আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা

চুরির অপবাদে খুলনায় এক মাসে তিন খুন

জাহিদুল ইসলাম সাগর

খুলনায় গত এক মাসের ব্যবধানে চুরি ও শিশু অপহরণের অপবাদ দিয়ে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মিথ্যা ও ভুয়া অপবাদে মব সৃষ্টি এদের হত্যা করা হয়। এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আইন নিজে হাতে তুলে নেওয়া এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাকে সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, আইনের শাসন না থাকা ও পারিবারিক সঠিক শিক্ষার অভাব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

চলতি বছরের ১৮ আগস্ট দুপুরে নগরীতে ছেলে ধরা সন্দেহে বয়রার রায়েরমহল বড় মসজিদের পাশে গণপিটুনি দিয়ে রাজু বিশ্বাস নামের এক যুবক হত্যা করা হয়। সে ফুলতলা এলাকার নজরুল বিশ্বাসের ছেলে।

এ ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করলেও ঘটনায় জড়িত অন্যান্যদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তবে নিহত রাজু বিশ্বাসের বাবা মামলার অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, থানায় মামলা করেছি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, ওসি বা কোনো পুলিশ হত্যাকাণ্ডে অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য আমাকে দেয় না। থানায় ফোন দিলে তারা আমাকে নির্ভয়ে থাকার কথা বলেন।

৬ সেপ্টেম্বর রাতে চুরির অপবাদ দিয়ে তেলিগাতি এলাকায় সাজমির নামে চায়ের দোকানের এক কর্মচারীকে পিটিয়ে আহত করা হয়। ১০ সেপ্টেম্বর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

জানা গেছে, কুয়েটের ১৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তৌফিক স্টুডিওতে কাজ করার জন্য সাজমিরকে নিয়ে যায়। সেখানে দুইদিন থাকার পর খুলনায় চলে আসে সে। দীর্ঘদিন পর তৌফিক খুলনায় এসে সাজমিরকে চুরির অপবাদ দিয়ে রাতভর মারধর করে। পরে তারা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ফুলবাড়ি গেট নিয়ে পুনরায় মারধর করে। অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লে খুমেকে নিয়ে যায়। এবং সেখানে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে জবানবন্দি দিয়েছে সে। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে বাদী রাইসুল ইসলাম খুশি নয়। এখনও পর্যন্ত মামলার এজাহারভুক্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

সর্বশেষ ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুন হয় খুলনার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোঃ আজমুল হোসেন। ওই রাতে তাকে ভাত চুরির অভিযোগে ৩ ঘণ্টা পিটানো হয়। এসময় ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয় সে। চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পুলিশ ও এসআরবি’র সদস্যরা চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা নিজেদের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এসব হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মানবাধিকার খুলনার কো-অর্ডিনেটর এ্যাড. মোমিনুল ইসলাম বলেন, সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। একজন মানুষের জীবন কেড়ে নিতে বিন্দুমাত্র চিন্তা করছেনা। পারিবারিক নৈতিক শিক্ষা ও অনুশাসন না থাকা এর অন্যতম কারণ।

কেএমপি’র ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (সদর) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই তরুণ সমাজ অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগে পাড়া-মহল্লায় মুরুব্বিদের কথা শোনা হতো। তারা অশিক্ষিত হলেও এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় থাকতো। এখন মুরুব্বিদের কথা কেউ শোনে না। সালাম পর্যন্ত দেয় না। তিনি বলেন, যুব সমাজকে সঠিক পথে রাখতে হলে প্রতিটি ঘরে ঘরে বাবা-মাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সামাজিক অনুশাসন মেনে চলতে হবে। আগের জায়গায় ফিরে যেতে হবে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হবে।

নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এ্যাড. বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘মব’ কালচার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অতীতে যারা এসব করেছে এবং বর্তমানে যারা করছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা দরকার। প্রতিটি ‘মবের’ বিচার হলে অন্যরা উদ্বুদ্ধ হতো না। চব্বিশের ৫ আগস্টের পরে প্রতিটি ঘটনার বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান এই নাগরিক নেতা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন