদ, তাই চুইঝাল কিনতে এসেছি। ঈদ উপলক্ষে দাম কিছুটা বেশি হলেও মাংসের স্বাদ পেতে চুইঝাল আমাদের লাগবেই। কারণ ঈদের দিন অতিথিদের চুইঝাল দিয়ে রান্না করা মাংস পরিবেশন করা এ অঞ্চলের একটি রেওয়াজ।”
বাজার করতে আসা শহরের মুনজিতপুর এলাকার চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম বলেন, “বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদের আগে চুইঝালের দাম কেজিতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন পাইকারি বাজারে দাম বেশি, তাই আমাদেরও বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। দাম যতই বাড়ুক, কোরবানি ঈদের মাংসে চুইঝালের স্বাদ না থাকলে ঈদের রান্নার তৃপ্তিই আসে না।
বড় বাজার মসজিদের সামনের চুইঝাল বিক্রেতা সাইদুল ইসলাম বলেন, মাংসে চুইঝাল দিলে রান্নায় অন্যরকম একটা অতুলনীয় স্বাদ ও সুঘ্রাণ আসে। এ কারণে ঈদের আগের এই কয়েকদিন বেচা-বিক্রি অনেক ভালো হচ্ছে। আমরা সাতক্ষীরা সদর, তালা, দেবহাটা, কালিগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকা থেকে গাছ ও চুইঝাল সংগ্রহ করি। আবার অনেক সময় পাইকারি ব্যবসায়ীরাও বাজারে আমাদের দিয়ে যান। শহরের বেশ কয়েকটি হোটেল চুইঝালের মাংসের জন্য বিখ্যাত হওয়ায় সারা বছরই এর ভালো চাহিদা থাকে, তবে কোরবানির উৎসবে বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এবার পাইকারি বাজারে চড়া দাম হওয়ায় আমাদেরও কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
আসাদুল ইসলাম নামে অন্য এক চুইঝাল বিক্রেতা বলেন, কোরবানি উপলক্ষে বাজারে আকস্মিক চাহিদা বাড়ায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা চুইঝালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। যে চিকন চুইঝাল আগে আমরা ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় এবং কিছুটা মোটা ও ভালো মানের চুইঝাল ৮০০ টাকা কেজিতে বিক্রি করতাম, তা এখন পাইকারি দরেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ফলে বর্তমানে চুইঝালের সাইজ ও পরিপক্বতা অনুযায়ী কেজি প্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে হচ্ছে।”
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলেই এ অঞ্চলে চুইঝালের কদর ও বাণিজ্যিক চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ২৩ হেক্টর জমিতে চুইঝালের আবাদ হয়েছে। বর্তমানে সাতক্ষীরা সদর, তালা এবং কলারোয়া উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ হচ্ছে। এছাড়া জেলার বাকি উপজেলাগুলোতে গ্রামীণ পর্যায়ে বাড়ির আনাচে-কানাচে ও বিভিন্ন গাছে গাছে চুইঝাল লাগানো হয়। এটি চাষে আলাদা কোনো জমির প্রয়োজন হয় না; যে-কোনো বড় আম, মেহগনি বা জিওল গাছে এটি আরোহী লতা হিসেবে বেড়ে ওঠে। অনেকেই এখন বাণিজ্যিকভাবে ও শখের বশে চুইঝাল চাষ করে সংসারে বাড়তি আয় করছেন।
খুলনা গেজেট/এএজে

