কয়রায় ২২ কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ সংকট, বন্ধ অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহ

ভবনের ছাদে ধস, দেয়ালে ফাটল কেন্দ্র ছেড়ে অন্যত্র চিকিৎসা

তরিকুল ইসলাম

বেরিয়ে গেছে ছাদের রড। প্রতিনিয়ত খসে পড়ছে সিমেন্ট-বালু। কোথাও দেয়ালে ফাটল, কোথাও পলেস্তারা উঠে গেছে। নিচু হয়ে গেছে মেঝে। ভাঙা জানালা, নষ্ট ফ্যান ও অকেজো চিকিৎসা সরঞ্জামাদি। রোগীদের বসারও নেই কোনো ব্যবস্থা। কোথাও কোথাও টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগী।

কয়রা উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর চিত্র এখন অনেকটাই এমন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে এমনই দুরবস্থার মধ্যে চলছে উপকূলের অবহেলিত মানুষের চিকিৎসাসেবা। বেশ কয়েকটি ক্লিনিকে ঝুঁকি নিয়ে কার্যক্রম চালানো হলেও দুটি ক্লিনিকের ভবন এতটাই জরাজীর্ণ যে সেখানে আর সেবা দেওয়ার পরিবেশ নেই। ফলে পাশের বাড়ির বারান্দায়, এমনকি আবহাওয়া ভালো থাকলে খোলা আকাশের নিচে বসে রোগী দেখছেন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাররা। এমন জরাজীর্ণ অবস্থায়ও প্রতিটি ক্লিনিক থেকে প্রতিনিয়ত ৩৫/৪০ জন রোগী সেবা নিচ্ছে।

শুধু ভবনের সংকটই নয়, রয়েছে ওষুধেরও ব্যাপক ঘাটতি। উপকূলীয় কয়রায় লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকটের কারণে পেটের পীড়া ও চর্মরোগীর সংখ্যা বেশি হলেও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেয়া হয় না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

গত ২ সেপ্টেম্বর মহারাজপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দেয়াড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, মেঝে ডেবে গেছে। ছাদ ও দেয়াল থেকে খসে পড়ছে সিমেন্ট-বালু। একটি কক্ষে নষ্ট জিনিসপত্র স্তূপ করে রাখা। অন্য কক্ষে বসে রোগী দেখছেন সিএইচসিপি আরাফাত হোসেন।

শিশুর জ্বর নিয়ে আসা নাদিরা নামের এক নারীকে দেওয়া হয় প্যারাসিটামল সিরাপ। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আগে পেটের পীড়া হলে মেট্রোনিডাজল ও অ্যামোক্সিসিলিন দেওয়া হতো। এখন শুধু খাবার স্যালাইন দেওয়া হয়।

একই ক্লিনিকে উচ্চ রক্তচাপের এক রোগীর প্রেসার মাপা যায়নি নষ্ট যন্ত্রের কারণে। বুক জ্বালাপোড়ার জন্য ওষুধ চাইলে দেওয়া হয় অ্যান্টাসিড। সরবরাহ তালিকায় থাকলেও প্যান্টোপ্রাজল নেই বলে জানান সিএইচসিপি আরাফাত।

তিনি বলেন, ভবন সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। ঝুঁকি নিয়েই সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আগে ২৮ ধরনের ওষুধ দেওয়া হলেও বর্তমানে ২২ ধরনের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। মেট্রোনিডাজল ও অ্যামোক্সিসিলিনসহ সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

একই ইউনিয়নের খেজুরডাঙ্গা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি অফিস চলাকালীন ছাদের অংশ ধসে পড়ে। প্রতিনিয়ত শঙ্কার মধ্যে সেবা দিতে হচ্ছে।

কয়রা সদর ইউনিয়নের উত্তর মদিনাবাদ কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থা আরও ভয়াবহ। ভবনটি কার্যত পরিত্যক্ত। ছাদ ও দেয়ালে ফাটল, খসে পড়ছে পলেস্তারা। ভেতরে জমেছে আবর্জনা। প্রায় এক বছর ধরে পাশের একটি বাড়ির বারান্দায় বসে রোগী দেখছেন সিএইচসিপি প্রকৃতি গাইন। নষ্ট বিপি মেশিনের কারণে সেখানেও রক্তচাপ মাপা সম্ভব হয়না। ওষুধ সংরক্ষণেও সমস্যায় পড়তে হয় তাকে।

প্রকৃতি গাইন বলেন, আট মাস ধরে অন্য একজনের বারান্দায় বসে সেবা দিচ্ছি। অন্যের জায়গায় বসে প্রতিদিন ৩৫-৪০ জন রোগীকে সেবা দিতে অনেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আবহাওয়া ভালো থাকলে খোলা আকাশের নিচে বসেও সেবা দিই।

বিভিন্ন কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা মোস্তাফিজ, খোকন, হুমাইরা, সুমিসহ বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। বিশেষ করে প্রায় সময় ক্যালসিয়াম ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের সংকট থাকে। পেটের পীড়ায় আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় ওষুধ না দিয়ে শুধু খাবার স্যালাইন দেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়রায় ৩২টি কমিউনিটি ক্লিনিকের অনুমোদন থাকলেও ভবন রয়েছে ৩১টি। জমি-সংক্রান্ত জটিলতায় মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের তেতুলতলা ক্লিনিকের ভবন এখনো নির্মিত হয়নি। ৩১টির মধ্যে উত্তর মদিনাবাদ ও হরিহরপুরে সেবা চলছে অন্যের বাড়িতে। বেচপাড়া, গোবিন্দপুর, লালুয়া-বাগালি, ফতেকাটি, ৪ নম্বর কয়রা, বামিয়া, দক্ষিণ দেয়াড়া ও খেজুরডাঙ্গার ভবন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।

এ ছাড়া নাকশা, শুড়িখালী, ভান্ডারপোল, উলা, চৌকুনি, হড্ডা, কালনা, খড়িয়া, খড়িয়া-মঠবাড়ি, ৬ নম্বর কয়রা, বতুল বাজার ও ঘড়িলাল ক্লিনিকের ভবনও জরাজীর্ণ। এসব ক্লিনিক থেকে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন গর্ভবতী নারী ও শিশুসহ শত শত মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন।

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, দরিদ্র মানুষের কাছে কমিউনিটি ক্লিনিকই প্রাথমিক চিকিৎসার সবচেয়ে সহজলভ্য কেন্দ্র। সেই কেন্দ্রের ভবন যদি মাথার ওপর ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে, সরঞ্জাম নষ্ট থাকে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ থাকেনা। এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়- উপকূলের মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে অবহেলা।

তার ভাষ্য, নানা প্রতিবন্ধীকতায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবা। এসব বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এন্টিবায়োটিকসহ সকল প্রকার ওষুধ পর্যাপ্ত সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিছু ভবন সংস্কার করলে আরও কিছুদিন চালানো সম্ভব। তবে হরিহরপুর, উত্তর মদিনাবাদ ও বেচপাড়া পুনর্নির্মাণ জরুরি।

তিনি বলেন, বিগত কয়েক মাস ওষুধের সংকট চরমে ছিল। বর্তমানে ঘাটতি কিছুটা কমেছে। তবে মেট্রোনিডাজল, অ্যামোক্সিসিলিনসহ সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও কয়রার স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন