অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

মাহদী হাসান সীন

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ব্যতিক্রমধর্মী পরিবেশ ছিল। এটি আওয়ামী লীগের সময়ে হওয়ার কারণে এখানকার প্রায় ৯০% শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সকলেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল অথবা সমর্থক ছিল। ফলে এখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই আওয়ামী লীগ বা তার অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে, সমর্থন জানাতে বাধ্য হয়।

মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী আওয়ামী লীগ বিরোধী হলেও প্রকাশ্য খুব জোরালোভাবে প্রতিবাদ করতে পারত না। অনেকেই চুপ থাকতো আবার ২-৪ জন ফেসবুক পোস্ট, কমেন্টের মাধ্যমে অনলাইনে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতো। যাদের মধ্যে অন্যতম ছিল খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী মাহদী হাসান সীন, আহনাফ তাহমিদ চৌধুরী, মারুফ আলভি।

জুলাইয়ে যখন কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, তখন তারা ক্যাম্পাসের বাহিরে থাকলেও বিভিন্ন সময়ে অনলাইনের মাধ্যমে কোটা বিরোধী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে অবস্থানরত অন্যান্য সহপাঠী ও জুনিয়রদেরকে কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে মেসেজ দিয়ে, ফোন দিয়ে আহ্বান জানায়, উদ্বুদ্ধ করে, অরগানাইজড করে।

এ অবস্থায় বিগত ১৪ই জুলাই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর, বিশেষ করে মেয়েদের উপর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বর্বর ও জঘন্য হামলা চালায়, তখন সারা বাংলাদেশ প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ফেটে পড়ে। ওইদিন রাতেই খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কয়েকজন হিতাকাঙ্ক্ষী তারাও এর প্রতিবাদ জানায়।

এরপর ১৫ই জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন খুলনার ব্যানারে তারা রাজপথের আন্দোলনে যোগদান করে। এদিন তারা দৌলতপুর বাসস্ট্যান্ড ও শিববাড়ি পর্যন্ত মিছিল নিয়ে আসে। এর মধ্যেই তারা শুনতে পায় যে ২-৩ জন শিক্ষক মিলে ছাত্রদেরকে ডেকে মিছিল ও আন্দোলনে যেতে নিষেধ করে। এমনকি আন্দোলনে গেলে তারা গুম হয়েও যেতে পারে। এজন্য নাকি অনেকের নাম লিস্টও করা হয়েছে। এত ভয়ভীতি প্রদর্শন করার পরও তারা দমে না গিয়ে জীবনবাজি রেখে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে। পরের দিন ১৬ই জুলাই মিছিল নিয়ে দৌলতপুর থেকে পায়ে হেঁটে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আসে। এসময় তারা নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকে।

যেমন: “তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।” “আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই।”

খুলনা জিরো পয়েন্ট থেকে মিছিল নিয়ে সাচিবুনিয়া হয়ে গল্লামারি হয়ে আবার দৌলতপুর অস্থায়ী হলে চলে যায়। মিছিল থেকে ফিরে আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার খবর জানতে পারে। সবার মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। ওইদিন রাতেই খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো প্রকার সিন্ডিকেট করা ব্যতীত সাবেক ভিসি এবং রেজিস্ট্রার সবাইকে হল ত্যাগের নোটিশ জারি করে। এতে শিক্ষার্থীরা ভীত এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। তারা কি করবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরদিন সকাল বেলায় তাদেরকে জোর করে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।

হলের শিক্ষার্থীরা যখন প্রচণ্ড গোলাগুলি ও অস্থিরতার মধ্যে তারা নিজ নিজ বাসায় পৌঁছায় তখন খুলনায় অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যায়। মাহদী হাসান সীন, আহনাফ তাহমিদ চৌধুরী, সুমাইয়া আনসারী জোহানা, আসিফ শান্ত, সাইমা আক্তারসহ কয়েকজন কারফিউ ভেঙে নগরীর শিববাড়ি মোড়, ময়লাপোতা, মোড়, শহিদ হাদীস পার্কের সামনে, নিরালা মোড়, গল্লামারী মোড়, জিরো পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি, স্লোগান ইত্যাদি চালিয়ে যায়। আর অন্যান্যরা নিজ নিজ এলাকায় কম বেশি আন্দোলনে করে।

১৮ই জুলাই মীর মুগ্ধ বুলেটের আঘাতে শহিদ হওয়ার পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় অংশগ্রহণ করে। ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা গেট সংলগ্ন দেয়াল গ্রাফিতি অঙ্কন, মোমবাতি প্রজ্বলন, “শিকল-পড়া ছল” নামক প্রতিবাদী গানে অংশগ্রহণ করে। এভাবে অনলাইন অফলাইনে সবাই প্রতিবাদ চালিয়ে যায়। ৩০শে জুলাই সবাই ফেসবুকে প্রোফাইল লাল করে দেয়।

খুলনায় সব থেকে ভয়াবহ দিন ছিল ২রা আগস্ট, রোজ শুক্রবার। এদিন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই (১৯ ব্যাচের) ঘোষিত পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নগরীর নিউমার্কেট বাইতুন নূর শপিং কমপ্লেক্সের সামনে বিকাল ৩টায় অবস্থান কর্মসূচি এবং সেখান থেকে বিকাল ৪টায় মিছিল নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে পৌঁছানো হয়। মিছিল যখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে পৌঁছায় তখন বিনা উসকানিতে ছাত্রদেরকে লক্ষ্য করে পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, ছররা গুলি ইত্যাদি নিক্ষেপ করতে থাকে।

এদিন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মাহদী হাসান সীন এক বক্তব্যে বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষরা জীবন দিয়েছেন। কম হোক বা বেশি হোক, আমাদেরকেও জীবন দিতে হবে। তবে এই স্বৈরাচারের পতন না ঘটিয়ে আমরা ঘরে ফিরবো না। প্রতিদিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আমার মা’কে এই বলে বের হই, যদি ফিরে আসি তাহলে তো পেলেই, আর যদি ফিরে না আসি তাহলে মনে করবে তোমার ছেলে শহিদ হয়ে গেছে। যদি জালিমের জুলুম শেষে আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে ১৮-২৪ জুলাইয়ের মাঝামাঝি কোনো একটি দিন আমরা শোক দিবস পালন করবো। আমাদের শহিদ ভাইদের জন্য আমরা দোয়া মোনাজত করবো।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে মাহদী হাসান সীন ও আহনাফ তাহমিদ চৌধুরী আরো কয়েকজনকে নিয়ে দুই স্থানে (আবহাওয়া অফিসের সামনে ও গল্লামারী বধ্যভূমির সামনে) বড় বড় মেহগনি গাছ ফেলে রাস্তা ব্লকড করে দেয়। বৃষ্টির মধ্যে খুবির মেইন গেট পার্শ্ববর্তী ওভার ব্রিজের নীচে আসরের নামাজ জামাতে আদায় করে। সেখানে অবস্থান করে দেশাত্মবোধক নানা ধরনের গান গাইতে থাকে, প্রতিবাদ মূলক স্লোগান, ইত্যাদি দিতে থাকে।

এরপর যখন মিছিল গল্লামারি ব্রিজ হয়ে নগরীর ময়লাপোতার দিকে রওনা দেয়, তখন মিছিলের দুই-তৃতীয়াংশ ব্রিজ পার হলে গল্লামারী মোড়ে পুলিশের টিয়ারশেল ও গুলি বর্ষণ শুরু হয়। এসময় মাহদী হাসান সীন পুলিশের গুলিতে আহত হলে পিছনে থাকা আহনাফ দ্রুতই তাকে ওখানে থেকে সরিয়ে ব্রিজের ওপারে নিরাপদে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর তারা বাসায় ফিরে যায়। পরদিন আবারও সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত তারা দুজন একসাথে শিববাড়ি মোড় অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।

৪ই আগস্টও সকাল থেকেই শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। ৫ই আগস্টও একইভাবে কারফিউ ভেঙে সকাল থেকেই শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এসময় বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান গাইতে থাকে ও স্লোগানে মুখরিত রাখে চত্বর। স্বৈরাচার হাসিনা পালানোর পর তারা বিজয় নিয়ে ঘরে ফেরে। এই ধারাবাহিকতায় ৬ আগস্ট শুরু হয় “খুকৃবি সংস্কার আন্দোলন-২৪”।

১৮ জুলাই ড. নজরুল ইসলাম বাদল ফেসবুকে লেখেন “অন্য সরকারি চাকরি যারা করে তাদের খবর জানি না, কিন্তু আপনি যদি একজন শিক্ষক হয়ে থাকেন আর এখনো এই বর্বরোচিত অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসটুকু না রাখেন, তাহলে এই পেশা আপনার জন্য না।”

তিনি আরেকটি পোস্টে লিখেন “একজন শিক্ষক হিসেবে আমি লজ্জিত, মর্মাহত, হতভম্ব আমরা এই ছাত্রদের সামনে দাঁড়াবো কীভাবে?”

ড. এম এ হান্নান লিখেন “শিক্ষক হিসেবে আমি লজ্জিত। ইতিহাস বলে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক সংগ্রাম কোনোদিন বৃথা যায়নি, এবারও যাবে না।”

ড. মেহেদী আলম ইমরান ১৬ জুলাই প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষুদিরাম বসু-এর ছবির উপর লেখা লড়ো। না লড়তে পারলে বলো। না বলতে পারলে লেখো, না লিখতে পারলে সঙ্গ দাও, না সঙ্গ দিতে পারলে যারা এগুলো করছে তাদের মনোবল বাড়াও। যদি তাও না পারো, যে পারছে, কমিও না। কারণ সে ভাগের লড়াই করছে।”

মাহবুবা মিশু ৩১ জুলাই চোখে লাল কাপড় বাঁধা ছবি প্রোফাইল পিকচার বানিয়ে লিখেন “স্টপ জেনোসাইড, এভরি লাইফ মেটার।”

ড. জাবের রানা ৩ আগস্টে একটি শর্ট ভিডিও শেয়ার দেন যেখানে লেখা ছিলো “তোর কোটা তুই নে, আমার ভাইকে ফিরিয়ে দে। লাশের ভিতর প্রাণ দে, নইলে গদি ছাইরা দে। কিলার হাসিনা” ইত্যাদি ইত্যাদি।

৩ আগস্টের এক পোস্টে ড. নাজমুল হক অপু লিখেন “মানুষের রক্ত কি খুব সুস্বাদু? আপনার এত রক্তের নেশা?”

জহুরুল ইসলাম ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের উপর ছাত্রলীগের হামলার কতগুলি ছবি শেয়ার দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেন “এই অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। খুবই অসহায় আর লজ্জিত মনে হচ্ছে কারিগর হিসেবে।”

নুসরাত জাহান মুমু ১৮ জুলাই শহিদদের একটি ভিডিও শেয়ার দিয়ে লিখেন “আর কত! এই প্রাণগুলো কি কেউ পারবে? এত বছর কষ্ট করে যেই সন্তান বড় করেছে সেই সন্তান আজকে মায়ের সামনে নীরব লাশ হয়ে পড়ে আছে।”

৩রা আগস্ট খুকৃবি ডিবেটিং সোসাইটির পক্ষ থেকে হিসেবে প্রতিবাদলিপি প্রদান করেন। সেখানে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রতিটি হত্যার বিচার চাওয়া হয় এবং সন্ত্রাসী ও পুলিশের বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও ঘৃণা জানানো হয়।”

এছাড়াও অন্যান্য শিক্ষক, শিক্ষিকারা ৩০শে ফেইসবুক প্রোফাইল লাল করে, আন্দোলনের পক্ষে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট, কমেন্ট, মেসেজ, ফোন কল, ইত্যাদি দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন। নির্ভয় দিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন: ড. তসলিম হোসেন, ড. হাফিজুর রহমান, ডা. আমির হোসেন, ডা. উজ্জ্বল হোসেন, আরিফ সাদিক, জোনায়েদ তালুকদার, জাকিয়া সুলতানা, মৌসুমি জাহান সুমি সহ নাম প্রকাশ না করা অনেকেই।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা সরাসরি খুলনার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল : মাহদী হাসান সীন (শিক্ষার্থী প্রতিনিধি), আহনাফ তাহমিদ চৌধুরী (শিক্ষার্থী প্রতিনিধি), মাহমুদুল হাসান (ফেইসবুকে প্রাইভেট গ্রুপ খুলে আন্দোলনের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সবাইকে আপডেট জানাতো এবং পরবর্তী কার্যক্রমের পরিকল্পনা সাজাতো), ইমন ইবনে তারিক, ফারাজানা তরফদার নিশি, আকবার আলী, আসিফ শান্ত, সাইমা আক্তার, ইসরাত জাহান, সুমাইয়া আনসারী জোহানা, মনিরুল ইসলাম সাকিব, স্বরন কুমার দাস, রাফিদুল ইসলাম, নাজমুস সাকিব, মনিশা আক্তার, গাজী তানভির, সুমাইয়া শিমু, সাফিউজ্জামান তোয়াশিন, আবরার মেসবাহ, আ’রাফ, ফুয়াদ, তানভীর সপ্নিল, জিহাদ, অতনু বিশ্বাস সহ আরও কয়েকজন। অন্যদিকে, IVSA KAU এবং IAAS Bangladesh KAU এর পক্ষ থেকেও জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে পোস্ট করা হয় এবং প্রোফাইল লাল করা হয়।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন