সোমবার । ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ । ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩

ঘুষ ছাড়া পুলিশের চাকরি : সত্য-মিথ্যা

কামরুল ইসলাম

আজকাল প্রায়ই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায় বড় বড় পুলিশ অফিসারগণ পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পেতে স্বচ্ছতার কথা বলছেন। অর্থাৎ ঘুষ ছাড়া চাকরির হবে বলে আশ্বাস দিচ্ছেন। তাঁদের কথা বলার ভঙ্গিতে আমার অন্তত আস্থা আছে। কারণ তাঁদের অনেকের সততা ও দক্ষতার বিষয় আমি জানি। কিন্তু জনসাধারণ তাঁদের কথা বিশ্বাস না করে অনেক অপমানজনক মন্তব্য করছেন। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। অধিকাংশ ভুক্তভোগী জনসাধারণ পুলিশের উপর যেমন আস্থা রাখে না, তেমনি নিজের উপরও তাদের আস্থা নেই। এজন্য পুলিশ কতটুকু দায়ী, আর দালাল চক্র কতটুকু দায়ী এবং চাকরিপ্রার্থী নিজে কতটুকু দায়ী তার একটা বাস্তব ঘটনা এখানে তুলে ধরছি। এই ঘটনা থেকে পুলিশ কর্মকর্তা, চাকরিপ্রার্থী ও দালালচক্র সম্পর্কে সকলে কিছুটা হলেও সতর্ক হবেন বলে আমার বিশ্বাস।

১৯৯৫ সালে আমি কুষ্টিয়া সদর থানার ওসি ছিলাম। তখন পুলিশ সুপার ছিলেন জনাব খান শামীম আহসান। তিনি ছিলেন আমার দেখা একজন চৌকস ও দক্ষ অফিসার। আমাকে তিনি ছোট ভায়ের মতো স্নেহ করতেন। আমার যেকোন কথা তিনি অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন। আমিও তাঁর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করতাম। তখন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন জনাব খান সাঈদ হাসান। তিনিও অত্যন্ত দক্ষ ও চৌকস অফিসার ছিলেন। এক প্রকার আমরা তিনজনে মিলে সমগ্র জেলা পুলিশ পরিচালনা করতাম।
এবার আসল কথায় আসি। ঐ বছর কুষ্টিয়া জেলা থেকে ২৪ জন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের চিঠি এলো।

পুলিশ সুপার মহোদয় আমাকে ডেকে বললেন- এবার আমরা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করবো। এক টাকা ছাড়াই ২৪ জন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ দিবো। তুমি আমার সাথে থাকবা। অন্য জেলা থেকে দুইজন এডিশানাল এসপি আসবেন। তারাও সৎ লোক। তবে তারা তো এখানকার লোকজন চিনবেন না। তাই তোমাকেই সকল দায়িত্ব নিয়ে স্বচ্ছ নিয়োগ দিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক সুপারিশও শুনবো না। কারণ তারা টাকার বিনিময়ে সুপারিশ করে। ওদিকে এডিশনাল এসপি চলে যাবে অন্য জেলায় নিয়োগ বোর্ডের সদস্য হয়ে। এখন তোমাকেই সব সামলাতে হবে। তুমি পারবে তো?

– জী স্যার। আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করবো। তবে অন্য থানার ওসিদের সাহায্য নিলে কেমন হয়?

-না। আমি অন্য কাউকে আস্থা করি না।

আমি বাধ্য হয়ে তাঁর কথায় রাজি হলাম এবং বাছাই ও লিখিত পরীক্ষার পর যারা মৌখিক পরীক্ষায় চান্স পেলো তাদের খোঁজ খবর নিতে থাকলাম। তারা যেন দালালদের খপ্পরে পড়ে কাউকে টাকা পয়সা না দেয় সেজন্য সচেতন করতে থাকলাম। ইতোমধ্যে আমার বাসায় একজন লোক এলো। অবশ্য আমি কুষ্টিয়া যাওয়ার পর সে আমার বাসায় প্রায়ই যাতায়াত করতো। কারণ তার বাড়ি আমার বাড়ি একই পাড়ায়, একই গ্রামে। সম্পর্কে আমার প্রতিবেশী চাচাতো ভাই। বয়সে আমার থেকে সামান্য ছোট। বিয়ে করেছে কুষ্টিয়ার মেয়ে। সেই সুবাদে তখন কুষ্টিয়ায় ছিল। সে খুব মিষ্টভাষী।

সে একদিন একটি ছেলেকে নিয়ে আমার বাসায় হাজির হলো। ছেলেটি বেশ সুদর্শন। সে বললো- ভাই, এই ছেলেটি ভীষণ গরীব। বাড়ি মিরপুর থানায়। তাকে যেকোনো উপায়ে চাকরি দিতেই হবে।

ছেলেটির প্রতি আমারও মায়া হলো। আমি তাকে পরীক্ষার পদ্ধতি, শারীরিক পরীক্ষার পদ্ধতি, মোখিক পরীক্ষার পদ্ধতি সবকিছু শিখিয়ে দিলাম। শেষ পর্যন্ত সে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়ে আমার বাসায় অনেক মিষ্টি নিয়ে হাজির হলো। আমি সেই মিষ্টির প্যাকেট থেকে মাত্র একটি মিষ্টি খেয়ে বললাম- সবগুলো মিষ্টি তোমার বাড়িতে নিয়ে যাও এবং বাবা মা’কে খাইয়ে তাদেরকে আমার সালাম দিও এবং দোয়া করতে বলবা। আল্লাহর রহমতে ২৪ জনের মধ্যে ১২ জনের চাকরি আমার সুপারিশে হয়েছিল।

ছেলেটির মুখের দিকে চেয়ে আমি ততটা তৃপ্তি পেলাম না। সে যেন আমাকে আরও কিছু বলতে গিয়ে বার বার থেমে যাচ্ছিল। আমি মিষ্টি না নিয়ে মাত্র একটি মিষ্টি খাওয়ায় সে আমার উপর একটু বিশ্বাস স্থাপন করে বললো-

স্যার, আপনি মিষ্টি রাখলেন না। অথচ আপনি যা চেয়েছিলেন তার পুরাটাই আমি জমি বিক্রি করে আপনার ভাইয়ের কাছে আগেই দিয়েছিলাম।

আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। নিজেকে খুব ছোট মনে হতে লাগলো। আমার ঐ ভাই নামক বস্তুটিকে সামনে পেলে হয়ত গুলি করে দিতাম। একবার ভেবেছিলাম পুলিশ সুপার মহোদয়কে সব কথা খুলে বলি এবং ঐ ছেলের নিয়োগ বাতিল করার ব্যবস্থা করি। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম, ওর কী দোষ? বিক্রি করা জমি সে আর কখনোই ফেরত পাবে না। এদিকে চাকরিটাও পাবে না। শেষ পর্যন্ত আমি নিজের কাছে হেরে গিয়েছিলাম। এরপর আমি যতদিন কুষ্টিয়া সদর থানায় ছিলাম ততদিন সেই ভাই নামক কুখ্যাত অমানুষটি আমার সাথে কখনও দেখা করেনি। অবশ্য এখন বাড়িতে থাকলে মাঝে মাঝে দেখা হয়। তখন আমার সেই কথা মনে পড়ে। আবার শুনি- সে বাজারঘাটে অনেক বড় বড় বুলি আওড়ায়। আমি তখন চিন্তা করি এই সেই দালাল, যে আমাকে ও পুলিশ বিভাগকে সত্যিকার ভালো কাজ করতে দেয়নি।

এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কেন সাধারণ মানুষ পুলিশের উপর আস্থা রাখে না তা বুঝতে হবে। দালাল চক্রের উপর গোয়েন্দা নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে। চাকরি প্রার্থীদেরও সঠিক মানুষ চিনতে হবে। কোনোক্রমেই দালালদের খপ্পরে পড়ে টাকাপয়সা দেওয়া ঠিক হবে না। যদি সত্যি কোনো পুলিশ অফিসার টাকার বিনিময়ে চাকরি দিতে চায় তা বন্ধ করা কোনো কঠিন কাজ নয়। সবচেয়ে বড় কথা, কেউ দালালদের খপ্পরে পড়ে কাউকে কোনো টাকাপয়সা দিবেন না। আপনার যোগ্যতা থাকলে চাকরি হবে ইনশাআল্লাহ। অহেতুক পুলিশের উপর এককভাবে দোষ চাপাবেন না।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন