উপকূলীয় বাংলাদেশে পানির ও মাটির লবণাক্ততা এখন জীবিকার ওপর সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, খুলনা, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চল) বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র চাপে রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে আবহাওয়া অস্থির। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (BMD) চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর ৩ দেখিয়ে রেখেছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নৌকা-ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থাকতে এবং সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। দমকা হাওয়া (৪৫-৬০ কিমি/ঘণ্টা) সহ বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে উপকূলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিতে কয়েকটি নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে। নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজারের নদীগুলোতে বন্যা দেখা দিয়েছে। উপকূলীয় জেলাগুলোতে (বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা ইত্যাদি) জোয়ারের পানি বেড়ে নিচু এলাকায় প্লাবনের আশঙ্কা। নদীভাঙন তীব্র। গত বছরগুলোতে সাইক্লোন রেমালসহ বিভিন্ন ঘটনায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা এখনো পুরোপুরি মেরামত হয়নি।
এদিকে উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জোয়ার ও নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলে পানীয় জলের তীব্র সংকট। মাটির লবণাক্ততা বেড়ে ফসল উৎপাদন কমছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিরাপদ পানির জন্য সংগ্রাম করছে।
নারীরা এর সবচেয়ে বড় শিকার। ঘরের কাজ, পানি সংগ্রহ, রান্না, গোসল সবকিছুতেই তাদের লবণাক্ত পানির সংস্পর্শে আসতে হয়। শ্যামনগর বা মোংলার মতো এলাকায় নারীরা প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হেঁটে মিঠা পানির সন্ধান করেন। শুষ্ক মৌসুমে এই দূরত্ব আরও বাড়ে। পানি বহনের কারণে জরায়ু নেমে যাওয়া (prolapsed uterus) এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের অবনতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়। পরিবারের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব ভয়াবহ। পুরুষরা অনেক সময় শহরে বা অন্যত্র কাজের সন্ধানে চলে যান। ফলে নারী-নির্ভর পরিবার বাড়ছে। নারীরা চিংড়ি ঘেরে কাজ করেন, মাছ ধরেন বা ছোটখাটো ব্যাবসা করেন। কিন্তু লবণাক্ততায় ফসল নষ্ট হলে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। অনেক পরিবারে নারীরা খাবার কম খেয়ে সন্তান ও স্বামীকে খাওয়ান। এতে পুষ্টিহীনতা বাড়ে। লবণাক্ত পানিতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে মাছ ধরা বা ঘেরের কাজ করার কারণে চর্ম রোগসহ জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়েছে। মোংলা ও শ্যামনগরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অর্ধেকেরও বেশি নারী (বিশেষ করে জেলে নারী) এ ধরনের সমস্যায় ভুগছেন।
সাতক্ষীরার ২৫ বছর বয়সী আসমা আখতার নদীতে মিনো (ছোট মাছ) ধরেন। তার দুই সন্তান। ছয় মাস আগে অসহ্য যন্ত্রণায় জরায়ু অপসারণ হয়েছে। এখনো জ¦র, বমি হয়। ডাক্তার বলেছেন, অতিরিক্ত নোনাজলের সংস্পর্শে এসব হয়েছে। বাড়ির পাশের পুকুরের পানিও নোনা। গোসল, রান্না, পান সবকিছুতেই লবণ। ‘এই লবণ পানি আমাদের শৈশব, স্কুল, স্বপ্ন সব ধ্বংস করেছে- বলেন আসমা। ঘূর্ণিঝড় আইলার (২০০৯) পর তার পরিবারের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। স্কুল ছেড়ে বিয়ে হয়। এখন দুই ঘণ্টা হেঁটে মিষ্টি পানি আনতে হয়। ২৮ বছর বয়সী লিপি খানমের বাড়ি কালীবাড়ি গ্রাম। নোনা পানি বাড়িতে ঢুকে পড়ে। অনিয়মিত ঋতুস্রাব, তলপেটে ব্যথা। দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার চেষ্টায় সমস্যা। স্বামীর সাথে ঝগড়া হয়। ডাক্তার জরায়ু অপসারণের পরামর্শ দিয়েছেন, কিন্তু ভয়ে করেননি। ‘পরিবার চলবে না, স্বামী ছেড়ে চলে যাবে’, বলেন তিনি। বারবার ঘর হারানো খুলনায় মেরি চিত্রা চারবার ঘর হারিয়েছেন ঝড় ও ভাঙনে। নোনাজলে মাছ ধরা ও ঘরের কাজ করতে গিয়ে চামড়ার রোগ, জরায়ুর প্রদাহ। স্বামীরা দূরে কাজে যান, নারীরা পড়ে থাকেন লবণাক্ততা মেশানো মাটি ও পানিতে। ফলে নারী-শিশু নিয়ে পরিবার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়। অনেক নারী শহরে গারমেন্টস বা ঘরের কাজে যান, যেখানে শোষণের শিকার হন। লবণাক্ততায় ধান চাষ কমে গেছে। অনেকে চিংড়ি চাষে ঝুঁকেছেন, কিন্তু এতে ছোট চাষি ও নারীদের লাভ কম, পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লবণাক্ততা শিশুদেরও প্রভাব পড়ে। লবণাক্ত পানির কারণে ডায়রিয়া, পেটের সমস্যা এবং পুষ্টিহীনতা বাড়ছে। পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হলে নারীদেরই দেখাশোনা করতে হয়, যা তাদের শ্রমের বোঝা আরও বাড়ায়। ফলে শিশু বিয়ে বাড়ছে, শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।
