বয়স বেশি হওয়ার পরও নির্বাচিত, সনদ নিয়ে প্রশ্ন

কয়রায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারীর জনবল নিয়োগে অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ

তরিকুল ইসলাম

কয়রা উপজেলা ফ্যামিলি কার্ড শুমারীর তথ্য সংগ্রহকারী পদে আবেদন করেন মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের শাহনাজ নামে এক নারী। যাচাই-বাছাইয়ের পর বয়স বেশি জনিত কারণ দেখিয়ে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে আবেদনটি বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে প্রকাশিত ফলাফলে তথ্যসংগ্রহকারী হিসেবে তাকে নির্বাচিত করা হয়। একই কারণ দেখিয়ে আবেদন বাতিল করা হয় মহারাজপুর ইউনিয়নের নিগার সুলতানা নামের এক নারীর। তাকেও পরবর্তীতে তথ্যসংগ্রহকারী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।

আবেদনের সময়সীমায় কৃত্রিম সংকট তৈরি, প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে তুচ্ছ কারণে বাদ দেওয়া, রাত তিনটা পর্যন্ত ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ, দেড় মাস পর ফলাফল প্রকাশসহ পুরো প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাচারিতা, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে বলে একাধিক অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহারাজপুর ইউনিয়নে তথ্যসংগ্রহকারী হিসেবে নির্বাচিত নিগার সুলতানার জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দিন বয়স ৪০ বছর ২ মাস ১৮ দিন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সর্বোচ্চ বয়স ৪০ নির্ধারণ করা হলেও তাকে নির্বাচিত করা হয়। তিনি ব্রাকের একটি প্রকল্পে কর্মরত রয়েছেন।

স্নাতক পাশ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস এর শুমারিতে কাজের অভিজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও সেটা মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। মৌখিক পরীক্ষার সময় উপজেলা আইসিটি দপ্তরের সহকারী প্রোগ্রামার জয়ন্ত কুমার মন্ডল দু-একটি প্রশ্ন করলেও মার্কিং করেননি বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, সাত ইউনিয়নে ৮১ জন তথ্যসংগ্রহকারী ও ৮ জন সুপারভাইজার নির্বাচিত করা হয়। এর বিপরীতে ৯৪৯ জনের আবেদন জমা পড়ে। নানা কারণ দেখিয়ে ৩০ জুলাই ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে ৩৫৬ জনের আবেদন বাতিল করা হয় এবং পরদিন শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়। ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষার সময় তিনবার পরিবর্তন করা হয়। ২ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে ব্যবহারিক পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও দুপুর থেকে রাত তিনটা পর্যন্ত নেয়া হয়। এতে পরীক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে। পরে ১৪ সেপ্টেম্বর কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর করা ফলাফল ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় প্রকাশ করা হয়।

এদিকে, পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই আমাদী ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফুল সানা, কয়রা সদর ইউনিয়নের ছাত্রদল নেতা মেহেদী হাসান সবুজ এবং উপজেলা সাইবার দলের সেক্রেটারি হারুন অর রশীদ সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচিত আটজন সুপারভাইজারের মধ্যে ৭ জনসহ অধিকাংশ তথ্য সংগ্রহকারীদের বিএনপির অঙ্গসংগঠনের সাথে সরাসরি জড়িত কিংবা কতিপয় নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠতার তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব মোঃ আবুল কালাম আজাদের ভগ্নিপতি মোঃ আব্দুর রহিমকে তথ্য সংগ্রহকারী পদে নির্বাচিত করার বিষয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন পরীক্ষার্থীরা।

তানিয়া নামে মহারাজপুর ইউনিয়নের এক পরীক্ষার্থী বলেন, আমি এর আগে তিনবার বিবিএস এর আওতায় তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে কাজ করেছি। সারাদিন অপেক্ষা করে রাত ১২টার দিকে মৌখিক পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হয়নি।

উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের আবেদনকারী হায়দার আলী বলেন, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ সত্যায়িত করার কথা বলা হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সত্যায়িত না থাকার অজুহাতে আমার আবেদন বাতিল করা হয়।

তথ্য সংগ্রহকারী পদে আবেদনকারী শারমিন আক্তার বলেন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। এছাড়া স্বামীর সূত্রে আমি মহারাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। এর আগেও বিবিএস এর দুটি শুমারিতে কাজ করি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর আমার আবেদন বাতিল করা হয়।

জিয়াউল হক জানান, বিবিএস এর আওতায় চারবার শুমারির কাজ করেছি। এবারও ভালো পরীক্ষা দিয়েছি। অথচ আমাদের ওয়ার্ড থেকে কাউকেই নেয়া হয়নি।

উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোঃ মাহমুদ হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজনের ছবি প্রকাশ করে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, যুবদলের একজন প্রভাবশালী নেতার সুপারিশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কয়েকজনের নাম ফলাফলের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ ইউনুস আলী ফেসবুকে লেখেন, ‘রাত তিনটা পর্যন্ত ভাইভা নিয়ে নাটক করার দরকার কি ছিল? সরাসরি নেতার সুপারিশ বাস্তবায়ন করতেন।’

এদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মেহেদী হাসান সবুজ প্রশাসনকে উদ্দেশ করে ফেসবুকে অশালীন ভাষায় হুমকি দেন। তিনি কয়রা সদর ইউনিয়নে সুপারভাইজার পদে নির্বাচিত হন।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, বয়স বেশির কারণে বাদ পড়া প্রার্থী আপিল করেন এবং ভাইভা বোর্ডে তার মূল কাগজপত্র দেখে সঠিক মনে হওয়ায় আবেদন গ্রহণ করা হয়। এছাড়া মোঃ আব্দুর রহিম আমার আপন ভগ্নিপতি হলেও তিনি মেধার ভিত্তিতেই নির্বাচিত হয়েছেন।

এ বিষয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, দলীয় কিংবা স্বজনপ্রীতি নয় বরং যথাযথ প্রক্রিয়া শেষ করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতির অভিযোগ পেলে যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন