খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল কৃষকদের সুবিধার্থে সরকারি খাল উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও রূপসা উপজেলার বিল জাবুসায় সীমাহীন জলাবদ্ধতা বিরাজ করছে। কোথাও হাঁটু পানি আবার কোথাও কোমর পর্যন্ত পানি থাকায় অধিকাংশ কৃষক এখনও বীজতলা তৈরি করতে পারেনি। কৃষকদের অভিযোগ অতিরিক্ত বৃষ্টি অপরদিকে খাল থেকে সুষ্ঠুভাবে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় বিলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে এ বিলে প্রায় ২ হাজার বিঘা কৃষি জমি রয়েছে। নৈহাটী ইউনিয়নের বাগমারা, রামনগর, নিকলাপুর, জয়পুর, ইলাইপুর, নৈহাটী, জাবুসাসহ আরও বেশ কয়েকটি গ্রামের মৌসুমি চাষীদের ভরসা এ বিলের উৎপাদিত ফসল। বিলের কৃষকরা সাধারণত বোরো ও আমন ধানের চাষাবাদ করে থাকেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে আমনের বীজতলা তৈরি করার সময় আরও আগে শুরু হলেও জলাবদ্ধতার কারণে তারা এখনও বীজতলা প্রস্তুত করতে পারেনি। ফলে কয়েকশ’ কৃষকের কপালে এখন চিন্তার ভাজ। জলাবদ্ধতার বিরূপ প্রভাব পড়েছে বিলের পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের ওপর।
রাস্তাঘাট তলিয়ে একাকার হওয়ায় বাড়ি থেকে বাইরে বের হওয়ার উপায় নেই। বিশেষ করে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়কের বন্ধ হয়ে যাওয়া সিগমা মাছ কোম্পানির পাশর্^বর্তী মদনার খালের পাশ থেকে যাওয়া সড়ক এবং রবের মোড় থেকে মদনার খালপাড় এলাকা অভিমুখী ইয়াদ আলী সড়ক জলমগ্নসহ বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। ওই এলাকার বাসিন্দাসহ চাষিরা জমিতে যাওয়া আসায় সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।
এলাকাবাসী জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর কৃষকদের সুবিধার্থে খাল খনন কার্যক্রম শুরু করেছেন। স্থানীয় এমপি আজিজুল বারী হেলালও নির্বাচনের আগে এবং পরে বিভিন্ন সভা সমাবেশে সরকারি খাল উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বিল জাবুসার পরিবর্তন হয়নি। বিলের পানি নিষ্কাশনে নানা প্রতিবন্ধকতায় চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা দন্ত চিকিৎসক ইমাম হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে আমরা খুবই দুর্ভোগের মধ্যে আছি। বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য রূপসা নদীর সাথে খাল থাকলেও ঠিকমতো পানি নামানো হচ্ছে না। ভাটাতে যতটুকু নামে জোয়ারে তার চেয়ে বেশি ওঠে। এতে আমাদের বসবাসের কষ্টের পাশাপাশি বিলের আমন ধান উৎপাদনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বিলের চাষি বাগমারা গ্রামের বাসিন্দা দিদারুল ইসলাম দিদু বলেন, সব বিলে আমনের বীজতলা তৈরি করা হলেও আমরা এখনও কিছুই করতে পারিনি। বিলে পানি থৈ থৈ করছে। এই পানি নিষ্কাশন না হলে সঠিক সময় বীজ তৈরিসহ জমির রোপণ কাজ শেষ করতে পারবোনা। এতে আমাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, আমাদের কষ্টের কথা ক’জন বা ভাবে। কৃষকদের জন্য সরকারি যত সুযোগ সুবিধা আছে আমরা তার কিছুই পাইনা, পায় যারা কৃষক না তারা। চেয়ারম্যানের কাছে গেলে বলে সব দেয়া শেষ।
কৃষক আরমান হোসেন বলেন, সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পানি সেচ করে পাতো খোলা তৈরি করেছি। এখন ধান ফেলবো যদি আবার ভারি বৃষ্টি হয় এবং ঠিক মতন পানি না সরানো হয় তাহলে বীজতলা ডুবে নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি বলেন, গত বোরো মৌসুমে ইরি ধানের ব্লক করে লোকসান হয়েছে। সময়মতো আমন চাষ করতে না পারলে এবারও লোকসানের মুখে পড়তে হবে। তিনি আরও বলেন, খাল থেকে পানি সরবরাহের জন্য যারা দায়িত্বে রয়েছে, তারা এক ভাটি পানি নামালে দুই জোয়ার তোলে। ফলে বিলের পানি কমার চেয়ে বাড়ছে।
জাবুসা বিল পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির আহ্বায়ক মুফতি রেজাউল ইসলাম বলেন, খালের মধ্যে পাটা দিয়ে মাছ চাষের জন্য যে সিস্টেম করে রাখার কারণে পানি নিষ্কাশন ঠিক মতো হচ্ছে না। ইতোমধ্যে অসংখ্য কৃষকের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। তারা আবার বীজ ফেলানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বাগমারা গ্রামের বাসিন্দা মৎস্য চাষী মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, খুলনা গেজেট মাল্টিমিডিয়ার সংবাদের মাধ্যমে কৃষকদের দুরবস্থার কথা জানতে পেরে সাথে সাথে বিএনপির নেতৃবৃন্দসহ আমরা বিলের পানি নিষ্কাশনে কাজ শুরু করেছি। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে কৃষকদের দুর্ভোগ লাঘব হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তরুণ কুমার বালা বলেন, কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে দেয়া হয়। যদি কোনো ক্ষেত্রে দুই একজন বাদ পড়েছে এমন তথ্য পেলে তাদেরকেও আমরা আমাদের সাধ্যানুযায়ী সেবা দিয়ে থাকি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানজিদা রিকতা বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে সব জায়গায় পানির চাপ রয়েছে। ইতোমধ্যেই আমি উপজেলা প্রকৌশলীকে নির্দেশনা দিয়েছি সকল স্লুইচ গেট থেকে দ্রুত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে।
স্থানীয় এমপি আজিজুল বারী হেলাল দেশের বাইরে থাকায় এ ব্যাপারে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর অফিস সেক্রেটারী রেজাউল ইসলাম রেজা বলেন, এমপি সাহেব তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ডিসি ও ইউএনও অফিসে বলে দেওয়া হয়েছে রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়ার সরকারি খালগুলি আগামিতে যাতে লিজ দেওয়া না হয়। তিনি আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে খালে যারা ঘের করে তাদের নিয়ে বসবেন। এমনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, লিজ গ্রহীতাদের টাকা ফেরত দিয়ে খাল উন্মুক্ত ঘোষণা করা হতে পারে।
খুলনা গেজেট/এনএম

