রবিবার । ২৬শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১৩ই বৈশাখ, ১৪৩৩

নিরুদ্দেশের পথে মন্নুজাহান আপা

মিনু মমতাজ

কবি মন্নুজাহান হোসেন তাঁর ‘ফিরে যেতে হবে’ কবিতায় লিখেছেন,
“ফিরে যাব একবস্ত্রে শুভ্র কাফনে
পিছনে থাকবে পড়ে সারাটি জীবন
দুঃখ সুখ আনন্দ হাসি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে।
শূন্য হস্তে শূন্য সঞ্চয়ে চলে যাব-
নানা পথ ঘুরে তোমার সম্মুখে আমি নতজানু
তোমার দয়ার ভিখারি এক অধম বান্দা আমি
কীভাবে কেমন করে তুমি তো
করুণাময়, রহমানুর রহিম”

মন্নুজাহান আপার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং বন্ধুত্বের। তিনি যে শুধু আমার অগ্রজ সাহিত্যিক ছিলেন তা নয় তিনি আমার একজন নির্ভেজাল শুভার্থী ছিলেন, যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত দুর্লভ।

আপার সাথে, আপার কাছে, আপার ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে, আপার হাজী মহসিন রোডে অবস্থিত বিশাল বাড়ির ড্রয়িং রুমের সাহিত্য আড্ডায়, লেখিকা সংঘের সাহিত্য আসরে, নন্দিনী, বনলতার সাংগঠনিক পরামর্শে, কোথায় নয়? সর্বত্র তিনি আমাদের জড়িয়ে ছিলেন। সপ্তর্ষীর প্রতিটি কর্মকাণ্ডে তিনি শরিক হতেন। বিশেষ করে রমজান মাসের ইফতার মাহফিল এবং কোরবানির মাংস সংগ্রহের দোয়া মাহফিলে, দানে সদকায় তিনি যথেষ্ট প্রাণবন্ত ছিলেন। খুলনা থেকে ঢাকায় চলে গেলেও তিনি আমাদের ভুলে যাননি। প্রতিবছর আমাদের আয়োজনে শরিক হয়েছেন। এবারের রমজান মাসেও সুমির (আপার কন্যা) মাধ্যমে আমাদের অনুষ্ঠানে অনুদান পাঠিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ। তার এসব আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশেই মন্নুজাহান আপা আমাদের অতি নিকটস্থ ছিলেন।

মন্নুজাহান আপার একক কাব্যগ্রন্থ ‘সায়াহ্নে একা’ আমার তন্ময় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তন্ময় প্রকাশনী যখন খুলনায় প্রথম পথচলা শুরু করে তখন তাকে একটি কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। আমাদের সমাজে যেকোনো সৃজনশীল কাজে প্রথমে কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় না। ক্রমশ তাকে শক্ত মাটিতে নিজের প্রচেষ্টায় দাঁড়াতে হয়। তাই সেই শক্ত সময়ে যারা পাশে এসে দাঁড়ায় তাদেরকে কেউ কি ভুলতে পারে? না, পারে না। তাই মন্নুজাহান আপা, মাজেদা হক, হোসনেআরা মাহমুদ লিলি, রিনা নাসরিন, শাহনওয়াজ বেগম, লায়লা আজাদ প্রমুখদের কখনোই আমি ভুলতে পারিনা। তাঁদের মতো গুণী, প্রাজ্ঞ, প্রতিষ্ঠিত, নামকরা লেখিকারা আমাকে তাদের বই করতে দিয়েছিলেন বলেই আজ আমার তন্ময় প্রকাশনী থেকে প্রায় ৫০টির মতো সৃজনশীল বই প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রকাশনার এই কঠিন শুষ্ক কাজে যেখানে লাভের কোনো সুযোগ নেই সেইখানে আমার মতো একজন ক্ষুদ্র প্রকাশকের হাত দিয়ে কিছু দুর্লভ বই প্রকাশিত হয়েছে, যা আমার কর্মময় জীবনকে ইনশাআল্লাহ স্মরণীয় করে রাখবে। এটাই আমার লাভ, এটাই আমার অর্জন। তাই মন্নুজাহান আপা আমার প্রকাশনার জীবনে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন।

২০০০ সালে যখন রূপসা নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্র খুলনায় নিকাশ পত্রিকার সম্পাদিকা রেহেনা আক্তার আলেয়ার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটে, তখনও রূপসা নন্দিনীকে প্রচণ্ড প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। রূপসা নন্দিনী সবকিছুকে অতিক্রম করে প্রচন্ড সার্থকতায় খুলনার বুকে আজ প্রতিষ্ঠিত। তিন তিনবার জাতিসংঘ শিশু পার্কে একুশের বইমেলা, একাধিক সমৃদ্ধ স্মরণিকা প্রকাশ, প্রায় প্রতিবছর সম্মেলনে সারা বাংলাদেশের নন্দিনীদের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি, ঢাকা-কলকাতা- আসাম-সিলেট-রাজশাহী সর্বত্র খুলনা নন্দিনীদের সগৌরব পদচারণার পিছনে মন্নুজাহান হোসেন, মাজেদা হক, সুরাইয়া বেগম, লায়লা আজাদ, শাহনওয়াজ বেগম, আনোয়ারী বেগম, শামসুন্নাহার পারা সহ বহু বহু বর্ষীয়ান নন্দিনীদের পরামর্শ, অভিভাবকত্ব নির্দেশনা ও প্রচণ্ড স্নেহসিক্ত ভালোবাসা ছিল যা আমরা দুহাত ভরে পেয়েছি। আমাদের সংগঠনগুলো পেয়েছে। আজ মাজেদা হক-মোজাম্মেল হক নেই, শাহনওয়াজ আপা দূর বিদেশে আকুল হৃদয়ের কান পেতে থাকেন। মোবাইলে বলেন- “মিনু সবাই কেমন আছে? মাজেদা আলী আপা ভালো আছেন তো? আমার কথা তাকে বোলো, আমার চিঠি তুমি তাঁকে পৌঁছে দিও।” ‘মন্নুজাহান’- ও কেমন আছে?

কিছুক্ষণ আগে শাহনওয়াজ আপার মেয়ের স্বাতীকে মেসেঞ্জারে মন্নুজাহান আপার ইন্তেকালের খবরটা দিলাম।

আমার ভাগ্যও বলিহারি। এই তো কিছুদিন আগে ইনার হুইল ক্লাবের রিতা আপা ইন্তেকাল করলেন। চলে গেলেন মহিলা সমিতির মনোয়ারা আপা।

একটার পর একটা চলে যাওয়ার খবর। এখন হৃদয়ও যেন অসাড় অসাড় লাগে। মনে হয় ভূমিকম্প হচ্ছে তো হোক। প্রিয়জন চলে যাচ্ছে, তা চলে যাক। আমিও তো চলে যাব। পৃথিবীতে কিছুই আটকে থাকে না। হয়ত বিশ্বায়নের বর্তমান ভয়াবহ বিবর্তনে আমরাও কেমন যেন রোবটের মতো বিবর্তিত হয়ে যাচ্ছি।

কিছুই যেন হৃদয়ের কোণে জমে না
কিছুই যেন বোধের গভীরে আঘাত করে না
কিছুই যেন চোখের পাতায় অশ্রু ঝরায় না
কিছুই যেন আর ভালো লাগে না।
মন্নুজাহান আপা নেই
ভালো লাগছে না।

যাই হোক, কবি মন্নুজাহান আপার জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৪শে মে অর্থাৎ বহু পুরাতন আমলের মানুষ হিসেবে তিনি খুলনায় বিরাজমান ছিলেন। বাবা-মায়ের একমাত্র আদুরে সন্তান হিসেবে লালিত পালিত হলেও অল্প বয়সে বিয়ে এবং বৈবাহিক জীবনে ৮ সন্তানের জননী হয়ে তিনি খুলনার স্বনামধন্য অ্যাডভোকেট এ জে এম দেলোয়ার হোসেনের সুযোগ্য সহধর্মিণী হিসেবে সুদীর্ঘ কাল ধরে সাংসারিক সকল দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে গেছেন। সমাজে রেখে গেছেন আদর্শ নারী চরিত্র। পাশাপাশি একজন সফল শিক্ষিকা, সুসাহিত্যিক, সমাজসেবী, একজন দরদি মানুষ হিসেবে খুলনার বিভিন্ন সংগঠনে তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন।

তাঁর প্রথম উপন্যাস “ভালোবাসার ভুবন” এবং ছোট গল্প সংকলন “জনারণ্যে সুবাতাস” আজও সাহিত্যামোদী মানুষের অন্তরে তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। এছাড়াও বহু সাহিত্য -পত্রিকা, ভাঁজপত্র, সাহিত্য সংকলনে তাঁর লেখা নিয়মিত ছাপা হতো। তিনি অত্যন্ত পড়ুয়া মানুষ ছিলেন এবং তাঁর বাসায় বিশাল পাঠাগার ছিল। বহু পুরাতন বই পুস্তক তিনি সংগ্রহ করতেন। বহুল প্রচলিত বেগম পত্রিকা সহ বহু দুষ্প্রাপ্য বই পুস্তক, পত্রিকা তাঁর সংরক্ষণে ছিল।

তিনি অত্যন্ত জ্ঞানপিপাসু ও ধর্মভীরু মানুষ ছিলেন। তাঁকে যে নিকট থেকে দেখেছে সে কখনও তাঁকে ভুলবে না। আমরাও তাঁকে ইনশাল্লাহ ভুলবো না। শেষ জীবনে তিনি দুঃখ করে বলতেন, “আমি ‘আমি’ হতে পারিনি, ‘আমি’ হতে পারি, এমন একটা জীবনও আমি পাইনি। তাঁর জন্য প্রাণভরে দোয়া করি, তিনি যেন অমরাবতীর প্রাঙ্গণে তেমন জীবনই লাভ করেন, আমিন।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন