বুধবার । ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩

আসছে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম, প্রস্তুত তো উপকূল?

আল শাহারিয়া

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে আমাদের বদ্বীপে আবারও ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম উপস্থিত। চৈত্র শেষে কালবৈশাখির সাথে সাথে বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন লঘুচাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা দ্রুত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার শঙ্কা তৈরি করছে। বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ায় এই দুর্যোগগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক রূপ নিচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এপ্রিল ও মে মাস উপকূলীয় প্রান্তিক মানুষের জন্য চরম আতঙ্কের। তাই স্বাভাবিকভাবেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে, এবারের দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের উপকূল কতটা প্রস্তুত?

২০২৪ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় রেমালের ক্ষত উপকূলের মানুষ আজও বয়ে বেড়াচ্ছে। রেমালের আঘাত ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি মানুষের মনস্তত্ত্বেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ডুমুরিয়া উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়নের বয়োজ্যেষ্ঠ রহিম শেখ ও তাঁর স্ত্রীর সারা জীবনের সঞ্চয় ছিল একটি মাটির ঘর এবং ছোট একটি মাছের ঘের। রেমালের রাতে দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে নোনা পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। মুহূর্তেই তাঁদের কাঁচা ঘরটি ধসে পড়ে। অন্ধকার রাতে প্রাণ বাঁচাতে এই দম্পতি একটি উঁচু রাস্তায় ছুটে যান। সকালে দেখেন, বেঁচে থাকার কোনো সম্বল আর অবশিষ্ট নেই। বাধ্য হয়ে তাঁরা অন্যত্র আশ্রয়ের জন্য মানুষের দ্বারস্থ হন। শুধু রহিম শেখের পরিবার নয়, লবণাক্ত পানিতে পুরো কমিউনিটির সুপেয় পানির আধার নষ্ট হয়ে যায়। সবুজ ফসলের মাঠ ও মাছের ঘের তলিয়ে গিয়ে স্থানীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

উপকূলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ। জলোচ্ছ্বাসে বাঁধের ফাটল দিয়ে লোকালয়ে নোনা পানি ঢুকে কৃষি জমির উর্বরতা মারাত্মকভাবে নষ্ট করে এবং ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ পেশা বদলে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ছাড়া উপকূলের মানুষকে রক্ষার বিকল্প নেই। অন্যদিকে, সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে বাংলাদেশের অগ্রগতি থাকলেও মাঠ পর্যায়ে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব প্রকট। গবাদিপশু রাখার নিরাপদ স্থান না থাকায় অনেকেই যথাসময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চান না।

ত্রাণের জন্য অপেক্ষা না করে দুর্যোগের আগেই আগাম প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। দুর্বল ঘরবাড়ি মজবুত করা, কৃষকের ফসল দ্রুত ঘরে তোলা এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা প্রান্তিক পর্যায়ে বোধগম্য ভাষায় পৌঁছানো এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে স্থানীয় যুবসমাজ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। দুর্যোগের সময় তারাই প্রথম সাড়া দেন। তাই তাঁদের আধুনিক সরঞ্জাম ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও দক্ষ করতে হবে। জেলেদের জন্য দুর্যোগকালীন বিকল্প কর্মসংস্থান ও বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাষ্ট্রকে করতে হবে।

উপকূলের মানুষ প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার নির্মম শিকার। অথচ বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে তাদের তেমন কোনো দায় নেই। তারা করুণা নয়, চায় বেঁচে থাকার শক্ত ভিত্তি। নীতিনির্ধারকদের উচিত এই বিপন্ন মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং মানবিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মাধ্যমেই উপকূলকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। আসুন, দুর্যোগের আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আগামীর সম্ভাব্য বিপর্যয় রুখে দিই।

লেখক : পরিবেশবাদী লেখক, সংগঠক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন