রাজনীতিতে কখন কে শত্রু, কে মিত্র বুঝে উঠা কঠিন। ভূ- রাজনীতির পাশার গুটি কিংবা দাবার চাল কখন যে কীভাবে হয় নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল। আমেরিকার লোল জিহ্বা অনেক কাল ধরে প্রসারিত হয়ে রয়েছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার তাইওয়ানের দিকে। ওদিকে মধ্যপ্রাচ্যে অন্যতম উদীয়মান পরাশক্তি ইরানের দিকে।
প্রায় দশ বছর পর চীন সফর করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অর্থাৎ আমেরিকার ময়ূর সিংহাসনের সম্রাট ট্রাম্প, বিশ্বের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পরা শক্তির মধ্যে দীর্ঘদিনের চলমান উত্তেজনা কিছুটা প্রশমন এর লক্ষ্যে উচ্চ পর্যায়ের এক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে হঠাৎ করে চীনের রাজধানী বেইজিং পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রের মতলববাজ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।মূল লক্ষ্য রথ দেখাও হল কলা বেচাও হলো! ঘটনাটির রসি টানাটানি চলে চলতি মাসের ১৩ই মে থেকে ১৬ই মে চারদিন।
ওয়াশিংটন থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে গত ১৩ই মে বুধবার ট্রামকে বহনকারী ইয়ার ফোর্স ওয়ান এর বিমান চীনের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭:৫০ মিনিটে নিরাপদে বেইজিং-এর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্পর্শ করে। গত প্রায় এক দশকের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর এটি। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম অর্থনীতির দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বহুল প্রতীক্ষিত এই সফর। তাদের একান্ত বৈঠকে মধ্য প্রাচ্যের ইরান সংকট, নীরব বাণিজ্য যুদ্ধ এবং তাইওয়ান ইস্যু প্রাধান্য পাবে বলে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ধারণা করেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কাবু করার মতলবে যুদ্ধের কারণে মতলববাজ ট্রাম মার্চে সফর ও বৈঠকের কথা থাকলেও পিছিয়ে দিয়েছিলেন, ভাবনা ছিল অন্যরকম। নিজে নিজেই যদি মধ্যপ্রাচ্য কিছু একটা করে ফেলা যায়। কিন্তু ইতিহাস সেভাবে কথা বলেনি।
তাই প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের চীন সফরের ঘটনাকে অনেকেই মনে করেছিলেন ট্রাম্প সম্ভবত চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ অর্থাৎ ব্যাবসায়িক শক্তির দিকেই ঝুঁকবেন। ট্রাম্পের স্বপ্ন ছিল চীনকে বাগে আনতে হবে যেকোনো প্রক্রিয়ায়! তাই আলাস্কা থেকে শেষ মুহূর্তে এয়ারফোর্স ১ এর বিমানে ওঠেন এনভিডিয়ার প্রধান জেন সেন হুয়াং। মোটামুটি বাণিজ্যিক এই সফরে ট্রাম আঁটসাঁট বেধে যাত্রা করেন। তার সফরের সঙ্গী হয়েছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান ও বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের ইলান মাস্কও। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) তৈরির দৌড় যখন তুঙ্গে তখন যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি রীতি অনুযায়ী এনভিডিয়ার তৈরি অত্যাধুনিক চিপ কেনা চীনের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ওয়াশিংটন জবাব হিসেবে বলেছে : “জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।”
চার দিনের সফরে বেইজিং নেমে মাঝপথে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন : আমি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে চীন আরও উন্মুক্ত করে দেওয়ার অনুরোধ করবো। যাতে আমার সাথে থাকা এই প্রতিভাবান ব্যক্তিরা (হুয়াং ও মাস্ক) তাদের যাদুর ছোঁয়া দিতে পারেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজের প্রথম মেয়াদের সময় ২০১৭ সালের এক দশক পর এই প্রথম চীন সফরে এসে চীনা কর্তৃপক্ষের সাথে জমকালো সম্পর্ক পেয়েছেন। রাজকীয় গ্রেট হল অফ দ্যা পিপুলে ট্রাম্প এবং শি জিনপিং অন্তরঙ্গ পরিবেশে বৈঠক করেন।
সফরের তৃতীয় দিনে ট্রাম্প বেশ আপত্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। কারণ ট্রাম্প ও তার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগ সেথ দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে।’ তবে নতুন গোয়েন্দা তথ্য এসব বক্তব্যকে দারুণ ভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গাল গল্প আর কাজে আসেনি। নতুন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সব গোমর ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এতে মার্কিন অস্ত্র ভাণ্ডারে এই সর্বপ্রথম ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। বলা বাহুল্য, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের সাথে ওই যুদ্ধে প্রায় ১১০০ টি দূরপাল্লার স্টেলথ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, এক হাজারের বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৩০০ টিরও বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর অবাধে ব্যবহার করেছে। এখন থলের বিড়াল বেরিয়ে গেছে ট্রাম্পের উদ্বিগ্নতা দৌড়াদৌড়ির অর্থ চীন বুঝতে পেরেছে। চীনের কাছে এখন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য আকাক্সক্ষা সবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চীন ও সেইভাবে আলোচনায় লাগাম টেনেছে।
চীন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ট্রাম্পের এই সফরকে উপভোগ করেছে! চার দিনের সফর শেষে আশা করা হয়েছিল ট্রাম্পের বাণিজ্যিক মিশন সহ ইরান তাইওয়ান পরিস্থিতির কিছুটা লক্ষণীয় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন। কিন্তু সে গুড়ে বালি! বরং চীন ট্রাম্পের সফর দলকে যথেষ্ট সম্মান করলেও বিদায় দিন লেজ গোবরে জড়িয়ে পড়ে ট্রাম্পের সফর। শূন্য হাতে বদনাম নিয়ে ফিরতে হয়েছে শুধু।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কোনো রকম রাগ-ঢাক না করে খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র পতনশীল দেশ!” চীনা প্রেসিডেন্টের এ ধরনের মন্তব্যে পাল্টা জবাব দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার চীন সফরের শেষ দিন চীনা প্রেসিডেন্টের ওই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে এক যুক্তিনিষ্ঠ বক্তব্য খাড়া করেছেন, যার মাধ্যমে ট্রাম্পের নগ্ন চেহারা আরও কঠিনভাবে বিশ্বব্যাপী উন্মোচিত হয়েছে। ওই দীর্ঘ স্ট্যাটাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম নিজের জয় ঢাক নিজেই পিটিয়েছেন। তিনি বলেছেন : ‘চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রকে একটি পতনশীল রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন।’ এমন প্রসঙ্গের বিপরীতে ট্রাম্প স্বয়ং দাবি করেছেন যে, চীনের প্রেসিডেন্ট মূলত তার পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলের ব্যর্থতাগুলোর দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মতে, বাইডেন প্রশাসনের নীতি ও সিদ্ধান্তের কারণে বিগত চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিজিনপিংএর মূল্যায়ন শতভাগ সঠিক ছিল। ট্রাম্প তার পোস্টে খোলামেলাভাবে সীমান্ত উন্মুক্ত রাখা, উচ্চ কর হার, খেলাধুলা ও সমাজে বিদ্যমান সমতার নামে বিতর্কিত নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুর্বল চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই একটি পতনশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। এভাবে ট্রাম্প আর নিজের দুর্বলতা ঢাকতে গিয়ে জোর দিয়ে বলেছেন, “বর্তমান মার্কিন প্রশাসন গত ১৬ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সামরিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি এনেছে। তার মতে শি জিনপিং এর মন্তব্যটি নিশ্চিত ভাবে তার উদ্দেশ্যে ছিল না! রেকর্ড সংখ্যক শেয়ারবাজার, শক্তিশালী কর্মসংস্থান এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগের উদাহরণ টেনে বড় গলায় দাবি করেন, বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং শি জিনপিং নিজেও তাকে এই অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন।
কাহিনির উপসংহারে বলা চলে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী জাগ্রত টাইগার চীনের বুঝতে আর বাকি নেই আমেরিকার মতলব দারুণভাবে বাণিজ্য যুদ্ধ সমতায় আনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অতিরিক্ত হামলা এবং হানাদারী কোনোই ব্যাপার না বলে চীনকে বুঝানো। আমার মনে হয়, ট্রাম্প বোধহয় এখনো পর্যন্ত সম্পূর্ণ বুখার স্বর্গে বাস করছেন। কারণ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বিশ্ব পরাশক্তি চীন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে যা বলার তা বলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই কর্ণ ধরের মানসিক আক্ষেপ এবং পতনশীল রাষ্ট্র হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পতিত কুখ্যাত নায়ক হিটলারের মতো দুশ্চিন্তা করা ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্প এর কাছে বিকল্প আর কোনো পথ খোলা নেই। যুদ্ধবাজ পাগলা বুড়ো যা করেছে ইরানের যুদ্ধে, তা সারা বিশ্বের জানতে আর বাকি নেই। এখন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে মোড়লিপনা বাদ দিয়ে চেক এন্ড ব্যালান্স পলিসি ধরে সামনের দিকে এগুনো এবং পরাশক্তিগুলোর চোখ এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে তা ইতিহাসে কুৎসিতভাবে কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিত্রিত থাকবে। পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কুৎসিত প্রতিযোগিতা বন্ধ হোক। বিশ্ববাসী এখন এটি দেখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র তা কি পারবে কখনো?
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
খুলনা গেজেট/এনএম

