বুধবার । ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩
২১ বছরের কারাবাস কেড়ে নিয়েছে ইব্রাহিমের স্বপ্ন ও সংসার

উচ্চ আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও মুক্তি মেলে ৮ বছর পর

সাগর মল্লিক, ফকিরহাট

জেলে থাকতি দুই বেলা খাওন পাতাম, এখন অনেক সময় না খাইয়ে থাকতি হয়। বৌ ঘর ছাড়িছে, মাইয়েডা একপ্রকার পথের ভিখারি। জেল থেকে মুক্তি পাইছি, কিন্তু জীবন পাইনি।

কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ রোধ হয়ে আসছিল ইব্রাহিম আলী শেখের, যার ডাকনাম সাগর। ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের লোহার ফটক যখন তার জন্য চিরতরে খুলে যায়, তখন আকাশ দেখার আনন্দ নয়, বরং এক বুক হাহাকার নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ২১ বছর পর মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নিলেও ইব্রাহিম বুঝতে পারছেন, তার আসল মুক্তি এখনো মেলেনি; বরং কারাগারের চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে তিনি পড়েছেন জীবনের এক বৃহত্তর ও নিষ্ঠুর কারাগারে।

যে মামলায় তার জীবনের সোনালি সময়গুলো কেড়ে নেওয়া হয়েছে, সেই মামলা থেকে তিনি উচ্চ আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়েছিলেন ২০১৭ সালে। কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচ আর লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে সেই খালাসের আদেশের কপি কারাগারের ফটক পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লেগেছে দীর্ঘ আট বছর। বিনা অপরাধে এই আট বছর ফাঁসির সেলের গা ছমছমে অন্ধকারে মৃত্যুর প্রহর গোনা ইব্রাহিমের কাছে প্রতিটি দিন ছিল এক একটি অনন্তকাল।

গতকাল মঙ্গলবার বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার মরা পশুর নদীর চরের এক জীর্ণ ঝুপড়িতে বসে ইব্রাহিম যখন তার জীবনের হিসাব মেলাচ্ছিলেন, তখন তার চোখে ছিল আসমান সমান শূন্যতা।

২০০৩ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সের এক টগবগে যুবক ইব্রাহিম যখন তিনি গ্রেপ্তার হন, তখন তার কাঁধে ছিল মা, ভাই-বোন ও কয়েক মাসের এক দুগ্ধপোষ্য সন্তানের দায়িত্ব। সারাদিন রিকশা চালানোর পাশাপাশি বাজারে নাইটগার্ডের কাজ করে যে মানুষটি সংসার আগলে রাখতেন, কারাগারের অন্ধকার তাকে আজ এক পঙ্গু মানুষে পরিণত করেছে। দীর্ঘ ২১ বছর রোদ-আলোহীন কনডেম সেলে থাকার ফলে তার দৃষ্টিশক্তি এখন ক্ষীণ, হাত-পা প্রায় অসাড়। ভারী কাজ করার ক্ষমতা তো নেই-ই, এমনকি সাধারণ কাজ করতে গেলেও শরীর সায় দেয় না। সমাজও আজ তাকে আপন করে নিতে ভয় পায়; কপালে জোটা ‘খুনি’র তকমা আজও তাকে তাড়া করে ফেরে।

ইব্রাহিম যখন জেলে যান, তখন তার মেয়ের বয়স ছিল মাত্র দু’মাস। সেই মেয়ের বিয়ে হয়েছে চরম এক অভাবী সংসারে। স্ত্রী বহু আগেই তাকে ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়েছেন।

ইব্রাহিম আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাপ খুনি এই অপবাদ মাথায় নিয়ে আমার মেয়েটার ভালো ঘরে বিয়ে হয়নি। জেলে বসে অক্ষম বাবা হিসেবে মেয়ের এই দুর্দশা দেখা মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণার।’

বর্তমানে তিনি বাগেরহাটের ফকিরহাটে তার ভগ্নিপতির আশ্রয়ে আছেন, যেখানে নিজের বলতে কোনো মাটি নেই, নেই কোনো ঘর। মা কোহিনুর বেগম তাকে ছাড়াতে গিয়ে নিজের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করেছেন, কাজ করেছেন ইটভাটায়। আজ ছেলের পাশে বসে মা কেবল অশ্রু মুছছেন আর ভাবছেন, সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে।

নিজের শরীরের বার্ধক্য আর চোখের ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে ইব্রাহিম এখন সরকারের কাছে কেবল একটু বাঁচার নিশ্চয়তা চান। যে আটটি বছর তিনি বিনা অপরাধে জেল খাটলেন, সেই হারানো সময়ের ক্ষতিপূরণ কি আদৌ কেউ দিতে পারবে?

বাগেরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও ইব্রাহিমের বর্তমান বাস্তবতা বড়ই করুণ। মরা পশুর নদীর পাড়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো ইব্রাহিমের দীর্ঘশ্বাসও আজ লোকালয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন