বৃহস্পতিবার । ১৪ই মে, ২০২৬ । ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩

খুলনায় ইজিবাইক : বেকারত্বের সঙ্গে জীবিকার সংগ্রাম

সামিয়া নুন নিশী

খুলনা শহরের রাস্তায় সকাল থেকে সূর্যের আলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা মেলে হাজার হাজার ইজিবাইক। প্রতিটি চালক যেন এক আলাদা গল্পের অংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (ইইঝ) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী খুলনা বিভাগে প্রায় ৩.৩১ লাখ মানুষ বেকার, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ বেকারত্বের সংখ্যা। দেশের মোট বেকার সংখ্যা প্রায় ২.৬২ মিলিয়ন এবং জাতীয় বেকারত্বের হার ৩.৬৬%। এই বাস্তবতা খুলনা শহরের রাস্তায় স্পষ্ট প্রতিফলিত হচ্ছে; প্রতিদিন প্রায় ৪৫,০০০ ইজিবাইক চালক রাস্তায় ঘুরছেন, যারা জীবিকা নির্বাহের জন্য এই কাজ করছেন।

রাস্তায় দেখা যায়, কেউ ব্যস্ত ট্রাফিকের ভিড়ের মধ্যে সাবধানে ইজিবাইক চালাচ্ছেন, আবার কেউ পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিয়ে পরিবারের খরচ চালাতে মাইল ঘুরছেন। একজন চালকের অভিব্যক্তি এমন,“বলা যায় না আমি বেকার, তবে স্থায়ী কোনো চাকরি নেই। ইজিবাইক ছাড়া উপার্জনের কোনো উপায় নেই।”

কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী থেকে খুলনায় আসা আলিফ হোসেন নামের তরুণ বর্তমানে ভাড়ায় ইজিবাইক চালান। চাকরির আশায় শহরে এলেও দীর্ঘদিনেও কোনো স্থায়ী কাজ পাননি। এখন প্রতিদিন ভাড়ার ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। দিন শেষে তাকে গাড়ির মালিককে ৭০০ টাকা জমা দিতে হয়।

আলিফ বলেন,“আইছি চাকরির আশায়। কিন্তু কুনো কাম পাইনি। তাই এই ইজিবাইক চালাই। আগে যা ইনকাম হইতো, এহন আর হয় না। ইজিবাইক অতি দ্রুত বাড়ছে।”

তাকে প্রশ্ন করা হয়, “কেন এত দ্রুত ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়ছে?” উত্তরে তিনি বলেন,“সবাই সহজ ইনকাম চায়। ফ্রিল্যান্সিং করতি কম্পিউটার লাগে, সবার তো ওইডা নাই। পদ্মা সেতু হইলেও খুলনায় তেমন চাকরি বাড়ে নাই, তাই অনেকে এই লাইনে নামতেছে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চালক জানান, “তিনি খুলনার একটি স্বনামধন্য কলেজের শিক্ষার্থী, পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের জন্য ভাড়ায় ইজিবাইক চালান। তবে আগের তুলনায় তার আয় অনেক কমে গেছে।”

তিনি বলেন,“পড়ালেখার পাশাপাশি ইনকাম দরকার। তাই ভাড়ায় গাড়ি চালাই। আগে যা পাইতাম, এহন ৪০০ টাকার বেশি থাকে না। গাড়ি অনেক বেড়েছে।”

খুলনার উচ্চ বেকারত্ব মানুষকে বাধ্য করছে স্বল্প আয় ও অনিশ্চিত কর্মজীবনে অংশ নিতে। ইজিবাইক চালানো আংশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে পারছে না। ৩.৩১ লাখ বেকারের মধ্যে ৪৫,০০০ চালক এই কাজ করছে সংখ্যাটি প্রায় ১৩%। এটা স্পষ্টভাবে দেখায় যে শুধু ‘চাকরিতে নিয়োজিত থাকা’ যথেষ্ট নয়; কাজের মান, স্থায়িত্ব এবং নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। যেহেতু অধিকাংশ ইজিবাইক চালক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্সিং কোর্স ছাড়াই পার্ট-টাইমভাবে যানবাহনটি চালাচ্ছেন, তাই দক্ষতার ঘাটতির কারণে খুলনায় সড়ক দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যা বিভিন্ন স্থানীয় সড়ক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে।

এই পরিস্থিতি থেকে কিছু নীতিগত শিক্ষা নেওয়া যায়:

১. যুবকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা ভবিষ্যতে স্থায়ী চাকরির সুযোগ পেতে পারে।
২. খুলনায় শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি।
৩. তরুণদের প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে সহজ ঋণ বা সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে।

খুলনার রাস্তায় প্রতিদিন ৪৫,০০০ ইজিবাইক চালক ঘুরছেন এরা শুধু জীবিকা নির্বাহ করছেন না, তারা বেকারত্বের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করছেন। এদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বেকারত্ব শুধুই পরিসংখ্যানে নয়, বাস্তব জীবনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলছে।

চালকদের মুখ থেকে শোনা প্রতিটি গল্পই বোঝায় যে শ্রমের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং স্থায়িত্বের প্রয়োজন কতটা জরুরি। যদি সরকার নীতিগত সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারত, তবে এই রাস্তাগুলো শুধু ইজিবাইকের ভিড় নয়, বরং সংগ্রামী মানুষের স্বনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠতে পারত।

লেখক : শিক্ষার্থী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন