উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার পাকিস্তান সরকারের দুরভিসন্ধির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ১৯৫২ সালে রক্তাক্ত হয়েছিল বাঙালি জাতি। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো সেই বাঙালি জাতির ভাষা আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন একজন উর্দুভাষী অবাঙালি। তিনি ছিলেন ড. ইউসুফ হাসান।
অবাঙালি হয়েও প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্ন থেকেই তিনি মাতৃভাষা বাংলার পক্ষে অবস্থান নেন। বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি সক্রিয়ভাবে সংগ্রাম করেন। ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকায় অন্যান্য ভাষাসৈনিকদের সঙ্গে তিনিও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
ড. ইউসুফ হাসানের জন্ম ভারতের বিহারের পাটনায়। শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ছিলেন একজন আদর্শবাদী শিক্ষক। এসব গুণের কারণেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ষাটের দশকে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে চীন সফরেও অংশ নেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি নারায়ণগঞ্জের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে জীবিকার সন্ধানে ১৯৭৭ সালে খুলনা শহরে আসেন। ফেরিঘাট চামড়া পট্টি এলাকার দেবেন বাবু রোডে বসবাস শুরু করেন। দীর্ঘদিন তিনি আব্দুল খালেকের পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় বাস করেছেন।
খুলনায় এসে প্রথমে লায়ন্স স্কুলে অধ্যক্ষ হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে নিজ উদ্যোগে ফারাজীপাড়া লেনে স্বল্প পরিসরে এবং পরবর্তীতে সিমেট্রি রোডে প্রতিষ্ঠা করেন ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘খুলনা প্রিপারেটরি স্কুল’। এ সময় তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় খুলনার বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক উপস্থাপক ও বেতার ব্যক্তিত্ব কবি নাসিরুজ্জামানের। তাঁর সহযোগিতায় স্কুলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।
এই বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। সেখানে অনেক বিদেশি শিশুও অধ্যয়ন করত। প্রায় ১৫ জন শিক্ষকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন নাসিমা বানু, মিসেস জাভেদ জিলানী, নুরজাহান বেগম, মিশরী বেগম মিশু, মিস্টার হালদার প্রমুখ। স্কুলটির অধ্যক্ষ ছিলেন তাঁর স্ত্রী নাসিমা আরা হাসান। প্রায় ৩০ বছর সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হওয়ার পর ২০০৮ সালে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৭৭ সালে খুলনায় আসার পর তিনি প্রগতিশীল রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ন্যাপ (মোজাফফর) দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। বামপন্থী নেতা তোহা, মতিয়া চৌধুরী ও আব্দুল হকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। একই সময়ে তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও সক্রিয় ছিলেন। খুলনায় কবি সুফিয়া কামাল এলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময়ের সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে হোটেল ডিলাক্সে নিয়মিত আড্ডা দিতেন এ তথ্য কবি নাসিরুজ্জামানের কাছ থেকে জানা।
‘রূপান্তর’-এর নির্বাহী পরিচালক স্বপন গুহ এবং শিক্ষাবিদ আনোয়ারুল কাদির মীরু জানান, “১৯৯৫ সালে নগরীর সাতরাস্তার মোড়ে বিশাল প্যান্ডেলে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে ভাষাসৈনিক সমীর আহমেদ, লুৎফর রহমান জাহাঙ্গীর ও তোফাজ্জল হোসেনকেও সংবর্ধিত করা হয়। সে উপলক্ষে একটি স্মরণিকাও প্রকাশিত হয়।
ড. ইউসুফ হাসানের এক পুত্র ও এক কন্যাসহ দুই সন্তান রয়েছে। পুত্রের নাম কাইফি। এই মহান মানুষটি সম্প্রতি ইন্তেকাল করেছেন।
মায়ের ভাষায় কথা বলার অনন্ত অধিকার থেকেই বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা, যার চূড়ান্ত পরিণতি মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা অর্জনের পেছনে ভাষাসৈনিকদের অবদান অপরিসীম। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে সেই সকল ভাষাসৈনিকের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।
সম্পাদনায় : ওয়াহিদুজ্জামান সোহাগ।
খুলনা গেজেট/এনএম



