স্কুল নেই গ্রামে, শিক্ষকের বাড়িতে বসেই লেখাপড়া

নিজস্ব প্রতি‌বেদক, সাতক্ষীরা

তৃতীয় শ্রেণির পরই থেমে যায় আশাশুনি উপজেলার উপকূলীয় প্রতাপনগর ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের তীরের গড়ে উঠা রুইয়েরবিল গ্রামের শিশুদের পড়াশোনা।

রুইয়ারবিলে তৃতীয় শ্রেণির পর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো আর কোনো বিদ্যালয় নেই। কাজেই চতুর্থ শ্রেণিতে উঠলেই শিশুদের যেতে হয় প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের একটি স্কুলে। বর্ষার মৌসুমে কাদা-পানিতে ভরা দীর্ঘ সেই পথ আরও দুর্গম হয়ে ওঠে। ফলে ওই গ্রামের অনেক শিশুই তৃতীয় শ্রেণির পর পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের কাজে যুক্ত হচ্ছে।

স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ‘কপোতাক্ষ নদের তীর ঘেঁষা রুইয়েরবিল গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় স্থানীয় উদ্যোগে ২০২৪ সালে চালু করা হয় কোস্টাল এইড স্কুল। নার্সারি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাসে বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫৫ জন শিশু পড়াশোনা করছে। বাঁশের বেড়া ও গোলপাতার ছাউনির ছোট্ট একটি ঘরে চলছে স্কুলটির কার্যক্রম। স্থানীয় শিক্ষিত নারী রেক্সনা আফরোজের বাড়িতে বসে দুই শিক্ষক পাঠদান করেন। নেই স্থায়ী ভবন ও পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ। সরকারি সহায়তা না থাকায় বছরের শুরুতে নতুন বইও পায় না শিক্ষার্থীরা। পুরোনো ও ছেঁড়া বই সংগ্রহ করেই চলছে তাদের পড়াশোনা। কিন্তু তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পরই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাদের শিক্ষাজীবন।

কোস্টাল এইড স্কুলের শিক্ষার্থী ওবাইদুল্লাহ, জুনায়েদ, মেহরিমা সুলতানা ও মাসুরা জানায়, “বর্ষায় স্কুলে আসতে তাদের খুব কষ্ট হয়। কাদা-পানি পেরিয়ে অনেক সময় ভিজে যেতে হয়। তবু তারা স্কুলে আসে, কারণ পড়াশোনা করে বড় হতে চায়। রুইয়েরবিলের মরিয়ম, আরিফুল ও শাহিন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। এরপর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি তাদের। এখন কেউ মায়ের সঙ্গে, কেউ বাবার সঙ্গে অন্যের ঘেরে কিংবা নদীতে মাছ ধরার কাজে যুক্ত। তাদের ভাষ্য, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তে হলে দূরের স্কুলে যেতে হয়। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন সেখানে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছে।”

দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মাসুরা সুলতানার বাবা দিনমজুর মুজিবর রহমান গাজী বলেন, “মেয়েটা পড়াশোনায় আগ্রহী। আমি গরিব মানুষ। তারপরও চাই, ও অনেক দূর পড়াশোনা করুক। কিন্তু তৃতীয় শ্রেণির পর কোথায় ভর্তি করব, কীভাবে এত দূরে পাঠাব, সেটাই বুঝতে পারছি না।” এনিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

এদিকে কোস্টাল এইড স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি শেষ করে রুইয়ারবিল থেকে বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের কুড়িকাউনিয়া ফারুক চৌধুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। বৃষ্টির সময় কাঁচা বেড়িবাঁধের পথজুড়ে থাকে কাদা আর পানি। এই দুর্গম পথ পেরিয়েই প্রতিদিন স্কুলে যায় কপোতাক্ষ নদের তীরের রুইয়ারবিলের শিশুরা। কারও হাতে পুরোনো বই, কারও বইয়ের পাতা ছেঁড়া। তবু স্কুলে যাওয়ার আগ্রহে ভাটা নেই তাদের।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে রুইয়ারবিলের একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কয়েক বছর এলাকার শিশুদের পড়াশোনায় সংকট তৈরি হয়। ২০২৪ সালে কোস্টাল এইড অর্গানাইজেশনের উদ্যোগে আবার পাঠদান শুরু হয়। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই দুই শিক্ষক স্কুলটি চালিয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষক আফজাল হোসেন জানান, বর্তমানে প্রায় ৫৫ জন শিশু এখানে পড়াশোনা করছে। শিশুগুলো পড়াশোনা করতে চায়। তাদের আগ্রহ আছে। কিš তৃতীয় শ্রেণির পর বড় সমস্যা হয়। কাছাকাছি আর কোনো স্কুল নেই। দূরের স্কুলে যেতে হলে যে পথ পাড়ি দিতে হয়, বর্ষায় সেই পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।” এনজিও থেকে দুই শিক্ষককে সামান্য সম্মানী দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

কোস্টাল এইড স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মোঃ ইদ্রিস আলী বলেন, শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার জন্যই স্কুলটি করা হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের বই, খাতা, পোশাক ও মাঝে মধ্যে পুষ্টিকর বিস্কুট দেওয়া হয়। দুই শিক্ষককেও সামান্য সম্মানী দেওয়া হয়।

আশাশুনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল হাকিম বলেন, রুইয়ারবিলের কোস্টাল এইড স্কুলের বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর খোঁজ নেওয়া হয়েছে। দুর্গম যোগাযোগ ব্যব¯ার কারণে সরেজমিন গিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্র্রহ করে জেলা অফিসে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ রুহুল আমীন বলেন, “কপোতাক্ষ নদের পাড়ের এই দুর্গম জনপদে স্থায়ী সরকারি স্কুল না থাকায় শিশুদের ঝরে পড়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আশাশুনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে সরেজমিনে গিয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন