ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হলেও প্রায় ২ যুগ ধরে অব্যবহৃত রয়েছে খুলনা ট্রাক টার্মিনাল। প্রায় ২৩ বছর ধরে তালাবদ্ধ রয়েছে প্রশাসনিক ভবন। নির্ধারিত ফি দিয়ে টার্মিনালে ট্রাক রাখার বিষয়ে আপত্তি মালিক ও ড্রাইভারদের। রাস্তার ওপরেই বা গ্যারেজের সামনে যত্রতত্র পার্কিং করে রাখা হচ্ছে দেদারসে ট্রাক। এতে নাগরিক ভোগান্তি বাড়লেও কেএমপি’র ট্রাফিক বিভাগ ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের কাছে বিষয়টি উপেক্ষিত।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি)’র সহকারী এস্টেট অফিসার শেখ মো. মাসুদ আলী খুলনা গেজেটকে বলেন, ১৯৯৮ সালে নগরীর গল্লামারী-সোনাডাঙ্গা বাইপাস সড়কের পাশে ছয় একর জমির উপর প্রায় ৬০০ ট্রাক পার্কিং করার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় সিটি কর্পোরেশন। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ২০০২ সালে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়। প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণ, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, লোড-আনলোড সুবিধা, টিকিট কাউন্টার, ড্রেন, পাবলিক টয়লেট ও ৪৯টি দোকানঘর নির্মিত হয়। টার্মিনালটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে পরের বছর ২০০৩ সালে এমএসপি প্রকল্পের আওতায় আরও ১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় তিন তলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন। এ ভবনে রয়েছে ট্রাক চালক ও হেলপারদের জন্য বোর্ডিং হাউজ, ক্যান্টিন, বাথরুম, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা, টেলিফোন সুবিধা, প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র ইত্যাদি।
এ ব্যাপারে কেসিসি’র রাজস্ব কর্মকর্তা এসকেএম তাছাদুজ্জামান খুলনা গেজেটকে বলেন, প্রত্যেকটি ট্রাককে প্রতি ২৪ ঘণ্টা টার্মিনালে পার্ক করে রাখতে রাজস্ব দিতে হয় ৫০ টাকা। তিনি বলেন, কেসিসি’র ট্রাক টার্মিনালটি বাণিজ্যিক এলাকা থেকে একটু দুরে হয়ে গেছে। এ কারণে জ্বালানী বাঁচাতে ট্রাক চালকরা এখানে আসছেন না। বেশিরভাগ চালক মালামাল আনলোড করে সড়কেই ট্রাক পার্ক করে রাখে। সড়কে গাড়ি পার্কিং রোধে মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযুক্ত ট্রাক চালকদের জরিমানাও করা হয়। কিন্তু এসব কোন কাজে আসেনি।
# তালাবদ্ধ প্রশাসনিক ভবন, রাস্তায় যত্রতত্র পার্কিং নির্ধারিত ফি দিতে অনীহা মালিক-ড্রাইভারদের
ট্রাক টার্মিনাল চালু না হওয়ার কারণ হিসেবে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, ট্রাক মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদেরও যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়েও প্রশাসনিক ভবনটি চালু না হওয়ায় এটি অনেকটা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
খুলনা জেলা ট্রাক ও কভার ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল গফফার বিশ্বাস অভিযোগ করেছেন, ২০০৮ সালের মে মাসে কেসিসি ট্রাক টার্মিনালের মোট সীমানার ৭৫ শতাংশ জায়গা জুড়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে পাইকারি কাঁচাবাজার স্থাপন করেছে। কাঁচাবাজারের কারণে ট্রাক টার্মিনালের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হতে চলেছে। সংগঠনের চালিত ট্রাক, নিয়মিত টার্মিনালে অবস্থান করতে পারছে না।
তিনি আরো বলেন, বাণিজ্যিক ট্রান্সপোর্ট এজেন্সিগুলো শহরের কদমতলা, নুরনগর, খালিশপুর, দৌলতপুর, মানিকতলা, রেলিগেট, রূপসা, সোনাডাঙ্গায় অবস্থিত। অধিকাংশ ট্রাক ড্রাইভার মালামাল লোড-আনলোড করে আশেপাশেই গাড়ি পার্ক করে রাখে।
খুলনা বিভাগীয় ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি কাজী মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৫০০ এর মত ট্রাক ও মিনি-ট্রাক খুলনা শহরে প্রবেশ ও বাহির হয়। এসব গাড়ি দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ১৮টি জেলাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
খুলনা বিভাগীয় ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ খুলনা গেজেটকে বলেন, অধিকাংশ ট্রাক মালিক ও ড্রাইভার ফি দিয়ে ট্রাক টার্মিনালে গাড়ি রাখতে চায়না। এজন্য সড়কের পাশে বা গ্যারেজেই তারা ট্রাক পার্কিং করে রাখে। আমরা মালিক ও ড্রাইভারদের টার্মিনালে রাখার জন্য অনুরোধ করেছি কিন্তু অনেকেই আগ্রহী হয় না। তবে কিছু ট্রাক কিন্তু টার্মিনালে আসে, শুধুমাত্র বিভিন্ন গ্যারেজে গাড়ি মেরামতের জন্য।
খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শহরের কদমতলা, নুরনগর, খালিশপুর, দৌলতপুর, মানিকতলা, রেলিগেট, রূপসা, সোনাডাঙ্গা, কালীবাড়ী রোড, কেডি ঘোষ রোড, বার্মাশীল রোড সহ বিভিন্ন সড়কের পাশে সারি সারি ট্রাক পার্ক করা। দিনের অধিকাংশ সময় সড়কের এক-তৃতীয়াংশ দখল করে রাখা হয় এসব ট্রাকে। এতে নগরীতে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং সড়কে সৃষ্টি হয় যানজট।
অপরদিকে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, অব্যবহৃত থাকার কারণে বর্তমানে ট্রাক টার্মিনালে বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদকাসক্ত, জুয়াড়ি, ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে এলাকাটি। এছাড়া রাতের আধারে দুর্বৃত্তরা ট্রাক টার্মিনালের প্রশাসনিক ভবনের ও অন্যান্য রুমের দরজা, জানালা, লোহার রড, গ্লাস ও ইট খুলে নিয়ে গেছে।
খুলনা গেজেট/এএজে

