বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ মিলিয়ন (৩ কোটি) মানুষ খাদ্যজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে দেশে কোভিড-১৯, হাইপ্যাথোজেনিসিটি এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (এইচপিএআই), নিপাহ, লাম্পি স্কিন, হামসহ নানা রোগ দ্রুত ছড়াচ্ছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম ‘ভেজাল খাবার’। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে শাকসবজি, ফলমূল এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধে পর্যন্ত ভেজালের থাবা বিস্তৃত। প্রতিদিনের খাবারে অজান্তেই মিশে যাচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, যা ধীরে ধীরে আমাদের শরীরের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শহর থেকে গ্রাম- সব জায়গাতেই এই ঝুঁকি বাড়ছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি কেবল হুমকি নয় বরং একটি নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ভেজাল খাবার থেকে পরিত্রাণে আধুনিক বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে ভেজাল খাবারের সমস্যা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (BFSA)-এর তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরীক্ষিত ১৭১৩টি খাদ্য নমুনার মধ্যে ৫৭১টি (৩৩.৩%) অসুরক্ষিত পাওয়া গেছে। এতে অ্যাডাল্টারেশন, কনট্যামিনেশন এবং নিম্নমানের পুষ্টি উপাদান মিলেছে। চিপস, সস, পিকলস, ফলের জুস, তেল, মধুসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাবারেই ভেজালের ছড়াছড়ি। এই পরিস্থিতিতে ২০২৫-২০৩০ সালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ডায়েটারি গাইডলাইনস (DGA) এবং উল্টানো ফুড পিরামিড (inverted food pyramid) একটি আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। এটি “Eat Real Food” বা প্রকৃত খাবার খাওয়ার উপর জোর দিয়ে ভেজাল ও অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে দূরে থাকার পথ দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশে ভেজাল খাবার একটি সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সংকট। দুধে পানি মেশানো, তেলে অন্য তেল মিশ্রণ, ফলে ফরমালিন, মাছে ডিডিটি, মসলায় ইউরিয়া বা রং এসব নিত্য ঘটনা। গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারের ৪০-৭০% খাবারেই কোনো না কোনো ধরনের ভেজাল রয়েছে। এর ফলে ক্যান্সার, লিভার সমস্যা, কিডনি ফেলিয়র, শিশুদের বৃদ্ধি ব্যাহত, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্যজনিত অসুস্থতায় ভোগেন, যা দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। প্রক্রিয়াজাত খাবার ভেজালের প্রধান আধার। এগুলোতে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, ট্রান্স ফ্যাট, প্রিজারভেটিভ, কৃত্রিম রং ও স্বাদবর্ধক যোগ করা হয়। কারখানায় উৎপাদিত চিপস, কোল্ড ড্রিঙ্কস, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, রেডি-টু-ইট খাবার এসবই সস্তা ও সুস্বাদু করে বাজারজাত করা হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। BFSA-এর প্রতিবেদনে চিপসে অ্যাক্রিলামাইড, তেলে মান নষ্ট, মধুতে ভেজালের উল্লেখ আছে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, অর্গানিক ডায়েট গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে শরীরে পেস্টিসাইডের মাত্রা ৬০% এরও বেশি কমে যায়। শরীরকে সুস্থ রাখতে সবার আগে আমাদের অর্গানিক খাবার কী এবং কেন প্রয়োজন তা জানতে হবে। অর্গানিক খাবার বলতে বোঝায় এমন খাদ্য যা উৎপাদনে কোনো সিন্থেটিক সার, কীটনাশক, হরমোন বা জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম (wRGgI) ব্যবহার করা হয় না। এতে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা, জৈব সার (কম্পোস্ট, গোবর), ফসলের ঘূর্ণন ও প্রাকৃতিক কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, অর্গানিক খাবারে পুষ্টিগুণ বেশি থাকে। ভিটামিন সি, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাসের মাত্রা প্রচলিত খাবারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পেস্টিসাইডের মাত্রা অনেক কম, যা ক্যানসার, হরমোনাল সমস্যা, শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা কমায়। পরিবেশের জন্যও এটি অপরিহার্য। অর্গানিক চাষ মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে, জীববৈচিত্র্য বাড়ায়, পানি দূষণ কমায় এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সাহায্য করে। প্রচলিত চাষে রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটিকে বন্ধ্যা করে ফেলে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব আরও বেশি। এখানে কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও ফরমালিনের ব্যবহার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়েছে। ফলে বর্তমানে সচেতন মানুষ অর্গানিকের দিকে ঝুঁকছেন।
অর্গানিক আন্দোলনের পথিকৃৎদের মধ্যে স্যার অ্যালবার্ট হাওয়ার্ড অন্যতম। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হাওয়ার্ড ১৯০৫-১৯২৪ সালে ভারতের পুসায় কাজ করতে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় চাষ পদ্ধতি অধ্যয়ন করেন। তাঁর বই An Agricultural Testament (১৯৪০) অর্গানিক চাষের বাইবেল হিসেবে পরিচিত। তিনি মাটিকে জীবন্ত প্রাণী হিসেবে দেখেছিলেন এবং কম্পোস্টিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর স্ত্রী গ্যাব্রিয়েল ও পরবর্তী স্ত্রী লুইসও এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লেডি ইভ বালফোর ১৯৩৯ সালে হাউলি এক্সপেরিমেন্ট শুরু করেন, যেখানে অর্গানিক ও প্রচলিত চাষের তুলনামূলক গবেষণা হয়। ১৯৪৬ সালে তিনি সয়েল অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও ব্রিটেনের অর্গানিক আন্দোলনের মূল স্তম্ভ। তাঁর বই ঞযব খরারহম ঝড়রষ মাটির স্বাস্থ্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্রে জে.আই. রোডেল ১৯৪০-এর দশকে অর্গানিক গার্ডেনিং ম্যাগাজিন প্রকাশ করে জনপ্রিয় করেন। রোডেল ইনস্টিটিউট আজও গবেষণা ও প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া রুডলফ স্টেইনারের বায়োডায়নামিক অ্যাগ্রিকালচার অর্গানিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। এই পথিকৃৎদের কাজ আজ বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করছে।
এই অগ্রদূতেরা শুধু খাবার উৎপাদন করছেন না, সচেতনতা তৈরি করছেন। ওয়ার্কশপ, সেমিনার, সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তাঁরা মানুষকে বলছেন : “তোমার প্লেটের খাবারই তোমার ওষুধ।”একজন কৃষক নেতা বলেন, “রাসায়নিক ছাড়া চাষ করলে মাটি বাঁচে, মানুষ বাঁচে।” নারী কৃষকরা হোমস্টেড গার্ডেনিং করে পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, অর্গানিক খাবার গ্রহণকারীদের মধ্যে ডায়াবেটিস, মেটাবলিক সিন্ড্রোমের ঝুঁকি কম। শিশুদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।
গত ৭ জানুয়ারি মার্কিন হেলথ সেক্রেটারি রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র আমেরিকানদের জন্য নতুন খাদ্য নির্দেশিকা ঘোষণা করেন। নতুন নির্দেশিকার অংশ হিসেবে তিনি বলেন, আগের খাদ্য নির্দেশিকায় প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বিকে ভুলভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি মানবদেহের জন্য অপরিহার্য, এবং দীর্ঘদিন ধরে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের বিরুদ্ধে যে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে এখন সরে আসা হচ্ছে। এই নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য হলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া, পাশাপাশি প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরা। আগের ফুড পিরামিডে শস্যজাত খাবার-বিশেষ করে ভাত ও রুটি-খাদ্যতালিকার সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে থাকত। এর পেছনে মূল যুক্তি ছিল শক্তির জোগান নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে যখন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ ও স্থূলতা বিশ্বব্যাপী মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে, তখন কেবল ক্যালোরির পরিমাণ নয়, খাবারের গুণগত মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রে চষধঃবও আধুনিক খাদ্য নির্দেশনার মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে-সব খাবার সমান নয়; কী খাচ্ছি, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই পিরামিডের লক্ষ্য হরমোন ভারসাম্য, বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ।
