দেশ বিভাগের পর কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টরা পৈতৃক ভিটা ত্যাগ করায় খুলনায় মুসলিম লীগ প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। যদিও ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে এখানে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। ১৯৫০-৫১ সালে ভাষা আন্দোলন প্রশ্নে এখানে মুসলিম লীগ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। এড. এ এইচ দেলদার আহমেদ, আব্দুল হাকিম, ঐতিহাসিক এএফ এম আব্দুল জলিল, সৈয়দ মোস্তা গাওছল হক, আবু মুহম্মদ ফেরদৌস ভাষা আন্দোলনের পক্ষে আর খান এ সবুর, এসএম এ মজিদ, খান সাহেব সুলতান আহমেদ, হাজী মোজাহার উদ্দীন, মোক্তার নুরুল হক, মোক্তার নজীর আহমেদ আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের আশীর্বাদ লাভ করেন।
খান এ সবুর খুলনায় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হওয়ায় ভাষা সৈনিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করেন। পাশাপাশি পুলিশের নির্যাতন ও ধরপাকড় অব্যাহত ছিল। মুসলিম লীগের সমর্থকরা ঐতিহাসিক এ এফ এম আব্দুল জলিলের ওপর কয়েক দফা হামলা করে। ১৯৫১ সালের প্রথম দিকে স্টেশন রোড ও ক্লে রোডের সংযোগ স্থলে আবু মুহম্মদ ফেরদাউসকে হকিস্টিক দিয়ে মুসলিম লীগ সমর্থকরা আহত করে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। তিনি এক মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন (এড. আব্দুল্লাহ হোসেন বাচ্চু রচিত আবু মুহম্মদ ফেরদৌস স্মরণে)। প্রাণের ভয়ে আবু মুহম্মদ ফেরদৌস বাড়িতে ফিরতে পারতেন না।
ভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক এম এ গফুরকে ১৯৫২ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে মুসলিম লীগ সমর্থকরা লোয়ার যশোর রোডের পানির ট্যাংকির সামনে মারপিট করে। তিনি বারো দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এম এ বারী ও মরহুম সমীর আহমদের ওপর হামলা হয়। সমীর আহমদ সম্পাদিত সবুজপত্র পত্রিকা অফিসেও হামলা হয়। ভৈরব স্ট্যান্ড রোডে এম এ বারী ও এ কে সামসুদ্দীন সুনু মিয়া প্রহৃত হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর এ কে সামসুদ্দীন সুনু মিয়াকে ধর্মসভার কাছে ধরে নিয়ে স্যার ইকবাল রোডের বিশ্রাম নিকেতনে আটক রাখে (মুহম্মদ আব্দুল হালিম রচিত খুলনায় ভাষা আন্দোলন-১৯৫২)। তিনি একজন মুসলিম লীগ নেতার সুপারিশে মুক্ত হন। বিশ্রাম নিকেতন নামক এই বাড়িটির মূল মালিক উচ্চ ডিগ্রিধারী চিকিৎসক নগেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য। বাংলা ১৩৪১ সালে এই বাড়িটি নির্মাণ করে। ১৯৪৭ সালে তিনি দেশ ত্যাগ করলে সরকার বড়িটি অধিগ্রহণ করে। এক পর্যায়ে মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর ও এস এম এ মজিদ বসবাস করতেন।
এসএম এ মজিদের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী রাজিয়া মজিদ ঢাকায় চলে গেলে বাড়িটি শূন্য হয়ে যায়। পরে সেখানে খুলনা কালেক্টরেটের একজন ম্যাজিস্ট্রেট বসবাস করতেন। জেঃ এরশাদের শাসনামলে সরকার প্রেস ক্লাবের নামে বাড়ি বরাদ্দ দেন। ১৯৮৭ সালের ১৭ জুন উপ-প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ এ ভবনের উদ্বোধন করেন (ড. শেখ গাউস মিয়া রচিত মহানগরী খুলনা ইতিহাসের আলোকে) এই ভবনের সাথে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগের সমর্থকরা সাউথ সেন্ট্রাল রোডস্থ কয়লা ঘাটের কাছে ছাত্র জনতার মিছিলে হামলা করে। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা গুন্ডাদের প্রতিহত করে। এরপর থেকে খুলনায় মুসলিম লীগের গুন্ডামি কমে যায় (এম নূরুল ইসলাম রচিত রাজনীতিক আবু মুহম্মদ ফেরদৌস)।
খুলনা গেজেট/এনএম

