বুধবার । ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন; মসজিদ কমিটির সভাপতি হবেন ইমাম

পলাশ রহমান

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ব্যাপক বিজয় অর্জন করেছে। দলের প্রধান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তার উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে দরিদ্র পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু, নদ-নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খাল খনন কর্মসূচি, এমপি-মন্ত্রীদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট বরাদ্দের বৈষম্যমূলক নীতি বাতিল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে কঠোর নির্দেশনা, ইসলামি স্কলারদের নেতৃত্বে জাকাত বোর্ড পুনর্গঠন, জ¦ালানির মূল্য বৃদ্ধি না করা, সুবিধাবঞ্চিত কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির অক্সিজেন প্রবাসীদের পরিবারের সুরক্ষার জন্য প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ। পাশাপাশি দেশের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম এবং অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এই ভাতা প্রদান নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি। তবে দেশের অভিজ্ঞ আলেম সমাজ সতর্ক করেছেন, যেন এই উদ্যোগ ইমাম-মুয়াজ্জিনদের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে। ইসলামি আন্দোলনের নেতা মুফতি সৈয়দ ফয়জুল করিম তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বলেছেন, ইমামদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হলে তাদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে। কোরান-সুন্নাহ পরিপন্থি কোনো কাজ না করলে তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা যাবে না। মসজিদ কমিটির স্বেচ্ছাচারিতায় ইমাম, মোয়াজ্জিনদের চাকরিচ্যুত করা যাবে না এবং নাগরিকদের চারিত্রিক সনদপত্র প্রদানের দায়িত্ব ইমামদের ওপর অর্পণ করলে এর বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন হবে।

ইমামদের সামাজিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা কেবল ধর্মীয় নেতা নন, বরং সমাজ সংস্কারক, নৈতিকতার পথপ্রদর্শক এবং জনসচেতনতা সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম। গ্রামীণ ও প্রান্তিক সমাজে তাদের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাই রাষ্ট্র যদি এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে সমাজে ন্যায়পরায়ণতা, শুদ্ধতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা আরও সহজ হবে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইমাম-মুয়াজ্জিনদের একটি সুসংগঠিত, স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর আওতায় আনা। বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে মসজিদ কমিটির স্বেচ্ছাচারিতা ইমামদের পেশাগত নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে। নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতি নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। এই সমস্যা সমাধানে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গঠন জরুরি।

এক্ষেত্রে ইসলামী ফাউন্ডেশনকে পুনর্গঠন করে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যেতে পারে, যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বাধীনভাবে পরিচালিত হবে। এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকতে হবে দেশের স্বীকৃত শীর্ষ আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদদের। তাদের তত্ত্বাবধানে দেশের সকল মসজিদ পরিচালিত হলে একদিকে যেমন সুশাসন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে ইমামদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো- প্রত্যেক মসজিদ কমিটির সভাপতি পদটি পদাধিকারবলে সংশ্লিষ্ট মসজিদের ইমামের হাতে ন্যস্ত করা। কারণ, মসজিদের ধর্মীয়, নৈতিক এবং সামাজিক দিকনির্দেশনার প্রধান ব্যক্তি হচ্ছেন ইমাম। তিনি যদি প্রশাসনিক নেতৃত্বেও থাকেন, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সহজে প্রতিফলিত হবে। কোনো বিশেষ কারণে যদি কোনো ইমাম এই দায়িত্ব গ্রহণে অপারগ হন, সেক্ষেত্রে একজন যোগ্য আলেমকে এই দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিনদের সাপ্তাহিক ছুটি নিশ্চিত করতে হবে। ইনসাফভিত্তিক বিচারের স্বার্থে, চাঞ্চল্যকর সকল মামলার বিচারকার্য চলাকালীন সময়ে আদালতে স্থানীয় একজন আলেম অথবা ইমামের উপস্থিতি এবং মতামত প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। এতে বিচারের ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার আরও বেশি নিশ্চিত হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইমামদের ওপর কোনো ধরনের অযাচিত সরকারি হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়। একটি স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর আওতায় থেকে তারা নিজেরাই তাদের পেশাগত মান, শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন। একই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে তারা দায়িত্বশীল মতামত প্রদান করবেন।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান এবং তাদের সামাজিক ভূমিকা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী এবং স্বায়ত্তশাসিত ইসলামী ফাউন্ডেশন গঠন অপরিহার্য। পাশাপাশি, মসজিদ পরিচালনায় ইমামদের নেতৃত্ব নিশ্চিত করা গেলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হবে। এই দুটি প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামাজিক ন্যায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে একটি সুসমন্বিত কাঠামো গড়ে উঠবে, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন বাংলাদেশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন