পহেলা বৈশাখ মানে রবি ঠাকুরের সেই সংগীত ‘এসো হে বৈশাখ।’ বৈশাখ মানে পুরাতনকে বিদায় দিয়ে নতুনকে বরণ করা। বৈশাখ নিয়ে আসে কাল বৈশাখীর ঝড়, বৈশাখ মানে নতুন প্রকৃতি। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়…
কাল-বৈশাখি আসিলে হেথায় ভাঙ্গিয়া পড়িত কোন সকাল,
ঘুণ-ধরা বাঁশে ঠেকা দেওয়া ঐ সনাতন দাওয়া, ভগ্ন চাল।
এলে হেথা কাল-বৈশাখি? মরা গাঙে যেত বান ডাকি?
বদ্ধ জাঙ্গাল যাইত ভাঙিয়া, দুলিত এ দেশ টালমাটাল।
আসলে এই বৈশাখ কবে থেকে শুরু হলো? কে এই বৈশাখ আমাদের মাঝে এনে দিল তা হয়ত অনেকের অজানা। আবার অনেকেরই মনে আছে। পহেলা বৈশাখ বা পয়লা বৈশাখ মানে আমরা বুঝি বাংলা বর্ষ পঞ্জিকার প্রথম মাস এবং বৈশাখের ১ তারিখ। তথা বাংলা নববর্ষ। যদি প্রশ্ন করা হয় এটি বাংলা কত সাল? কিন্তু এর উত্তর অনেকেই দিতে পারে না। যদি প্রশ্ন করা হয় কবে এই সনটি চালু করা হয়? কে বাংলা সন চালু করেন? কেন তিনি বাংলা সনকে চালু করেছেন? বর্তমান সময়ের অনেকের কাছেই এর উত্তর পাওয়া খুবই কষ্টকর। কারণ আমরা দিনে দিনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমাদের ঐতিহ্যকে ভুলে যাচ্ছি। অনেক গবেষকের মতে, ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা ও হয় আকবরের সময় হতে। বাংলা বর্ষপঞ্জিটি প্রথমে তারিখ-ই-এলাহী বা ফসলি সন নামে পরিচিত ছিল। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ অথবা ১১ মার্চ এটি বঙ্গাব্দ নামে প্রচলিত হয়। খাজনা আদায়ের সুষ্ঠুতা প্রণয়ের জন্য মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রচলন করেন। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশের মানুষ কত সালে বাংলা নববর্ষ পালন করে আসছে? এর উত্তর হয়ত কিছু কিছু মানুষ দিতে পারবে। বেশিরভাগ মানুষই দিতে অক্ষম হবে বলে আমি মনে করি। ১৩৭১ সালে (ইংরেজি ১৯৬৪ সালে) রমনার বটমূলে ছায়ানট নামের একটি সংগঠন প্রথমে বাংলা নববর্ষ পালন করে। কালক্রমে বাংলার জাতীয় উৎসব হিসাবে পালন হচ্ছে।
বর্তমানে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেলা এবং বিভিন্ন উৎসব পালন করা হয়। সারা দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়। নববর্ষকে কেন্দ্র করে নারী পুরুষ বিভিন্ন রঙের পোশাক পরে। ছেলেরা সাদা পাঞ্জাবি যাতে ঢোল, একতারা, কুলা ইত্যাদির ছবি আঁকা থাকে। মেয়েদের পরনে থাকে সাদা, হলুদ শাড়ি। বাংলার পল্লি গ্রামগুলোতে বৈশাখ উৎসবে শুরু হয়-পালাগান, যাত্রাগান, কবিগান, পুতুলনাচ, নাগরদোলাসহ নানান আনন্দ আয়োজন হয়ে থাকে। কিন্তু পহেলা বৈশাখের দ্বিতীয় বৃহত্তর হালখাতা এখন বিলুপ্তির পথে। আগের দিনে নবাব এবং জমিদারা পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পুণ্যাহ বা হালখাতা করতেন। পহেলা বৈশাখে জমিদারগণ চাষির কাছ থেকে বকেয়া আদায় করার জন্য একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করতেন। চাষিদের ঐ দিনে মিষ্টি বিতরণ করতেন। কোন কোন জমিদার ভালো গোশ্ত পোলাও রান্না করে বিয়ে বাড়ি উৎসবের মতো আপ্যায়ন করে পেট ভরে খাওয়াত। এতে করে জমিদারদের সাথে বর্গা চাষীদের দূরত্ব কমে যেতো। একটা ভ্রাতৃত্ব বন্ধন তৈরি হতো। আজ জমিদার প্রথার পাশাপাশি পুণ্য বা হালখাতা বিলুপ্তির পথে। আগের যুগে ব্যবসায়ী বা দোকানদারেরা সারাবছর বাকিতে মাল বিক্রয় করতো। কিন্তু পহেলা বৈশাখ আসলে তাদের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন রঙে রঙিন করে মাইক বাজিয়ে এবং হালখাতা কার্ড করে দাওয়াত দিয়ে আপ্যায়ন করতো এবং পেট ভরে খাওয়ানোর পর মিষ্টি ভর্তি প্যাকেট বাড়ির জন্য দিয়ে দিত। গ্রামে খুচরা দোকানগুলোতে সারাদিন মাইক বাজিয়ে হালখাতার উৎসব পালন করত। ছোট সময় অপেক্ষায় থাকতাম কবে পহেলা বৈশাখ আসবে। আর বাবা মিষ্টি নিয়ে বাড়িতে আসবেন। বাবার সাথে প্রায় হালখাতা যাওয়া হতো মোকামে। কিন্তু বর্তমান গ্রামগঞ্জে হালখাতা নাই বললেই চলে। একেবারেই এই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে অপস্কৃতির কারণে দেশে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা হচ্ছে না। অথচ এই পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির হাজার বছরের সংস্কৃতি প্রধান উৎসব। শুধু বছরের একদিন নয় বাঙালি জাতির সংস্কৃতি চর্চা যদি সারা বছর জুড়ে হয় তাহলে বাঙালি শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে এবং নববর্ষ হবে আরোও সমৃদ্ধ।
খুলনা গেজেট/এনএম

