দৈনিক খুলনা গেজেট ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

ড. খ. ম. রেজাউল করিম

“দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংবাদপত্র জগতে দৈনিক খুলনা গেজেট তার বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, জাতীয় স্বার্থরক্ষা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে গণমানুষের আস্থা অর্জন করেছে। আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান থেকে শুরু করে স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে পত্রিকাটি প্রতিনিয়ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে।”

চলমান জীবনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। সংবাদপত্র পৃথিবীকে মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, মানবাধিকার উন্নয়ন ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ এবং গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সংবাদপত্রের ভূমিকা সর্বাধিক। এক কথায় একটি দেশ বা জাতির গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সংবাদপত্রের অনন্য ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যূত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যূত্থান, জুলাই গণঅভ্যূত্থান থেকে শুরু করে মানুষের সকল অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নে সংবাদপত্রের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

সংবাদপত্র জীবন ও জগতের প্রতিদিনের খবরাখবর দিয়ে মানুষের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ, সমৃদ্ধ ও গতিশীল করে, তেমনি সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় উন্নতি ও মানবিক চেতনার বিকাশে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে। এক সময়ে সর্বত্র শুধু অফলাইন বা ছাপা পত্রিকা চালু থাকলেও আধুনিক বিশ্বে অনলাইন ও অফলাইন উভয় প্রকার সংবাদপত্র চোখে পড়ে। দৈনিক অফলাইন সংবাদপত্রে সাধারণত প্রতিদিনের সংবাদ পরদিন প্রকাশিত হয়। কিন্তু অনলাইন নিউজ পোর্টালের ক্ষেত্রে দিনের সংবাদ দিনে এবং মুহূর্তের সংবাদ মুহূর্তেই প্রকাশ করা হয়। তাই অনলাইন পত্রিকার কাছে ছাপানো পত্রিকার পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ এই তাৎক্ষণিক সংবাদ প্রচারের বিষয়টি। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে মানুষ দ্রুত তথ্য জানতে চায়। ফলে তারা অনলাইন মিডিয়ার উপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অনেক সময় বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সংবাদ প্রচারের আগেই অনলাইনে সে খবর চলে আসে। এজন্য দেশ-বিদেশে অনলাইন সংবাদপত্র বা অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই দেশে দিন দিন স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অনলাইন পত্রিকার বিস্তার বেড়েই চলেছে। তারই ধারাবাহিকতায় খুলনার অনলাইন পত্রিকা খুলনা গেজেটও তাদের চৌকস জনবলের মাধ্যমে দেশের জনগণের কাছে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ দায়িত্ব নিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে। গত বছর পত্রিকাটি অফলাইন বা ছাপা ভার্সন শুরু করে, যা বর্তমান যুগে খুবই চ্যালেঞ্জিং ও সাহসী উদ্যোগ।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংবাদপত্র জগতে দৈনিক খুলনা গেজেট তার বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, জাতীয় স্বার্থরক্ষা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে গণমানুষের আস্থা অর্জন করেছে। আঞ্চলিক সমস্যার সমাধান থেকে শুরু করে স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে পত্রিকাটি প্রতিনিয়ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে। আজ পত্রিকাটি (অনলাইন) ৭ম বছরে এবং অফলাইন (ছাপা ভার্সন) পত্রিকা ২য় বছরে পদার্পন করতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পত্রিকাটির সম্পাদক, সাংবাদিক এবং প্রকাশের সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আমি খুলনা গেজেটের একজন নিয়মিত পাঠক ও অনিয়মিত লেখক। আমার লেখা ৫০টিরও অধিক আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সমাজ সচেতনতামূলক প্রবন্ধ পত্রিকাটি অত্যন্ত দায়িত্ব নিয়ে ছাপিয়েছে। আমি লক্ষ করেছি সংবাদ পরিবেশনে খুলনা গেজেট সবসময় বস্তুনিষ্ঠতা, জবাবদিহিতা ও জাতীয় স্বার্থ বজায় রাখার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে কোনো ঘটনার সত্যতা তুলে ধরতে আপসহীন ভূমিকা পালন করে আসছে। কোনো কোনো জনপ্রিয় পত্রিকা স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে সাহস পায় না। এদিক থেকে খুলনা গেজেট অনেকটাই ভিন্ন। সত্য প্রকাশে পত্রিকাটি অনেক সময় ঝুঁকিও নিয়ে থাকে। এ পত্রিকার প্রতিবেদনে দল-মত নির্বিশেষে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখায় ইতোমধ্যে সর্বমহলে প্রশংসা অর্জন করেছে। খুলনা থেকে প্রকাশিত অন্যান্য পত্রিকায় বিশেষজ্ঞদের কলাম এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তেমন ভূমিকা চোখে পড়ে না। এক্ষেত্রেও খুলনা গেজেট সত্যিই ব্যতিক্রম। পত্রিকাটি শুরু থেকেই স্থানীয়-জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রবন্ধ সংগ্রহ করে ছাপিয়ে চলেছেন। প্রাবন্ধিকগণও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই তাদের কলম চালিয়ে যাচ্ছেন।

যেমন: বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের পদ্মাসেতু উদ্বোধনের এক মাস আগে থেকে সেতুর আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃৃতিক নানা বিষয় নিয়ে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ কলাম প্রকাশ করেছে এ পত্রিকা। এরপর সেই প্রবন্ধগুলো নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করেছে, যাকে জাতীয় দলিল বললেও অত্যুক্তি হবে না। এছাড়া খুলনার স্থানীয় আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে এ পত্রিকা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে আসছে।

খুলনা গেজেট প্রকাশের অল্পদিনের মধ্যেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এর কারণ সংবাদ পরিবেশনে এর আপসহীন অবস্থান ধরে রাখা। বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করা এবং জনগণকে বিভিন্ন ইস্যুতে সচেতন করার ক্ষেত্রেও খুলনা গেজেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার। সত্য সবসময় শক্তি হিসেবে কাজ করে। খুলনা গেজেট সেই লক্ষ্যেই কাজ করে বলে আমার ধারণা। সামাজিক দায়বদ্ধতা কোনো সাময়িক কাজ নয়, এটি একটি ধারাবাহিক অঙ্গীকার। খুলনা গেজেট পত্রিকাটি খুলনা অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন ও সংগ্রামের সারথি হয়ে সেই দায়বদ্ধতা নিরলসভাবে পালন করে চলেছে। আঞ্চলিক গণমাধ্যম হিসেবে স্থানীয় মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে বস্তুনিষ্ঠ সত্য প্রকাশের এই যাত্রা খুলনা গেজেটকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমাজ গঠনের এক শক্তিশালী আলোকবর্তিকায় পরিণত করেছে। আগামী দিনেও খুলনা গেজেটের এ ধারা অব্যাহত থাকবে, এটা আমার বিশ্বাস। আমি খুলনার অন্যতম মুখপাত্র খুলনা গেজেট পত্রিকার উত্তোরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান এবং অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা।

খুলনা গেজেট/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন