বাঘ দেখতে নয়, সুন্দরবন বুঝতে আসুক পর্যটক

মোঃ মামুন হাসান

সুন্দরবনের কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে একটি বাঘ। পর্যটকের ক্যামেরা নদীর ওপারে স্থির হয়, চোখ খোঁজে ডোরাকাটা শরীর। বাঘ দেখা গেলে ভ্রমণ সার্থক, না দেখলে যেন সুন্দরবন দেখা অসম্পূর্ণ। অথচ সুন্দরবনকে দেখার এই অভ্যাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল।

সুন্দরবন কোনো চিড়িয়াখানা নয়, যেখানে দর্শনার্থীর প্রত্যাশা পূরণ করতে বন্যপ্রাণীকে সামনে আসতে হবে। সুন্দরবন একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। জোয়ার ভাটা, কেওড়ার শ্বাসমূল, গোলপাতার গন্ধ, নদীর স্রোত, হরিণের পায়ের ছাপ, মৌয়ালের ঝুঁকিপূর্ণ জীবন, জেলের অপেক্ষা এবং অদৃশ্য বাঘের উপস্থিতি মিলেই সুন্দরবন। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত বাঘ দেখা গেল কি না, তা নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, ফিরে এসে আমরা সুন্দরবনকে কতটা বুঝলাম।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের সুন্দরবন পর্যটন নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটকসহ সাধারণ মানুষের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়। জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর প্রজননকাল বিবেচনায় নেওয়া এই নিষেধাজ্ঞা সুন্দরবন সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। চলতি বছরও এই তিন মাসের বিরতির পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন পর্যটকদের জন্য আবার খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর শুধু পর্যটন মৌসুম শুরুর তারিখ নয়, এটি সুন্দরবনের সঙ্গে আমাদের নতুন সম্পর্কেরও একটি সুযোগ।

প্রশ্ন হলো, সুন্দরবন খুলবে, কিন্তু আমরা কি আমাদের পুরোনো পর্যটন চিন্তাটিও খুলে রাখব? ২০২৩ থেকে ২০২৪ অর্থবছরে সুন্দরবনে প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ৬২২ জন। একই সময়ে সুন্দরবন থেকে পর্যটন খাতে সরকারের রাজস্ব এসেছে প্রায় ৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অর্থাৎ মানুষের আগ্রহ আছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের সুন্দরবনের অবস্থান এখনো তার সম্ভাবনার তুলনায় অনেক ছোট।

অন্যদিকে ২০১৫ থেকে ২০১৬ অর্থবছরে সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা দুই লাখের বেশি হয়েছে। পর্যটক বাড়ছে, কিন্তু তার সঙ্গে কি বাড়ছে সুন্দরবনকে বোঝার সুযোগ, স্থানীয় মানুষের আয়, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পর্যটনের গুণগত মান? এখানেই আমাদের থামতে হবে। কারণ পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো সহজ। কিন্তু সুন্দরবনের ওপর চাপ না বাড়িয়ে পর্যটনের মূল্য বাড়ানো কঠিন। আমাদের তাই গণপর্যটনের ধারণা থেকে সরে এসে অর্থবহ পর্যটনের দিকে যেতে হবে। বাঘ দেখার পর্যটন নয়, সুন্দরবন বোঝার পর্যটন।

পাশের দেশ ভারতের সুন্দরবন আমাদের জন্য এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনার জায়গা। পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনকে শুধু বাঘ দেখার স্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না। ম্যানগ্রোভ বন, বন্যপ্রাণী, নদী, নৌভ্রমণ, স্থানীয় জীবন ও প্রকৃতিকে মিলিয়ে সেখানে পর্যটকের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা তৈরি করা হয়েছে। পর্যটনকে শুধু একটি স্থান পরিদর্শন হিসেবে না দেখে একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা সেখানে স্পষ্ট।

আমাদেরও এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে। তবে ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং দুই দেশের সুন্দরবনকে বৃহত্তর একটি আন্তঃসীমান্ত পর্যটন পরিমণ্ডল হিসেবে ভাবা যেতে পারে। একই ম্যানগ্রোভ অরণ্যের দুই প্রান্তে দুই দেশের মানুষ, নদী, সংস্কৃতি, জীববৈচিত্র্য ও জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে বিশ্বের অন্যতম অনন্য পরিবেশবান্ধব পর্যটন অঞ্চল। কিন্তু তার আগে বাংলাদেশের সুন্দরবনকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

ধরা যাক, একজন পর্যটক তিন দিনের জন্য সুন্দরবনে গেলেন। প্রথম দিন তিনি শুধু নৌকায় ঘুরলেন না, একজন প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইডের কাছ থেকে জানলেন জোয়ার ভাটার বিজ্ঞান। দ্বিতীয় দিন তিনি জানলেন মৌয়ালদের জীবন, মধু সংগ্রহের ঝুঁকি এবং বননির্ভর মানুষের বাস্তবতা। তৃতীয় দিন তিনি খেলেন স্থানীয় খাবার, কিনলেন স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্য এবং জানলেন সুন্দরবনের সঙ্গে উপকূলীয় মানুষের সম্পর্ক।

এটি আর সাধারণ ভ্রমণ নয়। এটি হয়ে উঠতে পারে শিক্ষাভিত্তিক পর্যটন। এমনকি সুন্দরবনে চালু করা যেতে পারে একটি ‘সুন্দরবন পর্যটন পরিচয়পত্র’। পর্যটক কোথায় গেলেন, কী শিখলেন, কোন গাছ বা পাখি চিনলেন, স্থানীয় মানুষের কোন গল্প শুনলেন, কতটা পরিবেশবান্ধব আচরণ করলেন, স্থানীয় অর্থনীতিতে কীভাবে অবদান রাখলেন, তার একটি স্মারক হিসেবে এটি দেওয়া যেতে পারে। তখন পর্যটকের সাফল্য মাপা হবে কতটি ছবি তুলেছেন তা দিয়ে নয়, কতটি বিষয় বুঝেছেন তা দিয়ে। এটাই হতে পারে সুন্দরবন পর্যটনের নতুনত্ব।

সুন্দরবনকে শুধু পর্যটনকেন্দ্র বানালে চলবে না, তাকে বানাতে হবে অভিজ্ঞতার গন্তব্য। পর্যটক এখানে এসে শুধু দেখবেন না, শিখবেন; শুধু ছবি তুলবেন না, গল্প নিয়ে ফিরবেন; শুধু অর্থ ব্যয় করবেন না, স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবেন; শুধু আনন্দ নেবেন না, সুন্দরবন রক্ষার দায়িত্বও অনুভব করবেন।

বাংলাদেশের জন্য এ ভাবনার সময়ও এসেছে। সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, পর্যটনের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

এখন প্রয়োজন সেই পরিকল্পনাকে বাস্তব জীবনের পর্যটন ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া। সুন্দরবনের পর্যটন উন্নয়ন মানে শুধু নতুন ভবন, নতুন জেটি কিংবা আরও বেশি নৌযান নয়। উন্নয়ন হতে পারে প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড, নিরাপদ নৌযান, নির্দিষ্ট নৌপথ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দ নিয়ন্ত্রণ, পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল টিকিট ব্যবস্থা, স্থানীয় খাবারের পরিচিতি, স্থানীয় পণ্য বিক্রির সুযোগ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থান।

বিশেষ করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী ও আশপাশের জনপদকে শুধু সুন্দরবনে যাওয়ার প্রবেশপথ হিসেবে দেখলে হবে না। এসব এলাকাকে গড়ে তুলতে হবে সুন্দরবনভিত্তিক পর্যটন অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে।

একজন পর্যটক সুন্দরবনে যাওয়ার আগে স্থানীয় বাজারে যাবেন, স্থানীয় খাবার খাবেন, কাঁকড়া ও মাছের অর্থনীতি জানবেন, মধু ও মোমজাত পণ্য কিনবেন, স্থানীয় মানুষের জীবন দেখবেন। এতে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের অর্থ কেবল নৌযান বা নির্দিষ্ট ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ছড়িয়ে পড়বে পুরো জনপদে। তবে সবকিছুর আগে মনে রাখতে হবে, সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ বাঘ নয়। বাঘ সুন্দরবনের প্রতীক, কিন্তু সুন্দরবন নিজেই একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী।

একটি বাঘ পর্যটককে আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ ম্যানগ্রোভ বন উপকূলকে রক্ষা করে, জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখে, স্থানীয় মানুষের জীবনকে নিরাপত্তা দেয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই সুন্দরবনের পর্যটন নীতির প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, বছরে কত লাখ পর্যটক আনা যাবে। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কতজন পর্যটক এনে সুন্দরবনের ক্ষতি না করে পর্যটনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য বাড়ানো যাবে। হয়ত আমাদের লক্ষ্য হবে না একদিনে দশ লাখ পর্যটক আনা। বরং লক্ষ্য হতে পারে এমন এক লাখ পর্যটক তৈরি করা, যারা সুন্দরবন দেখে ফিরে গিয়ে সুন্দরবনের কথা বলবেন, সুন্দরবন রক্ষার কথা বলবেন।

একজন পর্যটক সুন্দরবনে এসে যদি একটি প্লাস্টিকের বোতল ফেলে যান, তিনি কেবল একজন পর্যটক। কিন্তু ফিরে গিয়ে যদি বলেন, ‘সুন্দরবনকে বাঁচানো দরকার’, তাহলে তিনি হয়ে উঠলেন সুন্দরবনের একজন দূত। ১লা সেপ্টেম্বর যখন আবার সুন্দরবনের নদীতে পর্যটকবাহী নৌযান চলবে, তখন শুধু নতুন পর্যটন মৌসুমের কথা ভাবলে হবে না। ভাবতে হবে নতুন পর্যটন দর্শনের কথা। সেদিন সুন্দরবনের দরজা খুলবে ঠিকই। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে আমরা কী নিয়ে ঢুকব, সেটিই আসল প্রশ্ন। ক্যামেরা নিয়ে, নাকি কৌতূহল নিয়ে? বাঘের ছবি নিয়ে ফিরব, নাকি সুন্দরবনের গল্প নিয়ে?

আমাদের প্রত্যাশা হওয়া উচিত এমন একটি দিন, যেদিন একজন পর্যটক বাঘ না দেখেও সুন্দরবন থেকে ফিরে বলবেন, “আমি সুন্দরবন দেখতে যাইনি, সুন্দরবনকে বুঝতে গিয়েছিলাম।” সেদিনই সুন্দরবন একটি পর্যটন গন্তব্যের চেয়ে বড় কিছু হয়ে উঠবে। হয়ে উঠবে একটি জীবন্ত শিক্ষালয়, একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের এক অনন্য পাঠশালা।

লেখক : ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন