শুক্রবার । ১লা মে, ২০২৬ । ১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩
বিশ্ব গণমাধ্যম মুক্ত দিবস

সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ-ই যথেষ্ট

কাজী মোতাহার রহমান

বিশ্বের ছয়শ’টি দেশের শ্রমজীবী আজ মে দিবস পালন করছে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে লাখ-লাখ শ্রমিকের কণ্ঠে স্লোগান ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। আমেরিকার হে-মার্কেটের শ্রমিকরা আত্মাহুতি দিয়ে দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবস নির্ধারণ করে দিয়ে গেছে। যেমন শোকের দিন, তেমনি আনন্দের দিন। একই সাথে বিশ্বের সংবাদ কর্মীরা আগামীকাল বিশ্ব গণমাধ্যম দিবস পালন করবে। যদিও সময়টি সংবাদ কর্মীদের জন্য সু-সময় নয়।

আজকের দিনটিতে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণে আসে। ডেমোক্রেসি ডাইজ ইন ডার্কনেস। শব্দটির অর্থ অন্ধকারে গণতন্ত্রে মৃত্যু হয়। এই বাক্যটি ছিল ২০১৭ সালে ওয়াশিংটন পোস্টের। আমাজানের প্রতিষ্ঠাতা ও ধনকুবের মালিক জেফ বেজোস পত্রিকাটি কিনে নেয়ার ৪ বছর পর এই স্লোগানটি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই বেজোস ওয়াশিংটন পোস্টকে গলা টিপে ধরেছে। আমেরিকায় গণতন্ত্র মরে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে ওরাকলের ল্যারি এলিসনের মতো মিডিয়া ও প্রযুক্তি মালিকের ক্ষমতাধর অবস্থানে থাকা ব্যক্তিরা তথ্যকে নিষ্ক্রিয় করার কায়দা শিখে ফেলেছেন। একটি ভুল তথ্য প্রচারণা হিসেবে যা শুরু করেছিল তা এখন একটি সু-সংহিত প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে অবহেলিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খবর ছড়ানোর ব্যবস্থা। অনেক বছর ধরে টুইটার ছিল এমন একটি জায়গায় যেখানে সংবাদ কর্মী গবেষক ও রাজনীতিকরা সবাই এক মঞ্চে কথা বলতেন। ভালো গবেষণা দ্রুত ছড়াতো, বিতর্ক ছড়াতো, ভুল হলে সঠিক করা হতো, আর অনেক সময় সঙ্গে-সঙ্গেই রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতো। ইলন মাস্ক টুইটার কিনে সেটার নাম বদলে এক্স করার পর সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এখন এখানে যাচাই করা তথ্যের চেয়ে উত্তেজনা আর এনগেজমেন্ট বেশি গুরুত্ব পায় (প্রথম আলো, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। এত গেল ভিন দেশের কথা।

(২)
গত ২৬ এপ্রিল একটি খবর প্রযুক্তির সুবাদে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছেছে। এ দিন বিকেলে একদল দুর্বৃত্ত খুলনা প্রেসক্লাবের গেট অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দেয়। দুর্বৃত্তরা সভাপতি প্রার্থী মোস্তফা সরওয়ারকে খুঁজতে থাকে। সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী তরিকুল ইসলামের সাথে দুর্ব্যবহার করে। ঘণ্টাখানেক পরে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরদিন ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচিতে সংবাদ কর্মী ছাড়াও রাজনীতিকরা তাদের বক্তব্যে এ ঘটনার নিন্দা ও দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবেশের ঘটনায় ক্লাবের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার দত্ত দুর্বৃত্তদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে থানায় এজাহার দায়ের করেন। বক্তাদের ভাষ্য ও পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী দুর্বৃত্তরা শাসক দলের সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের কর্মী। পুলিশ প্রশাসন আন্তরিক হলে এ ঘটনার পেছনের কারণ উন্মোচিত হবে। যদিও সংবাদ কর্মীদের মধ্যে আলোচনা আছে, ৩০ এপ্রিলের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এর সূত্রপাত। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা গত চার যুগে ঘটেনি। এতে সকল মহল নিন্দা করেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরা নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

(৩)
গেল মার্চ মাসে শেলি কিটলেসন নামনী একজন আমেরিকান সাংবাদিক অপহরণ হয়েছে। তিনি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তার অপহরণের সাথে ইরান সমর্থিত মিলিসিয়া কাতিব হিজবুল্লাহের সম্পৃক্ততা অনেকেই খুঁজে পেয়েছে। কিটলেসন বিবিসি ও আল মনিটার মিডিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে জনপ্রিয় হয়েছেন। ইরান যুদ্ধ সাংবাদিকদের জন্য সুখবর বয়ে আনেনি। ফলে ২০২৩ সালে ইসরায়েলী বোমা হামলায় সাংবাদিক মোঃ আবু হাতাব ও তার পরিবারের ১১ জন সদস্য নিহত হন। লেবাননে আমাল খলিল নামে একজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তিনি লেবানন জুড়ে খুব পরিচিত। আমালের হত্যাকাণ্ড অনেকটা স্মরণ করিয়ে দেয় ফিলিস্তিনি অভিজ্ঞ সাংবাদিক এবং দীর্ঘদিনের আল জাজিরার প্রতিনিধি শিরিন আবু আখলেহার হত্যার ঘটনা। চার বছর তিনি ফিলিস্তিনির জেনিন শহরে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ হত্যার পর আড়াইশ’ জনের বেশি ফিলিস্তিনি গণমাধ্যম কর্মী নিহত হন। এত হত্যার ঘটনা না হলেও নানা কালো আইনের কারণে আমাদের গণমাধ্যম মুক্ত হতে পারেনি।

(৪)
গত ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলী স্টারে অগ্নিসংযোগ, হামলা ও ভাঙচুর হয়। ৪ মাসে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। স্বাধীনতার পর তৈরি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, স্পষ্টভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি বলেছে-এর ফলে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। ২৩ এপ্রিল মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ক্ষমতার পরিবর্তনে কী নীতির পরিবর্তন ঘটতে পারছে? ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা এবং সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মতো আইনগুলো অতীতে যেভাবে অপ-ব্যবহৃত হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়নি। এ কারণেই ২০২৪ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ফলকার টুর্ক জেনেভায় মানবাধিকার কাউন্সিলের অধিবেশনে বলেন, বিচার বিভাগ ব্যবহার করে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। ২০২৪ সালে ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের এক কর্মশালায় সাইবার নিরাপত্তা আইনে ২২, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৮ ধারা যে কোনোভাবে সংবাদ কর্মীকে বিপদে ফেলতে পারে। এ আইনের ৫৭ ধারা বাতিল হলেও সে মামলাগুলো বাতিল হয়নি। এ মামলায় খুলনার সংবাদ কর্মী হেদায়েত হোসেন মোল্লা, রাশিদুল ইসলাম, মোঃ আবু তৈয়ব, মুনির উদ্দিন আহম্মেদ, মোতাহার রহমান ও সোহাগ দেওয়ান হয়রানির স্বীকার হয়েছেন। এর মধ্যে অনেকেই খালাস পেয়েছেন। ২৪’র গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন সরকার আসলেও তারা সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। এ সরকারের আমলে গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য অবসর ভাতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সম্পাদকদের সাথে ৩ মাস পরপর বৈঠক ইত্যাদির আশ্বাস দিলেও বিজ্ঞাপন সংকুচিত করে পত্রিকার আয়গুলো কমিয়ে দিয়েছে। যতই স্বাধীনতার কথা বলুক না কেন ব্রিটিশ আমলের অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট স্বাধীনতার পর ৫৪ ধারা ও সাইবার নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা দিয়ে সাংবাদিকদের কণ্ঠকে রোধ করেছে। নতুন সরকারে দায়িত্ব অনেক বেশি। সংবাদপত্র মুক্ত না হলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। আমি এ প্রসঙ্গে ডেইলি স্টারের ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে “Journalism without fear or favour” শ্লোগানটিকে স্বাগত জানাই। এর অর্থ এটাই, হুমকি বা ভয়ের কাছে মাথা নত না করে সত্য সংবাদ প্রকাশ করা। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল বা ক্ষমতার প্রতি অনুগত না থেকে, কোনো বিশেষ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সংবাদ পরিবেশন না করা। এটি সাংবাদিকতার একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নীতি বা আদর্শ, যা নিরপেক্ষতা ও সাহসিকতার প্রতীক।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন