মানব সভ্যতার অন্যতম বাহন বর্ষপঞ্জি; বর্ষপঞ্জি বিনির্মাণের ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় চার হাজার বছরেরও পূর্বে ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় বর্ষপঞ্জির ব্যবহার ছিল বলে জানা যায়। শুধু তাই নয়, নববর্ষ উদ্যাপনের শুরুটাও সেই সময় থেকে। কালের প্রবাহে নানা বিবর্তনে পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন প্রকার বর্ষপঞ্জি চালু হয়েছে।
বাংলা বর্ষপঞ্জিতে ব্যবহৃত সন, তারিখ উভয় শব্দটি আরবি ভাষা থেকে এসেছে। সাল, বার শব্দগুলি এসেছে ফারসি ভাষা থেকে।বাংলা বর্ষপঞ্জির ইতিহাস জানতে হিজরি ও গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জির ইতিহাস কিছুটা জানা দরকার।
হিজরি সন : ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাঃ ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে হিজরি সন প্রবর্তন করেন। তবে তিনি শুরুটা ধরেন নবী সাঃ যে বছর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন সেই বছরের পহেলা মহরম থেকে। চাঁদের দুই পক্ষ, শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ মিলে সময় কাল ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। চাঁদের পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ১২ বার শুক্লপক্ষ ও ১২ বার কৃষ্ণপক্ষের সময়কে এক বছর ধরা হয়। যার সময় কাল ২৫৪ দিন ৯ ঘণ্টা অর্থাৎ এক হিজরি বছর পূর্ণ হয় ২৫৪ দিন ৯ ঘণ্টায়। আমাদের উপমহাদেশে মুসলিম শাসন আমলে ইসলাম ধর্মের প্রচলিত ১২ মাসের নামকরণ যথাক্রমে মহরম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জামাদিউল আউয়াল, জামাদিউস সানি, রজব, সাবান, রমজান, শাওয়াল, যিলকত, যিলহজ চালু হয়।
খ্রিষ্টীয় সন : রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার জ্যোতির্বিদদের সাহায্যে সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর পরিক্রমার হিসাব করে একটি বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করেন, যা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত ছিল। ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটেনে সেন্ট গ্রেগরিয়াসের নেতৃত্বে ঐ জুলিয়ান ক্যালেন্ডার-এর সংস্কার করা হয়। বর্তমানে ঐ গ্রেগোরিয়ানের সংস্কারকৃত বর্ষপঞ্জি খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জি হিসেবে পরিচিত। গ্রিক দেবতা ও রোমান সংখ্যার ভিত্তিতে এই বর্ষপঞ্জি মাসের নাম করা হয়েছে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর, খ্রিষ্টীয় বর্ষ হয় পূর্ণ হয় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে।
এবার আসা যাক বাংলা সাল সৃষ্টির সম্পর্কিত কথায়। সম্রাট আকবর বছরের ফসল ওঠার পর পর খাজনা আদায় করতে গিয়ে দেখেন হিজরী সাল হিসাবে বছরের একই সময় বা মাসে ফসল ওঠে না। কারণ ঋতুচক্র নির্ভর করে সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর প্রশিক্ষণের উপর অর্থাৎ পৃথিবীর বার্ষিক গতির উপর সুতরাং হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে খাজনা আদায়ের অসুবিধা দূর করার জন্য আকবরের মন্ত্রিসভার প্রজ্ঞাজন আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী হিজরি ৯৬৩ সালে পৃথিবীর বার্ষিক গতি (সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর প্রশিক্ষণের সময় কাল) অনুসারে বছর গণনা শুরু করেন। হিজরি ৯৬৩ সনের ১ মহরম থেকে এই বছর গণনা ও খাজনা আদায় পদ্ধতি চালু হয়। আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী প্রণীত নতুন বর্ষপঞ্জিতে মাসের নামকরণ করা হয়েছে ওই নির্দিষ্ট মাসে আকাশে দৃশ্যমান নক্ষত্রের নাম অনুসারে। বাংলা ১২ মাসের নামকরণ করা হয় বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র। বাংলা বর্ষপঞ্জি আমির ফাতেউল্লাহ সিরাজী প্রণীত বাংলা বর্ষপঞ্জিকাতে বেশ কিছু ত্রুটি ও অসুবিধা দেখা দেয়। ওই সকল ত্রুটি ও অসুবিধা দূর করার জন্য ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ডঃ মোঃ শহিদুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার কমিটি গঠিত হয়। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলার সংস্কারকৃত বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করেন। পরবর্তীতে ড, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র এই বর্ষপঞ্জিকে আরও আধুনিকায়ন করেন। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি থেকে তৎকালীন হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রণীত বাংলা বর্ষপঞ্জি চালু করেন।
বর্তমানে চলমান বর্ষপঞ্জি অনুসারে বছরের প্রথম ৫ মাস বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিনে হয়। শেষের সাত মাস ৩০ দিনে হয়। লিপ ইয়ার বা মল বছরে চৈত্র মাস হবে ৩১ দিনে অর্থাৎ লিপ ইয়ার বাংলা বছর হয় ৩৬৬ দিনে। লিপ ইয়ার বা মল বছর বলতে বুঝায় যে বছরকে ৪ দ্বারা ভাগ করলে ভাগফল নিঃশেষে বিভাজ্য হয়। এখানে আরেকটি তথ্য জেনে রাখা ভালো যে সম্রাট আকবরের সময় থেকে সময় মাসের প্রত্যেকটি দিনের জন্য পৃথক পৃথক নাম ছিল। সম্রাট শাহজাহান একজন পর্তুগিজ পণ্ডিতের সহায়তায় মুসলিম সপ্তাহের প্রতিটি দিনের নামকরণের মতো বাংলা ৭ দিনের নাম পদ্ধতি চালু করেন। সূর্যের কয়েকটি গ্রহের নাম ও চাঁদের নাম অনুসারে সপ্তাহের সাত দিনের নামকরণ করা হয়। সেই থেকে এই পদ্ধতি চালু রয়েছে। যেমন সূর্য বা রবি থেকে রবিবার, চন্দ্র বা সোম থেকে সোমবার, মঙ্গল গ্রহ থেকে মঙ্গলবার, বুধ গ্রহ থেকে বুধবার, বৃহস্পতি গ্রহ থেকে বৃহস্পতিবার, শুক্র গ্রহ থেকে শুক্রবার এবং শনি গ্রহ থেকে শনিবার। আজ একবিংশ খ্রিষ্টাব্দে ও বাংলা চতুর্দশ শতাব্দীতে এসে বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি বিশ্বের বুকে একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। বাংলা ভাষা যেমন আজ পৃথিবীর মর্যাদাশীল সপ্তম ভাষা। বাংলা বর্ষপঞ্জিও তেমনি বিশ্বের অন্যতম একটি বর্ষপঞ্জি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বাঙালিদের কিছু করার আছে, বিশেষত স্বাধীন বাংলাদেশের বাঙালিদের। বাংলা বর্ষপঞ্জিকে বাংলাদেশে ও বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে কতগুলি কার্যক্রম হাতে নেয়া যেতে পারে।
(এক) বাংলা বর্ষ ও মাস অনুসরণ করে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বেতন প্রধান সহ সকল প্রকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
(দুই ) বাংলা বছর- মাস -দিন অনুসরণ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ শিক্ষা বর্ষ চালু করা।
(তিন) অভ্যন্তরীণ, সরকারি ও বেসরকারি অনুষ্ঠান সময়ে বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা।
(চার) অভ্যন্তরীণ ট্যাক্স, খাজনা, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাসের বিল, ওয়াসা বিল প্রভৃতির সকল কার্যক্রমে বাংলা দিনপঞ্জি অনুসরণ করা।
(পাঁচ) রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন অনুষ্ঠানে বিদেশিদেরকে আমন্ত্রণ জানানো এবং বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করা।
(ছয়) সরকারি বেসরকারি অফিসিয়াল চিঠিপত্র কর্মকর্তা কর্মচারী স্বাক্ষর-এর নিচে তারিখ বাংলায় করা।
সর্বশেষে কামনা করব বিশ্বের সকল বাঙালি নিজ নিজ স্তরে বাংলা ভাষা বাংলা বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করলে বাংলা ভাষা তার কাক্সিক্ষত গৌরব কিছুটা অর্জন করতে পারবে বলে মনে করি। ধন্যবাদ সকলকে।
লেখক : সভাপতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম গবেষণা পরিষদ, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম

