অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল। অনিবার্য কারণে বিষয় পরিবর্তন করতে হলো। রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি মনে পড়লো :
‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু,
নিভাইছে তব আলো,
তুমি কি তাহাদের ক্ষমা করিয়েছি,
তুমি কি বেসেছো ভালো ?’
সকালে ফেসবুকে লন্ডনভিত্তিক -১ নিউজের সম্পাদক হেমায়েতউদ্দিন মিশনের পোস্ট দেখে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে বাধ্য হলাম। দায়িত্ব এবং দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে প্রথিতযশা সাংবাদিক হেমায়েত উদ্দিন সাংবাদিকতা করেন। গত দেড় যুগ ধরে লন্ডন থেকে এই স্বনামখ্যাত সাংবাদিক ভদ্রলোক ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বহু অপকর্মের কাহিনি দায়িত্বশীলতার সাথে পরিবেশন করছেন। সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ জেনেছে, হাসিনা আমলের যতসব ভয়ংকর কাহিনি এবং কুৎসিত কার্যকলাপ!
কয়েক ঘণ্টা আগে লন্ডন থেকে হেমায়েত উদ্দিন চোখ কপালে ওঠার মতো এক ভয়ংকর বিস্ফোরণ মূলক স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী ধর্ষিতা সোহাগি জাহান তনুর লাশ পোস্টমর্টেম টিমের প্রধান ডা. কামদা প্রসাদ সাহা বর্তমানে খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার। সে বলেছিল যে, “তনু নাকি স্বেচ্ছায় একাধিক পুরুষের সাথে ইন্টারকোর্স করেছে!” কুখ্যাত ডাক্তার কামদা প্রসাদ সাহাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ সহ প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হোক।
সাংবাদিক হেমায়েত উদ্দিন-এর ওই স্ট্যাটাসের ৯২৩ টি কমেন্টসে সবাই ডাক্তার কামদা প্রসাদ সাহাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ওকে রিমান্ডে নিয়ে এ ধরনের ধৃষ্টতা পূর্ণ মেডিকেল রিপোর্ট দেওয়ার আসল কাহিনি উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা ওমর ফারুক ওই স্ট্যাটাসে তাঁর কমেন্টসে লিখেছেন :
“অনেকের হয়ত জানা নাই কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এর তখনকার কোনো এক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার বদৌলতে এই ডাক্তার কামদা প্রসাদ সাহা তনু হত্যা ঘটনার পরে ওই পোস্টমর্টেম মনগড়া রিপোর্ট দিয়ে বিশেষ মহলকে খুশি করে পুরস্কার হিসেবে পরিচালক হয়ে আসেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ঐ একই সামরিক কর্মকর্তার বদৌলতেই অল্পকালের মধ্যেই পরিচালক হয়ে যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সদর কার্যালয়ে। এখন এই ডাক্তার কামদা প্রসাদ সাহা আবার রেজিস্টার হিসেবে এসেছেন, খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। উনি এখন এত প্রভাবশালী যে উনার ‘টিকিটি’ কেউ ধরতে পারবে না। তবে প্রকৃতির বিচার আছে না, তনু হত্যা ঘটনার বিকৃত রিপোর্ট পেশের কয়েক বছর পর উনার (ডাক্তার কামদা প্রসাদ সাহার) একমাত্র সন্তান অর্থাৎ ছেলে সাইপ্রাসে গিয়ে আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে।”
এই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক কমেন্টসে কুমিল্লার এস জামান এই ভণ্ড ডাক্তার কামদা প্রসাদ সাহা সম্পর্কে স্বখেদে বলেছেন, “এসব মিথ্যুক ডাক্তারদের অতি দ্রুত গ্রেপ্তারসহ আইনের আওতায় আনা উচিত। যাতে ভবিষ্যতে এমন মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে আর কোনো নির্দোষীকে এভাবে কলঙ্কিত না করে। তাছাড়া সে কার স্বার্থে এ ধরনের রিপোর্ট তৈরি করেছে, তা জাতির কাছে স্পষ্ট হওয়া উচিত।”
আর একজন নাসির উদ্দিন কমেন্টসে লিখেছেন, “ফুলের মতন নিষ্পাপ মেয়েটিকে মৃত্যুর পর কত বড় অপবাদ! লাঞ্চিতা নিগৃহিতা ধর্ষিতা মেয়েটিকে মৃত্যুর পর অপবাদ দিয়ে মৃত্যুর রহস্যকে অন্য খাতে প্রবাহিত করেছে।”
অন্য একজন আতাউর রহমান বলেছেন, “এই ডাক্তার ক্রিমিনাল না হলে, অপরাধীর পক্ষে ধর্ষণের শিকার ভিকটিমের বিপক্ষে এমন রিপোর্ট দেবে কেন ?”
সৈয়দ আলী আফজাল তাঁর কমেন্টসে বলেছেন, “এ ব্যাপারটা শুধু শুধু লম্বা করছে, -তনুর বাবা লাশ নিয়ে হাসপাতালে গেলে ডাক্তার বলেছিল এই লাশ তো আগেও একবার নিয়ে আসা হয়েছিল! ব্যাস! কে নিয়ে এসেছিল, সেইতো খুনি।”
এ কে এম শামসুল আলম বলেছেন, “এই বদমাইশরা সঠিক মৃত্যুকে, সঠিক ঘটনাকে টাকার বিনিময়ে ভিন্নখাতে রিপোর্ট তৈরি করে। এদেরকেও বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।”
ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ হাসান তাঁর কমেন্টসে বলেছেন, “তনুর বাবা বলেছেন, তনু হত্যার দিন সন্ধ্যায় পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ ছিল। তিন জন সাধারণ সৈনিকের এত বড় ক্ষমতা সেনা নিবাসে পাঁচ ঘন্টা বিদ্যুৎ বন্ধ রাখে?”
আর একজন মাহমুদজ্জামান টিটু তার কমেন্টসে বলেছেন, “হত্যাকারীদের সহযোগী হিসেবে পোস্টমর্টেম টিমের প্রধান ডাক্তার কামদা প্রসাদ সাহাকেও আসামি করতে হবে।”
সফিক সাগর তার কমেন্ট সে বলেছেন, “এই ডাক্তারকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলে, সব কুকর্মের ইতিহাস বের হয়ে যাবে। কারণ সে ওই সময় কাকে খুশি করতে, কার চাপে এমন কুৎসিত কথা রিপোর্টে লিখেছে। সেটাই আগে খুঁজে বের করতে হবে।”
শফিকুর রহমান বলেছেন, “টাকার বিনিময়ে মিথ্যা রিপোর্ট তৈরির কারণে আসল অপরাধী ১২ বছর গ্রেপ্তার হয়নি। এই ডাক্তারকে আসামি করে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক রিমান্ডে নিয়ে প্রকৃত ঘটনা উন্মোচিত করা হোক।”
মনির হোসেন বলেছেন, “এই ডাক্তার নামের কুৎসিত ব্যক্তি কত মানুষের রিপোর্ট এরকম মিথ্যা দিয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। কে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক, কত মানুষের এভাবে ক্ষতি করেছে।”
আজিজুল হক তাঁর কমেন্টসে বলেছেন, “সে অলরেডি ছুটি চেয়ে আবেদন করেছে, মহানন্দে সার্কের দেশগুলো ঘুরবে বলে। মূলত সে আমেরিকা চলে যাবে।”
নাদিম কিবরিয়া বলেছেন, “আওয়াজ তুলুন। আসুন এই অপরাধীকে আইনের আওতায় জন্য সবাই একসাথে আওয়াজ তুলি। এরাই আজ দেশ জাতির শত্রু।”
কৌশলে তনুকে ধর্ষণ হত্যা এবং ধামাচাপা দেয়ার ঘটনাটি বর্তমান সরকার আমলে গতি পেয়েছে বলতে হবে। তবে আলোচিত তনু অপহরণ ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় তিনজনকে শনাক্ত করা হলেও মাত্র একজনের ডিএনএ টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। বাকিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলার সন্দেহভাজন আসামি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার ও ডিএনএ টেস্ট সম্পন্ন করেছে। অবশ্য সন্দেহভাজন অবসরপ্রাপ্ত আরও দুই সদস্যকে খুঁজছে পিবিআই। গ্রেপ্তারকৃত হাফিজুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি ঢাকার পিবিআই তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম গোপন রেখেছেন। কারণ জিজ্ঞাসাবাদ এখনো চলছে।
২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তদন্ত টিম তনুর থেকে নেয়া ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পায়। তবে তা এ পর্যন্ত এই সন্দেহভাজন তিনজনের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়নি। ৬ এপ্রিল ২০২৬ এই মামলার সন্দেহভাজন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান, সেনিক শাহিনুল আলমের ডিএনএ নমুনা ক্রস এর মাধ্যমে পরীক্ষার জন্য আদালতে আবেদন করে পিবিআই। আদালতের তাৎক্ষণিক আদেশ পেয়েই ওদের গ্রেপ্তার অভিযানে নামে পিবিআই-দুজনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের ডিএনএ নমুনা গ্রহণ এবং ক্রস চেকের মাধ্যমে মূল তথ্য উদ্ঘাটিত হবে বলে পি বি আই মনে করে।
দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সোহাগি জাহান তনু হত্যাকাণ্ডটি উদ্ঘাটনে রাষ্ট্র যখন তৎপর হয়েছে, বিভাগ যখন পুনঃ তদন্ত করছে, আমরা বিশ্বাস করি, সোহাগি জাহান তনু ধর্ষণও হত্যা কাহিনির অবশ্যই জট খুলবে এবং এর কূলকিনারা নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাবে।
তবে জনগণের দাবি, অনতিবিলম্বে ঐ সময়কার পোস্টমর্টেম টিমের প্রধান এখন খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার কুখ্যাত ডাক্তার কামদা প্রসাদ সাহাকে খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এর রেজিস্টার পদ থেকে বহিষ্কার এবং গ্রেপ্তার করতে হবে। তাকে রিমান্ডে নিলে এ ঘটনার নেপথ্যের কেষ্ট বিস্টুদের চেহারা উদ্ঘাটিত হবে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার আমলে যারা নেপথ্যে থেকে এইসব কুকীর্তির বিচারে বাধা সৃষ্টি করেছে তাদের মুখোশ উন্মোচিত হবে। এই কুখ্যাত ডাক্তার কামদা প্রসাদ সাহা কোনোভাবে যাতে পালিয়ে যেতে না পারে, তার জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের সতর্ক নজরদারি আকর্ষণ করে তাকে অনতি বিলম্বে গ্রেফতার এবং রিমান্ডে নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। তাহলে তনুর মা বাবা সহ দেশবাসী বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে সামান্য হলেও মুক্তি পাবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
খুলনা গেজেট/এনএম

