স্মৃতিতে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান

শেখ হাসিনার দেশত্যাগে খুলনায় মিষ্টি বিতরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

চব্বিশ সালের ৫ আগস্ট। কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে রূপ নেওয়া এক দফার আন্দোলনে চূড়ান্ত সফলতা আসে এদিনে। রাজধানীতে আন্দোলনকারীদের জনস্রোত গণভবন অভিমুখী হতে থাকলে দুপুরের পর স্ব-পরিবারে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়ে শিববাড়ী এলাকায় থাকা হাজার হাজার মানুষ, মিষ্টি বিতরণ হয় সেখানে।

সকালে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। ক্ষমতা ছাড়ার পূর্ব মুহূর্তে তিনি ভারতের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কোটাবিরোধী আন্দোলন দমন করার জন্য তিনি দেশে সামরিক শাসন অথবা জরুরি অবস্থা জারির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। নিয়মিত কোনো বাহিনী ছাত্র আন্দোলন দমাতে সম্মত হয়নি। এমনকি পুলিশ গুলি চালাতেও রাজি ছিল না। সেনাপ্রধানসহ অন্যান্যরা সামরিক আইন ও জরুরি অবস্থার বিপক্ষে ছিলেন। সেনাবাহিনীর মনোভাব বুঝতে পেরে শেখ হাসিনা কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে দেশত্যাগের পরিকল্পনা করেন। এ পরিকল্পনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এসএসএফ এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ কে এম নাজমুল হাসান ও সেনাবাহিনীর কিউ এম জি লেঃ জেঃ মুজিব। ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার জঙ্গি মিছিল দেখে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে ৪৫ মিনিট সময় বেঁধে দেন।

কলকাতার প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারের খবরে বলা হয় বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে দেশত্যাগের কথা বলে বিমান পাঠানোর অনুরোধ করেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথমদিকে বিমান পাঠাতে রাজি হলেও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কায় পূর্ব সিদ্ধান্ত থেকে সরে যান। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ধানমন্ডির ৩২ নং সড়কে এবং টুঙ্গিপাড়ায় যেতে চেয়েছিলেন। বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার কুর্মিটোলা ঘাঁটি থেকে উড়ে গণভবন সংলগ্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে অবতরণ করে। হেলিকপটারটি বাণিজ্য মেলার মাঠ থেকে তাদের বহন করে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর রানওয়ের পশ্চিম পাশে অবস্থিত কুর্মিটোলা ঘাঁটিতে এসে পৌঁছায়। তারা এখানে নেমে সি-১৩০ জে বিমানে উঠে পড়ে। বেলা ৩-টা ১১ মিনিটে আকাশে উড়ে। ঢাকা থেকে বিমানটি উড়ে সাতক্ষীরার বিমাক অতিক্রম করে ৩টা ৪২ মিনিটে। সেনাপ্রধান ৩টা ৫০ মিনিটে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।

খুলনায় ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিল, মিষ্টি বিতরণ : শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে খুলনা নগরীর বিভিন্ন সড়কে নেমে পড়ে ছাত্র-জনতা। ৫ আগস্ট সকাল থেকে নগরীর শিববাড়ী মোড়ে জড়ো হতে থাকে ছাত্র-জনতা। সময় বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নামে ছাত্র-জনতার ঢল। আড়াইটা নাগাদ আন্দোলনরত অবস্থায় শিক্ষার্থীরা খবর পান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা দেশত্যাগ করেছেন। এরপরই বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়ে শিববাড়ী এলাকায় থাকা হাজার হাজার মানুষ। বিতরণ করে মিষ্টি। নগরীর বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ পায়ে হেঁটে, সাইকেল, ভ্যান, রিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শিববাড়ীর দিকে ছুটতে থাকে। মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো নগরী। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শিববাড়ী মোড়ে হাজারো মানুষ জড় হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে শত, শত মানুষ সড়কে নেমে পড়েন। বিজয় দিবসের উল্লাস দেখিনি, তবে ২০২৪ এর গণঅভূত্থানের ছাত্র-জনতার বিজয় দেখেছি। মানুষ স্বৈরাচার মুক্ত দেশ আশা করছিল।

বিক্ষুব্ধ জনতার আগুনে পুড়ে মরে কয়রার মহসিন রেজা : শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর কয়রায় ছড়িয়ে পড়ে তখন বেলা আনুমানিক তিনটা। গণতন্ত্র প্রত্যাশী ছাত্রজনতা উপজেলা সদরে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে। উল্লাসকারীরা উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় ভাঙচুর করে। আগুন দেয় সাবেক সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামান বাবুর উপজেলা সদরের বাসভবনে। ছাত্র-জনতা উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও তৎকালীন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম মহসিন রেজার উপজেলা সদরের বাসভবনে হামলা করে। তিনি বাসভবন থেকে ছাত্র জনতার ওপর গুলি ছোড়ে। এতে ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়। বিকেল আনুমানিক ৪টা নাগাদ আন্দোলনকারীরা আবারও সংগঠিত হয়ে আওয়ামী লীগের এ নেতার বাসভবনে হামলা চালিয়ে দরজা ভেঙে ফেলে। তারা তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। বাসভবনে মুহূর্তের মধ্যে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। বারান্দায় পড়ে ছিল তার আগুনে পোড়া লাশ।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন