সাংবাদিকতার জগতে আমি তখন একেবারেই নতুন। খুলনা গেজেটে সাংবাদিকতার হাতে-খড়ি। গাজী আলাউদ্দিন স্যার ও মোহাম্মদ মিলন ভাইসহ অফিসের সিনিয়রদের পরামর্শ আর নিজের মতো করে কাজ শেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ভুল যেন পিছুই ছাড়ে না। একটি ভুল ঠিক করতে না করতেই আরেকটি ভুল ধরা পড়ে। সবচেয়ে বেশি ভুল হতো বানানে। এসব ভুলের কারণে সিনিয়রদের কাছ থেকেই নিয়মিত বকা খেতাম।
একদিন তো স্যার হেসে বলেই ফেললেন, “জ্যোতি, তুমি কি বানান ভুলে পিএইচডি করেছো? যতই ঠিক করো, ভুল থেকেই যায়!” কথাটি শুনে লজ্জা পেয়েছিলাম, কিন্তু সেটাই আমাকে আরও মনোযোগী হতে শিখিয়েছে। ধীরে ধীরে সংবাদ আপলোডের কাজ আয়ত্তে আনতে শুরু করি। কাজের সময়ও বাড়তে থাকে। ভুল করতাম, বকা খেতাম, আবার শিখতাম। এভাবেই সাংবাদিকতার বাস্তব পাঠ চলছিল।
এর মধ্যেই জুলাই মাসে শুরু হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। দিন-রাত বেশ অনেকটা সময় কাজ করতে হতো। কখনো স্যার ফোনে পরামর্শ দিচ্ছেন কোন সংবাদ কীভাবে প্রকাশ করতে হবে, কখনো নতুন তথ্য যাচাই করতে হচ্ছে। ঢাকায় আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। সংঘর্ষ বাড়ে, গুলির শব্দ বাড়ে, আর বাড়তে থাকে নিহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
একের পর এক লাশের সংখ্যা আপডেট করতে করতে যখন ফাইয়াজের ছবিটি চোখে পড়ল, তখন আর নিজেকে সামলাতে পারিনি। ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। ঠিক তখনই স্যার ফোনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, “জ্যোতি, যে সব ছেলেরা কাউকে কিছু না জানিয়ে খুলনা থেকে ঢাকায় গিয়ে মারা গেল, তার পরিবার হয়তো এখনো জানে না। তুমি যদি কাঁদতেই থাকো, তাহলে তাদের মৃত্যুর খবর মানুষ সময়মতো জানবে কি করে। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব নিজের আবেগের চেয়ে বড়। মনে রেখো, মানুষ তোমার কান্না নয়, তোমার কাজের মান দেখবে।”
কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে। চোখের পানি মুছে আবার কাজে ফিরে গিয়েছিলাম। বিভাগভিত্তিক নিহত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা গুনেছি, প্রতিটি সংবাদ প্রকাশ করেছি।
এদিকে আন্দোলন দমন করতে না পেরে ১৭ জুলাই রাত থেকে মোবাইল ইন্টারনেট এবং ১৮ জুলাই রাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন ধাপে সেবাগুলো পুনরায় চালু করা হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও আন্দোলন থামেনি।
২৮ জুলাই দুপুরে অফিসে যাওয়ার পথে দেখি, একদল শিক্ষার্থী আমার দিকেই দৌড়ে আসছে, তাদের পেছনে পুলিশ ধাওয়া করছে। ভয় পেয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয়পত্র শক্ত করে ধরে ছিলাম। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে দ্রুত রাস্তা পার হয়ে অফিসে পৌঁছাই।
২ আগস্ট ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় অফিসের কাজও বন্ধ ছিল। মিলন ভাইয়া ফোন করে বললেন, “আশপাশের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে। সাংবাদিকতার নতুন উদ্দীপনা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।” নামাজের আগে সিটি ইনের পাশের গলিতে দাঁড়িয়ে শুনলাম, মুরাদ কাকা (স্থানীয় বিএনপি নেতা) ফোনে বলছেন, “নামাজের পর সবাই প্রস্তুত থাকবে। ছাত্রদের সাথে মিশে আমরাও আন্দোলনে যোগ দেব।” ঘটনাটি সাথে সাথে ভাইয়াকে জানাই। তিনি শুধু বললেন, “ঠিক আছে, দেখছি।”
আধা ঘণ্টা পরে আবার বের হয়ে শিববাড়ি ফুজি কালারের সামনে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন। সাহস করে এগিয়ে যেতেই এক পুলিশ সদস্য বললেন, “এত ছোট মানুষ এখানে কেন?” পরিচয় জানার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট কোথায়? হেলমেট কোথায়? কোনো নিরাপত্তা ছাড়া মাঠে নেমেছেন কেন?” কথাগুলো শুনে জীবনের ঝুঁকিটা নতুন করে উপলব্ধি করলাম।
বিকেলে শিববাড়িতে আন্দোলন শুরু হলে আমিও আর ঘরে থাকতে পারিনি। দেখলাম কেউ ভাইকে নিয়ে এসেছে, কেউ বোনকে, কেউ সন্তানকে। হাজারো মানুষের স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। পুলিশও সেদিন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালাতে দেয়। এদিন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তুমুল সংঘর্ষ হয়।
৪ আগস্ট, খুলনা নগর জুড়ে আন্দোলনে উত্তাল। শিববাড়ি মোড়ে ছাত্র-জনতা মিশে একাকার। শেখপাড়া তেতুলতলা মোড় থেকে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু শিববাড়ি মোড়ের দিকে যাওয়া যাচ্ছে না। বেলা ১২টার পর পর আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়, পরে শেখ বাড়ি, জেলা পরিষদ, খুলনা প্রেসক্লাব, খুলনা বেতার, তৎকালীন মেয়রের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে আন্দোলনকারীরা।
পরদিন ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট। যে দিনটি ‘৩৬শে জুলাই’ বলে পরিচিতি পায়। ইন্টারনেট তখনো অনিশ্চিত। সকালেই রান্না করে ছোট ভাইয়ের খাবার নিয়ে অফিসের উদ্দেশে বের হই। শিববাড়ি এলাকায় শিক্ষার্থীরা ব্যাগ তল্লাশি করে। আমি বলি, “আমি তোমাদেরই একজন।” পরিচয়পত্র দেখে তারা আমাকে যেতে দেয়।
অফিসে গিয়ে কোনোভাবে ডিশ লাইনে কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎ ব্রেকিং নিউজে দেখলাম, সেনাবাহিনী প্রধান সংবাদ সম্মেলন করবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইন্টারনেট ফিরে এলো। একের পর এক সংবাদ আপলোড করতে করতে দেখি দুপুরের পর দেশত্যাগ করেছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মুহূর্তেই অফিসজুড়ে অন্যরকম পরিবেশ। অফিসে থাকা নিপা আপা, মিলন ভাই, এহসান ভাই সবাই আনন্দে আত্মহারা।
নগরজুড়ে বিজয় মিছিল আর উল্লাস। নিউজের তথ্য সংগ্রহের জন্য মিলন ভাই আর এহসান ভাই শিববাড়ির দিকে রওনা হওয়ার পর অফিসে আমি, নিপা আপা ও শিলা আপা বাহিরে গিয়ে দেখি হাজারো মানুষ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আনন্দ মিছিলে নেমেছে। সেই উচ্ছ্বাসের সাক্ষী হয়েছিলাম সেদিন।
অফিসে ফিরে এসে আবার কাজে বসি। আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে সংবাদ প্রকাশ করে যাচ্ছিলাম। রাতেও বাসায় ফিরে কাজ করেছি। আমরা চেষ্টা করেছি, খুলনাসহ সারাদেশের প্রতিমূহূর্তের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা খুলনা গেজেটের পাঠকের সামনে তুলে ধরতে।
‘৩৬শে জুলাই’ আমার কাছে শুধু একটি দিন নয়; এটি সাংবাদিকতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার দিন। সেদিন শিখেছিলাম সাংবাদিকের চোখে পানি থাকতে পারে, কিন্তু দায়িত্ব থেমে থাকতে পারে না। ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া সহজ নয়; সেই ইতিহাস সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
খুলনা গেজেট/এএজে