চারদিকে প্রচুর পানি থাকলেও, লবণাক্ততার কারণে তা পান করার অনুপযুক্ত। তাই উপকূলের ৭৩ ভাগ মানুষ সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত। দেড় কোটি মানুষ ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি পানে বাধ্য হচ্ছে। কেবল বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার ৬৫% মানুষের সুপেয় পানি সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থা নেই। বাকী ৩৫ ভাগ মানুষদের বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য সরকারি এবং বেসরকারিভাবে পানির ট্যাংকি বিতরণ করা হলেও তা দিয়ে মাত্র ৪ থেকে ৬ মাসের পানি ধারণ করা সম্ভব। বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা ৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। উপজেলার জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ জরিপে দেখা যায়, উপজেলার পানির উৎসগুলোর মধ্যে চাঁদপাই ইউনিয়নে ২১৩০১ জনসংখ্যার জন্য পানি সংরক্ষণের পুকুর রয়েছে মাত্র একটি। আর পলিমার ট্যাংকি রয়েছে ১৫৪০টি। বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়নে ১৬২১৭ জন সংখ্যার জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের একটি পুকুর ১১৩০টি পলিমার ট্যাংকি রয়েছে। মিঠাখালী ইউনিয়নে ১৮৫৫১ জন সংখ্যার জন্য পানি সংরক্ষণের ৫টি পুকুর ও ১২৩০টি পলিমার ট্যাংকি রয়েছে। চিলা ইউনিয়নের ২০৪৩৭ জন জন সংখ্যার জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ৫টি পুকুর ও ১৩৪৪ টি পলিমার ট্যাংকি রয়েছে। সোনাইলতলা ইউনিয়নে ১৯১১৩ জন সংখ্যার জন্য ১টি পুকুর ও ১১১০ টি পলিমার পানির সংরক্ষণের ট্যাংকি রয়েছে। সুন্দরবন ইউনিয়নে ২৪২৩১ জন সংখ্যার জন্য ৭টি পুকুর ১২৫৭টি ট্যাংকি রয়েছে। পৌরসভার ৪১৬১৩ জন সংখ্যার জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের একটিও সরকারি পুকুর নেই। ট্যাংকি বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৫০টি। তবে পাইপলাইনের মাধ্যমে পৌর কর্তৃপক্ষ ২৬০০ পরিবারকে জমানো বৃষ্টির পানি সরবরাহ করে থাকে। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ পুকুর, বালি ফিলটার এবং গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করছে। আসন্ন জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম উপকূলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে। ফোরামের মোংলা সভাপতি মো নুর আলম শেখ জানান, মোংলাসহ দক্ষিণাঞ্চলে জলবায়ু সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তিনি বলেন, লন্ডন ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ম্যাপলক্রাফট বিশ্বের ১৭০টি দেশের উপর জরিপ চালিয়ে ১৬টি দেশকে সর্বাপেক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। জার্মান ওয়াচের ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী বাংলাদেশকে ১৩তম স্থান দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে জলবায়ুর ক্ষতির প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় পানির সংকট আরো তীব্র হতে পারে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অব্যাহত। ২১০০ সাল নাগাদ উপকূলের বড় অংশ (প্রায় ১৮%) তলিয়ে যেতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে, ঋতু বদলাচ্ছে। নদীভাঙন, ম্যানগ্রোভ বিনাশ, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপকূলে মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি ও দমকা বাতাস চলছে। মে মাসে আরও বৃষ্টি ও নিম্নচাপের সম্ভাবনা আছে। সার্বিকভাবে উপকূলবাসী সতর্ক অবস্থায় আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি উচ্চ, কিন্তু সচেতনতা ও প্রযুক্তির সাহায্যে মোকাবিলা করা সম্ভব। এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজন অপরিহার্য। বর্তমান সরকার এ লক্ষ্যে কাজ করছে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে বড় বড় পুকুর, খাল ও জলাশয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। উপকূলের মানুষের চাহিদা পূরণে নতুন প্রকল্প নেওয়াসহ দ্রুত সংকট সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
উপকূলের নারীরা শুধু ভিকটিম নয়, তারা সমাধানের অংশ। আশার কথা হচ্ছে স্বনির্ভরতার পথে অনেক নারী এখন পরিবর্তন আনছেন। নারীরা স্বামীর অনুপস্থিতিতে পরিবার চালাচ্ছেন। নারীরা হাইড্রোপনিক চাষ, কাঁকড়া চাষ, তিল চাষ, নার্সারি বা অ্যাকুয়াপনিক্সের মতো বিকল্প জীবিকায় ঝুঁকছেন। UNDP–এর Gender-responsive Coastal Adaptation (GCA) প্রকল্পের মতো উদ্যোগে নারীদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, মহিলা জীবিকা গ্রুপ (WLG) গঠন এবং বাজার সংযোগ তৈরি করা হচ্ছে। নারীরা কাঁকড়া চাষ করে সফল হচ্ছেন। নারীদের লাইভলিহুড গ্রুপ (WLG) গঠন করে প্রশিক্ষণ, ঋণ, বাজার সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে আয় বাড়ছে, আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিচ্ছেন নারীরা। তাদের গল্প শুধু কষ্টের নয়, সাহস ও প্রতিরোধেরও। সকলে যদি উপকূলবাসীর পাশে দাঁড়ায়, তাহলে উপকূল শুধু টিকবে না, উন্নতও হবে।
লেখক : সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম

