শেষ চৈত্রের ধূলি ঝড়ের মধ্যদিয়ে, কালবৈশাখীর দাপটে, ‘ওই নতুনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর, তোরা সব জয়ধ্বনি কর!’
এই অগ্নিমন্ত্রের মাধ্যমে জীর্ণ রুক্ষ প্রান্তর, শেষ চৈত্রের বিকেলে মুহূর্তে দমকা এলোমেলো ঝড়ে অসংখ্য অসহায় মানুষের জীর্ণ কুঁড়েঘর মুহূর্তে তছনছ হয়ে যায়। বিরান মাঠে আহাজারি চলে, এর মধ্যে নতুনের আবাহনে সিক্ত হয়ে, একদিকে বিরাট ধ্বংসযজ্ঞ আর একদিকে নতুন সৃষ্টির উল্লাসে নতুন আকাঙ্খায় উদ্ভাসিত হয়ে, বাংলাদেশে নতুনের উদ্বোধন ঘটিয়ে আসে পহেলা বৈশাখ।
আবহমানকাল থেকে বাঙালিরা বারো মাসে তেরো পার্বণ উপভোগ করে আসছে। এই অসংখ্য উৎসবের ভিড়ে যে উৎসবটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা গোষ্ঠীর নয়, বরং গোটা জাতির প্রাণের স্পন্দন তা’ হলো পহেলা বৈশাখ। এই জন্যই মূলত : এই পার্বণ মালার মুকুটে শ্রেষ্ঠ রত্নটি হলো পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ। বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটি কেবল পঞ্জিকার পরিবর্তন নয় বা ক্যালেন্ডার এর পাতা উল্টানো নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয়, হাজার বছরের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং শেকড়ের সন্ধানে, শেকড়ের টানে ফেরার মহোৎসব। একটি বৈচিত্র্যময় নিয়মিত মিলন মেলা। সময়ের আবর্তনে নববর্ষ উদ্যাপনের ধরনে এসেছে পরিবর্তন, কিন্তু এর স্বত:স্ফূর্ত প্রাণের স্পন্দন রয়ে গেছে আগের মতই অমলিন।
সেকাল : গ্রামীণ সারল্য ও উৎসবের আদিরূপ–সেকালের নববর্ষ ছিল মূলত, কৃষি নির্ভর এবং ঋতুভিত্তিক। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে রাজস্ব আদায থেকে উৎসব বাংলা সনের প্রবর্তন নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতটি মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত ‘ফসলি সন’ কাল ক্রমে রূপান্তরিত হয়ে বাঙালির সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। সম্রাট আকবরের সময়ে এই জনপদে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এই সনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
ফসলি সন : তৎকালীন সময়ে হিজরি সন অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা হতো। কিন্তু চান্দ্র মাস ও সৌর মাসের পার্থক্যের কারণে কৃষকদের ফসল কাটার সময়ের সাথে খাজনা দেওয়ার সময় মিলতো না।
সম্রাট আকবরের উদ্ভাবন : কৃষি প্রধান তৎকালীন বাংলাদেশে কৃষকদের এই সমস্যা সমাধানে সম্রাট আকবর তার রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজীকে একটি নতুন সৌর পঞ্জিকা তৈরির নির্দেশ দেন।
সমন্বয় : ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তিত এই নতুন সনটি হিজরি এবং হিন্দু সৌর পঞ্জিকা কে সমন্বিত করে তৈরি হয়, যা শুরুতে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এটি আমাদের প্রিয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পহেলা বৈশাখ : বাংলাদেশ এবং বাঙালি ও পাহাড়িদের প্রাণের উৎসব নববর্ষের সকালে সূর্যের প্রথম কিরণ যখন পূর্ব দিগন্তে উঁকি দেয়, তখন বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত হয়, রবি ঠাকুরের সেই চির চেনা চিরন্তন সুরে –‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।’ আধুনিক বাঙালির জীবন মননে পহেলা বৈশাখ এক অনন্য নান্দনিক রূপ পরিগ্রহ করেছে।
আনন্দ শোভাযাত্রা বা মঙ্গল শোভাযাত্রা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে বের হওয়া বর্ণিল এই শুভযাত্রা আজ ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। মুখোশ, লোকজ পুশংল, আর হরেক রকম কারু কাজ এখানে আনন্দের অবগাহন শুরু হয় সকল শ্রেণির নাগরিকের সমন্বয়ে।
হালখাতা ও আপ্যায়ন : সেকালের নববর্ষের মূল আকর্ষণ ছিল ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’’। তাই নতুন বছরে খাতা খোলার নাম ‘হালখাতা’। পুরোনো খাতার কাটাকুটি মুছে ফেলে দেনা পাওনা পরিশোধ করে, লালসালুর মলাটে নতুন খাতা খোলা হতো। সারা বছরের লেনদেনের বকেয়া বা পুরোনো দেনা পরিশোধ করতে আসা গ্রাহকদের মিষ্টি, রসগোল্লা, নিমকি আর শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। এটি ছিল গভীর সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।
প্রধান আকর্ষণ চৈত্র সংক্রান্তি ও মেলা : নদীর পাড়ে, বিশাল মাঠে, বছরের শেষ দিনে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসতো। এখানে মাটির পুতুল, নাগরদোলা, বাতাসা, ফিরনি, মুড়ি- মুড়কি আর বাঁশির সুরে মুখরিত গ্রাম বাংলা। নীল পূজা ও গাজন উৎসব ছিল সেকালের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
খাবার দাবার : বাড়িতে নতুন বর্ষে তৎকালে ভালো খাবার-দাবারের আয়োজন থাকতো। পান্তা ইলিশের চল তখন এভাবে ছিল না। গৃহস্থের বাড়িতে বাড়িতে রান্না হতো নিরামিষ তরকারি (পাঁচমিশালি তিতো), পিঠা-পুলি আর ফিরনি পায়েস। নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি করা হতো বিশেষ ধরনের খাবার।
পহেলা বৈশাখের এ কাল : নাগরিক জৌলুস ও বিশ্বজনীনতা — এক বিংশ শতাব্দীতে এসে নববর্ষ উদ্যাপন নতুন ঢঙে, নতুন ভাবে পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। গ্রামের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে এটি এখন শহরের রাজপথে বর্ণিল উৎসবে পরিণত হয়েছে। নতুন মোড়কে রং উৎসবও চলে এই দিনটিতে।
আহার বিহার : পান্তা ইলিশের বিলাসিতা কিংবা ঘরোয়া খাবারে নববর্ষ পালন বাঙালির রান্নাঘর বৈশাখে চিরকালই সুবাসিত। সানকিতে খাওয়ার মধ্যে যে তৃপ্তি, তা যেন আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যেরই স্মারক।
আধুনিকতায় বাংলা সন : আজকের যান্ত্রিক জীবনেও বাংলা সন তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা মাটির মানুষ। বৈশাখী মেলায় নাগরদোলার ক্যাচ ক্যাচ শব্দ, মাটির পুতুল আর খই মুড়কির মিষ্টি গন্ধ আমাদের নাগরিক ক্লান্তি দূর করে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়।
‘পুরোনো আবেশ হতে মুক্ত করে মন, আসুক নবীন প্রাণ, নতুন বর্ষের আবাহন।’
বাঙালি জীবনে বাংলা সনের প্রবর্তন তাই কেবল একটি তারিখের হিসাব নয়, এটি একটি জাতির টিকে থাকার প্রেরণা, সম্প্রীতির সেতুবন্ধন এবং সংস্কৃতিকে বুক পেতে আগলে রাখার এক মহিমান্বিত অঙ্গীকার। পহেলা বৈশাখ আসুক বারবার। প্রতিটি বাঙালির মনে নিয়ে আসুক নতুন জয় গান।
লেখক : অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