হঠাৎ করে ২০২৬ সালে খাদ্য পিরামিড কেন বদলালো- এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এত বছর ধরে কম ফ্যাট, বেশি শস্যের যে ধারণা আমাদের খাওয়ানো হয়েছে, তার ফল কী হয়েছে সেটা এখন লুকানোর কিছু নেই। ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হরমোনজনিত সমস্যা, অটোইমিউন ডিজিজ কমেনি। গবেষণা বহু আগেই দেখাচ্ছিল, সমস্যা শুধু ক্যালোরিতে না, সমস্যা খাবারের প্রকৃতিতে। কিন্তু বিজ্ঞান একা নীতি বদলায় না। রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের ভূমিকা ছিল এই জমে থাকা প্রশ্নগুলোকে নীতিনির্ধারণের টেবিলে থুলে আনা। তিনি পিরামিড বানাননি, তিনি উপেক্ষা করার জায়গাটা সরিয়ে দিয়েছেন। ফলে বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা সত্যগুলো এবার রূপ পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন খাদ্য নির্দেশনার সাথে বাংলাদেশের ড. জাহাঙ্গীর কবীরের খাদ্য নির্দেশিকার মিল আছে। ২০১৯ সাল থেকে ড. জাহাঙ্গীর কবীর মানুষের সুস্থতার জন্য কাজ করে আসছে। তার প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে ওষুধ বা মেডিসিন ছাড়া শুধু জীবনধারা বা লাইফস্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখা।
বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (BFSA) ও অন্যান্য সংস্থার রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, ভেজাল খাবারের কারণে অসংখ্য অসংক্রামক রোগ বেড়েছে। এই সংকটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাস্থ্য সচেতনতা। কারণ আইন একা যথেষ্ট নয়, ভোক্তার চোখ খোলা না থাকলে ভেজাল থামবে না। আমাদের দেশে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ (গ)-এর ১ (ঙ) ধারায় খাদ্যে এবং ওষুধে ভেজাল মেশালে বা বিক্রি করলে অপরাধী ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন বা ১৪ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে BFSA, BSTI ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বাংলাদেশে ভেজাল রোধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি (BFSA), যা ২০১৩ সালের ফুড সেফটি অ্যাক্ট অনুসারে ২০১৫ সালে গঠিত হয়েছে। ইঋঝঅ খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও বিক্রয়ের সব স্তরে মান নিয়ন্ত্রণ করে। তারা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট চালায়, ল্যাব টেস্ট করে এবং জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) খাদ্যপণ্যের স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে, লাইসেন্স দেয় এবং বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে টেস্ট করে।BSTI প্রায়ই ভ্রাম্যমাণ আদালতের সঙ্গে যৌথ অভিযান চালায়। অনেক ক্ষেত্রে তারা ভেজাল পণ্য ধ্বংস করে জরিমানা করে। ডিরেক্টরেট অব ন্যাশনাল কনজিউমার রাইটস প্রোটেকশনও ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯ অনুসারে কাজ করে। তারা অভিযোগ গ্রহণ করে এবং শাস্তির ব্যবস্থা করে। সরকারি এসব উদ্যোগ সচেতনতা বাড়াতে ক্যাম্পেইন, সেমিনার ও মিডিয়া প্রচার চালায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান এগিয়েছে, বদলেছে রোগের ধরন, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন। এরই ধারাবাহিকতায় ভেজাল থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভোক্তা হিসেবে আমাদের চয়েজ পরিবর্তন করা। খাদ্য যদি প্রাকৃতিক, বৈচিত্র্যময় ও পরিমিত হয়, তবে তা শুধু রোগ প্রতিরোধেই নয়, সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবন নিশ্চিত করতেও সহায়ক। স্বাস্থ্যকর প্রজন্ম গড়তে এখনই সময় প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর খাবারে ফিরে আসা।
লেখক : সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম

