বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর এখন আর নিছক জল্পনা-কল্পনা নয়, এটি এখন কাঠামোগত পরিবর্তনের পর্যায়ে রয়েছে। নবায়নযোগ্য শক্তির ‘ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ কথাটির গুরুত্ব কমেছে, যা এক ঐতিহাসিক বাস্তবতাও বটে। এই রূপান্তর কেবল জ্বালানির উৎসের পরিবর্তন নয়, বরং কার্বন-নিবিড় এক অপরিচ্ছন্ন পদ্ধতি হতে বেরিয়ে পরিচ্ছন্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে যাত্রা। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনীতিগুলো এখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সংযোজন করে চলেছে। ওই দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে আনছে; পরিবর্তে এক নতুন শিল্প বাস্তবতার পথে এগোচ্ছে। নতুন ওই বাস্তবতায় প্রযুক্তি দ্বারা বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারিত হবে। আগে যেখানে জ্বালানির ’অভাব’ ছিল মূল কথা, ওই ’অভাব’ আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতো। এখন অভাব নয়, প্রযুক্তি-ই হবে মূল কথা। এর স্বাভাবিক অর্থ হচ্ছে, কয়লাকে হঠিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি তার নিজের জায়গা করে নিচ্ছে।
আধুনিক শিল্প ইতিহাসের এক বিশেষ ক্ষণে, নবায়নযোগ্য শক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বৃহত্তম প্রাথমিক উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, পাশাপাশি কয়লাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩৩.৮ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। এটি একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’। চীন ও ভারতসহ বিশ্বের প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোয় জীবাশ্ম জ্বালানি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থিতিশীল রয়েছে অথবা প্রতিনিয়ত কমছে। এ থেকে পরিস্কার যে, বিশ্বের প্রধান জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক রাষ্ট্রগুলোয় পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়ছে, যা কার্যকরভাবে কার্বন যুগের অবসানের সূচনা করছে।
সৌরশক্তির আধিপত্য
বলাই বাহুল্য যে, সৌর ফটোভোল্টাইক (পিভি) প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে; এবং নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে চলেছে। বর্তমানে, সৌর পিভি বিশ্বব্যাপী মোট নতুন বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ পূরণ করে। এটি কেবল প্রবৃদ্ধি নয়; প্রযুক্তির দ্রুতলয়ে এগিয়ে একটি বিদ্যমান ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে চলেছে। গতিপথ পরিস্কার যে, সৌরশক্তি আর কোনো প্রান্তিক সহায়তাকারী নয়, বরং আমাদের ভবিষ্যৎ গ্রিডের প্রধান নিয়ামক। ছোট ছাদভিত্তিক (রুফটপ) সোলার থেকে শুরু করে বিশাল আকারের পিভি স্থাপনের ক্ষমতাটিকে বৈশ্বিক ডিকার্বনাইজেশনের বহুমুখী হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
‘শুধু দিনের বেলার’ ধারণার অবসান
নবায়নযোগ্য শক্তির সবচেয়ে প্রচলিত সমালোচনা হচ্ছে, এটি সবসময় পাওয়া যায় না, অনিয়মিত সরবরাহ করে থাকে; অর্থাৎ রাতের বেলায় যখন সূর্যের আলো থাকে না, তখন এটি পাওয়া যায় না। স্টোরেজ প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ধারণাটির অবসান ঘটেছে, তবে এর উচ্চমূল্য সম্প্রসারণ বা অধিকতর ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক বড় বাধা ছিল। ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থা বর্তমানে আগের তুলনায় অনেক সস্তা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাটারি স্টোরেজের খরচ ৪০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। এই দাম কমে যাওয়া বা মূল্য পতন সৌরশক্তির উপযোগিতাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, পাশাপাশি ডিসপ্যাচেবল স্টোরেজের মাধ্যমে ‘দিনের বেলার সৌরশক্তি’ থেকে ‘যেকোনো সময়ের সৌরশক্তি’-তে রূপান্তর করতে পেরেছে। দিবা ভাগের সর্বোচ্চ সূর্যালোকের সময়ে শক্তি সঞ্চয় করে রাতে তা ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই সঞ্চয় ব্যবস্থাটি কার্যকরভাবে অনিয়মিত সরবরাহ সমস্যাটির সমাধান করেছে এবং নবায়নযোগ্য শক্তিকে একটি নির্ভরযোগ্য, বেস-লোড সক্ষম হিসেবে দেখা দিয়েছে।
পারমাণবিক ও নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে বাংলাদেশ
যদিও বৈশ্বিক সামষ্টিক প্রবণতা পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে, কিন্তু বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় ও স্বল্প-কার্বন লক্ষ্যের দিকে এগিয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুতের কমপক্ষে ৮৫ শতাংশের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস, আমদানিকৃত এলএনজি এবং কয়লার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায় এবং আমদানির খরচও অনেক বেশি হয়। এ কারণে গ্রিডকে স্থিতিশীল করতে ‘বেস-লোড স্বল্প-কার্বন বিদ্যুৎ’-এর কৌশল জোরালোভাবে গ্রহণ ও অনুসরণ করা হয়েছে। স্থিতিশীলকারী হিসেবে ২,৪০০ মেগাওয়াট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকে বিবেচনা করা হচ্ছে। ওই কেন্দ্রের ইউনিট ১-এর কোর ফুয়েল লোডিং ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এটি গ্রিডকে স্থিতিশীল করতে কার্বন-মুক্ত ‘স্থিতিশীলকারী’ হিসেবে কাজ করবে, যা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল উৎসের ওপর নির্ভরশীল হবে।
নবায়নযোগ্য শক্তির মাইলফলক
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)-র তথ্যমতে, সোলার ফটোভোল্টাইক পদ্ধতির মাধ্যমেই বাংলাদেশ ১,৫০০ মেগাওয়াটের বেশি নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করেছে, কিন্তু লক্ষ্য আরও বেশি। এনডিসি (ন্যাশনালি ডিটারমিনেন্ট কন্ট্রিবিউশন বা জাতীয়ভাবে নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার) ৩.০ নীতির আলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০-৫০ শতাংশে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ স্থানীয়ভাবে সোলার প্যানেল, বায়ু বিদ্যুৎ সরঞ্জাম এবং ব্যাটারি স্টোরেজ উৎপাদনের জন্য আর্থিক প্রণোদনা চালু করেছে। যদিও নির্দিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থাগুলো, যেমন কর অব্যাহতি, আমদানি শুল্ক মওকুফ বা সরাসরি ভর্তুকি প্রভৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়নি।
‘ভূমি ও গ্রিড’ প্রতিবন্ধকতা
প্রযুক্তিগত সাফল্য সত্ত্বেও, এই রূপান্তরটি ভৌত এবং কাঠামোগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো ভূমি-স্বল্প একটি দেশে, প্রচলিত সোলার ফার্মগুলো জায়গার সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়, যা ভাসমান সৌর এবং ছাদ-ভিত্তিক সৌর প্রকল্পকে অনেক বেশী আকর্ষণীয় করে তুলেছে। একই সাথে, পরিবর্তনশীল বিদ্যুতের প্রবাহ সামাল দিতে পুরোনো বিতরণ নেটওয়ার্কগুলোতে ব্যাপক “স্মার্ট গ্রিড” বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
১০,০০০ গিগাওয়াটের ভবিষ্যৎ
বিশ্ব ২০৩০ সালের মধ্যে সাড়ে ৯ হাজার হতে দশ হাজারেরও বেশী গিগাওয়াটের একটি ক্রমবর্ধমান নবায়নযোগ্য শক্তি সক্ষমতায় পৌঁছানোর পথে রয়েছে। যদি বর্তমান সম্প্রসারণ মডেলগুলো কার্যকর থাকে, তবে এক দশকের মধ্যেই পরিচ্ছন্ন শক্তি বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ পূরণ করবে। প্রযুক্তিটি এই চাপ সামলাতে পারবে কি না, তা নিয়ে কারও মনে কোনো দ্বিধা নেই। সৌরশক্তি এবং শক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থার জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যয় ব্যাপকহারে কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক যুক্তিতেও ইতোমধ্যে এই ব্যবস্থাটি উতরে গেছে।
আগামী পাঁচ বছরের আসল চ্যালেঞ্জ হলো, আমাদের নীতি কাঠামো ও ভৌত গ্রিডগুলো। লক্ষ্য পূরণের জন্য আমাদের অবশ্যই নীতিকাঠামোগুলোকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে এবং ভৌত গ্রিডগুলোরও উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এ কারণে পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসগুলোকে সফলভাবে কাজে লাগাতে, নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য, দেশে ‘স্মার্ট গ্রিড’ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। বলাইবাহুল্য, এজন্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাংকগুলো যাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে পারে, এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি তহবিল গঠন করতে পারে। যে তহবিল হতে বিনা সুদে ব্যাংকগুলোকে তাদের চাহিদামতো অর্থ জোগান দেবে এবং
ব্যাংক প্রধানত : ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ সুদে তা বিতরণ করবে।
২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০-৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে একটি জাতীয় জ্বালানি সঞ্চয় রোডম্যাপও তৈরি করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, যখন ‘শুধু দিনের বেলায়’ বিদ্যুৎ ব্যবহারের যুগ শেষ হয়ে যাবে এবং নবায়নযোগ্য শক্তি বৈশ্বিক ভিত্তি হিসেবে তার স্থান দখল করে নেবে, তখন আমরা কি দশ হাজার (১০,০০০) গিগাওয়াটের একটি বিশ্বের অংশীদার হওয়ার আশায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করব, নাকি আমাদের জীবদ্দশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্প পরিবর্তনকে অতীতের সীমাবদ্ধতার দ্বারা বাধাগ্রস্ত হতে দেব?
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও পরিবেশ বিষয়ক গবেষক।
খুলনা গেজেট/এএজে

