আঞ্চলিকতার গণ্ডি পেরিয়ে

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলো ছড়াচ্ছে খুলনা গেজেট

মামুন অর রশিদ

“আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অসংখ্য নামসর্বস্ব পোর্টাল ও হলুদ সাংবাদিকতার ভিড়ে আসল, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রায় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই নৈরাজ্যের বাজারে খুলনা গেজেট তার নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে চলেছে। বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সংবাদ পরিবেশন ছাড়াও দায়বদ্ধতা রয়েছে পাঠকের তথ্যের অধিকার ও আস্থার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।”

‘সবার আগে সঠিক খবর’ এই স্লোগানকে বুকে ধারণ করে ২০২০ সালের ১৩ জুলাই অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে khulnagayette.পড়স। এরপর দীর্ঘ পথ পরিক্রমা পেরিয়ে ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট পত্রিকাটি এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করে। চার পাতার রঙিন প্রিন্ট ভার্শন বা কাগুজে সংস্করণ প্রকাশের মধ্য দিয়ে পাঠকের হাতে নতুন এক মাত্রা নিয়ে হাজির হয় খুলনা গেজেট। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অনলাইন ও অফলাইন যাত্রাই আজ পত্রিকাটিকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়।

পথচলার শুরু ও পটভূমি
খুলনা গেজেটের সাথে আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক এই প্রতিষ্ঠানটির জন্মলগ্নেরও অনেক আগের। সংশ্লিষ্টদের সাথে বিভিন্ন জনপরিসরে পত্রিকা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলাপচারিতা হয়। খুলনা বাংলাদেশের অন্যতম তৃতীয় বৃহত্তম এবং শিল্পসমৃদ্ধ একটি নগরী। এই জনপদে শিক্ষার প্রসার ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার চিত্র বেশ সমৃদ্ধ। এখানে রয়েছে মেডিকেলসহ চারটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিকেল কলেজ এবং তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও রয়েছে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ও দপ্তর। প্রায় অর্ধকোটির মানুষের বাস খুলনা বিভাগীয় শহরে। সুতরাং সংবাদপত্রের পাঠক-দর্শকের সংখ্যাটাও নেহায়েত কম নয় এখানে।

অতএব একটি জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে এক ডজনেরও বেশি স্থানীয় পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করা গেছে যে, প্রচলিত এই সংবাদমাধ্যমগুলো সাধারণ পাঠকের ক্রমবর্ধমান তথ্য ও সংবাদ চাহিদা শতভাগ পূরণে অনেকটাই ব্যর্থ হচ্ছিল। সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের সেই আস্থার সংকট ও ক্ষোভ থেকেই একটি পূর্ণাঙ্গ, আধুনিক ও বস্তুনিষ্ঠ ডিজিটাল নিউজ পোর্টাল হিসেবে আর্বিভাব ঘটে ‘খুলনা গেজেট’-এর।

নামকরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
‘খুলনা গেজেট’ নামটি কেবল একটি পরিচয় নয়, এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে সাংবাদিকতার এক সুদূর প্রসারী ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। এই নামকরণের পেছনের ইতিহাসটি সত্যিই দারুণ ও মননশীল। নামটির সাথে গভীর মিল খুঁজে পাওয়া যায় ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রকাশিত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুদ্রিত পত্রিকা ‘হিকিস বেঙ্গল গেজেট’-এর সাথে।

জেমস অগাস্টাস হিকি প্রতিষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক পত্রিকার অন্য একটি নাম ছিল ‘ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভারটাইজার’। উপমহাদেশের সাংবাদিকতার সেই আঁতুড়ঘরের ঐতিহ্য এবং সাহসিকতাকে মনে করিয়ে দেয় খুলনা গেজেটের নাম। ইতিহাসের সেই শক্তিকে ধারণ করেই বর্তমান যুগের আধুনিক ডিজিটাল প্লাটফর্মে পথ চলছে এই সংবাদমাধ্যমটি।

উদ্যমী ও দক্ষ সংবাদকর্মীদের অবদান
যেকোনো গণমাধ্যমের প্রাণশক্তি হলো তার কর্মীবাহিনী। খুলনা গেজেটের সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক ঝাঁক তরুণ, উদ্যমী, সাহসী ও দক্ষ সংবাদকর্মীর নিরলস পরিশ্রম। মাঠপর্যায়ের কঠোর বাস্তবতাকে মোকাবিলা করে তারা প্রতিদিন যে সংবাদ সংগ্রহ করেন, তাতেই সমৃদ্ধ হয় পোর্টালের পাতা।

সাংবাদিকতার নীতি ও নৈতিকতাকে সমুন্নত রেখে এই কর্মীরা শুধু খুলনার স্থানীয় সমস্যা বা সম্ভাবনার কথাই তুলে ধরছেন না, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুও অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করছেন। তাদের এই সম্মিলিত শ্রম ও পেশাদারিত্বই পোর্টালটিকে আজকের এই শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

কেন অনন্য খুলনা গেজেট?
আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অসংখ্য নামসর্বস্ব পোর্টাল ও হলুদ সাংবাদিকতার ভিড়ে আসল, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রায় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই নৈরাজ্যের বাজারে খুলনা গেজেট তার নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে চলেছে। মূলমন্ত্র হল বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সংবাদ পরিবেশন করা। এছাড়াও দায়বদ্ধতা রয়েছে পাঠকের তথ্যের অধিকার ও আস্থার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। সংবাদ শুধু আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা নয়, তথ্য দেওয়া নয়, বরং বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল স্টোরি টেলিং বা মনস্তাত্ত্বিক ও দৃশ্যমান গল্প বলার শৈলী ব্যবহার করে সংবাদ পরিবেশন করা। অন্যান্য অনেক পোর্টাল যখন কেবল ভিউ বা ক্লিকের পেছনে ছোটে, তখন খুলনা গেজেট বিশ্বাস করে দায়িত্বশীল ও মানসম্মত সাংবাদিকতায়। আর এই আদর্শগত দৃঢ়তাই পত্রিকাটিকে সমসাময়িক অন্যান্য গণমাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে।

খুলনা গেজেটের অনলাইন পোর্টাল এবং এর মেনু বিন্যাস কেবল গতানুগতিক সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পাঠকের সার্বিক রুচি ও প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে এর ক্যাটাগরিগুলো অত্যন্ত সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। হাইপারলিংক ও সেকশনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, খুলনাঞ্চল, খেলা, বিনোদন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক, অর্থনীতি, শিক্ষা, মুক্ত ভাবনা, ইসলাম ও জীবন, গেজেট এক্সক্লুসিভ এবং ‘আরও’ অপশন।

এর পাশাপাশি পোর্টালটির ড্রপ-ডাউন ও সাব-মেনুতে বৈচিত্র্যময় সব বিষয়ের সমাহার রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ হলো :

বিশেষ ইভেন্ট ও টুর্নামেন্ট : ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২৬, ফিফা বিশ্বকাপ-২০২২ এবং বিশেষ নির্বাচনভিত্তিক কভারেজ যেমন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৩ ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন-২০২৩।

বিনোদনমূলক কনটেন্ট : ফটো গ্যালারি, ভিডিও গ্যালারি ও চিত্র বৈচিত্র্য।

জীবনধারা ও মননশীল চর্চা : ইসলাম ও জীবন, আইটি, লাইফ স্টাইল, চিকিৎসা, সাহিত্য এবং মুক্ত ভাবনা।

অন্যান্য : সোশ্যাল মিডিয়া, বিশ্ব জয়ের রোমাঞ্চকর আসর এবং বিভিন্ন এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন বা ‘আরও’ সেকশনের নানা বিষয়। সব মিলিয়ে, রাজনীতি ও অর্থনীতির গাম্ভীর্যের পাশাপাশি খেলাধুলা, প্রযুক্তি, সাহিত্য ও জীবনধারার নানা উপাদানের এক নিখুঁত সমন্বয় ঘটেছে খুলনা গেজেটের এই বিস্তৃত মেনু ও ক্যাটাগরিগুলোতে, যা সব বয়সের ও শ্রেণির পাঠকের তথ্য ও বিনোদনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

১০ জেলার পাঠকদের মেলবন্ধন
খুলনা বিভাগে রয়েছে মোট ১০টি জেলা খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর। এই বিশাল অঞ্চলের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সমস্যা ও সাফল্যের কথা মাথায় রেখেই পত্রিকার ওয়েবসাইট ও কনটেন্ট বিন্যাস (নেভিগেশন) করা হয়েছে। প্রতিটি জেলার রুটিন সংবাদের পাশাপাশি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে বৃহত্তর খুলনার প্রতিটি কোণ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও এখন নিজেদের কথা প্রকাশের একটি বিশ্বস্ত মাধ্যম হিসেবে খুলনা গেজেটকে বেছে নিয়েছে।

আঞ্চলিকতা পেরিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
বর্তমানে বিভাগীয় শহর খুলনা থেকে প্রায় এক ডজন পত্রিকা নিয়মিত প্রিন্ট ও অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে। এই তুমুল প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা এবং নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করা চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে খুলনা গেজেট আজ শুধু খুলনা অঞ্চলের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই।

ডিজিটাল মাধ্যমের অবারিত সুযোগ এবং প্রিন্ট সংস্করণের গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে পত্রিকাটি এখন জাতীয় সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলো ছড়াচ্ছে। প্রবাসে বসবাসকারী খুলনা বিভাগের মানুষের কাছে এটি এখন শেকড়ের খবর পাওয়ার প্রধান জানালা।

পরিশেষে বলা যায়, সঠিক পরিকল্পনা, সৎ সাংবাদিকতা এবং পাঠকের ভালোবাসাকে সম্বল করে খুলনা গেজেট যে পথচলা শুরু করেছিল, তা আজ একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। আগামী দিনেও সত্যের পক্ষে এই অপ্রতিরোধ্য যাত্রা অব্যাহত থাকবে, এটাই প্রতিটি সচেতন পাঠকের প্রত্যাশা।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো বোল্ডার এবং সহযোগী অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন