স্মরণীয়-বরণীয় শিক্ষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষাজীবন শেষে তারা বেছে নেন শিক্ষকতা নামক মহান পেশাকে। এ জীবনে অনেক প্রতিকূলতা পার হতে হয়। গড়ে তুলেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। সারা জীবনে স্বীকৃতি মানুষ গড়ার কারিগর। নিজে মোমবাতির মতো নিঃশেষ হয়ে অপরকে আলো দিয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষকের জীবনী আজকের দিনটিতে আলোকপাত করেছি।

বেগম মাজেদা আলী

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস ভাষা আন্দোলনে উত্তপ্ত পূর্ব পাকিস্তান নামক ভূ-খণ্ড। খুলনার ছাত্রীরা ৫২’র আগে রাজনৈতিক সভা, সমাবেশে যোগ দিত না। ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠলে খুলনায় এর ঢেউ এসে পৌঁছায়। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্রদের মিছিলে কয়েকজন শহীদ হওয়ার খবরে খুলনায় আন্দোলনরত প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। বেগম মাজেদা আলী তখন রেলওয়ে গার্লস স্কুলের ছাত্রী। সে সময়কার তরুণ ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ত হন নূরুল ইসলাম, গাজী শহীদুল্লাহ ও মালিক আতাহার উদ্দিন ছাত্রীদের নিয়ে একটি প্রতিবাদ মিছিল করার জন্য বেগম মাজেদা আলীকে প্রস্তাব দেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি তার নেতৃত্বে ছাত্রীদের মিছিল করোনেশন বালিকা বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে লেডিস পার্কে এসে শেষ হয়। ১৯৩৬ সালের ২৮ আগস্ট দৌলতপুরের কাশিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শেখ আব্দুল জব্বার তার পিতা ও মোসাঃ দৌলতুন্নেছা তার মা। তিনি সাবেক স্পীকার মরহুম শেখ রাজ্জাক আলীর সহধর্মিণী।

১৯৫১ সালে করোনেশন উচ্চবালিকা বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। একই সময়ে আরকে কলেজে ভর্তি হন। তিনি বামপন্থি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। তার আগে রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৩ সালে আইএ পাশ করার পর শেখ রাজ্জাক আলীর সাথে বিয়ে হয়। ১৯৬২ সালে মহিলা কলেজে অধ্যয়নের সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের মনোনয়নে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে স্নাতক পাশ করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাশ করেন। ১৯৬৯ সালে সুন্দরবন আদর্শ মহাবিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন, পরবর্তীতে ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল উপাধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৯৪ সালেই অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে স্বামীর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেন। তিনি ভারতের হাসনাবাদে মুক্তিযুদ্ধ শিবিরে কাজ করে। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রশাসনের নির্দেশে সাতক্ষীরা-বাগেরহাট- নওয়াপাড়া ও খুলনা অঞ্চলের বিরাঙ্গনাদের নিয়ে নারী পুনর্বাশন ও মহিলা সেবা সদন গঠন করেন। তিনি ছিলেন অবৈতনিক সম্পাদক।

১৯৬৯ সালে খুলনা মহিলা সমিতি গঠন, ১৯৬৫ সালে মহিলা সমবায় সমিতির সম্পাদিকা, ১৯৬৬ সালে ঢাকাস্থ জাতীয় সমাজ কল্যাণ পরিষদের সদস্য, ১৯৭০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতারের নিয়মিত কথক, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত খুলনা পৌরসভার কমিশনার, কেডিএর সদস্য কারাগার পরিদর্শিকা ছিলেন। ১৯৮০ থেকে ২০০২ পর্যন্ত বনফুলের সভানেত্রী, ১৯৮০ সালে খুলনা লেখিকা সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী, জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতির সভানেত্রী, ১৯৭৮ সালে খুলনা গার্লস গাইডের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে ভারতে কলকাতায় আফ্রো-এশিয়ান লায়নস কনফারেন্সে যোগদান করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি পবিত্র হজব্রত পালন করেন।

এছাড়া খুলনা রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, শিশু ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, উমেশ চন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি, রতন সেন পাবলিক লাইব্রেরি, খুলনা পাবলিক কলেজ, সবুরুন্নেছা মহিলা কলেজ, পাইওনিয়ার বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, টুটপাড়া মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রহিমা খাতুন প্রাইমারি স্কুলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সহযোগিতা করেন। আজাদ প্রোডাক্ট তাকে রত্নগর্ভা মা ও খুলনা জেলা প্রশাসন সাদা মনের মানুষ সম্মাননা প্রদান করেন। তিনি গর্বিত পাঁচ কন্যা সন্তানের জননী।

তার ৭৭তম জন্মবার্ষিকীতে শুভেচ্ছা জানিয়ে এক বাণীতে সাবেক সংসদ সদস্য ও অধুনালুপ্ত খুলনা পৌরসভার চেয়ারম্যান এ্যাড. মোঃ এনায়েত আলি উল্লেখ করেন, তার মত একজন বিদুষী রমণীর জন্য খুলনাবাসী নিশ্চয় গর্ববোধ করবে। খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. লুৎফুন নাহার বলেন, বেগম মাজেদা আলী খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের গর্ব। তার মতো একজন নারী উপহার দিতে পেরে এই কলেজ ধন্য।

অধ্যাপক খালেদ রশীদ

১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর খুলনা মুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধে খুলনায় নয় মাসে সংগ্রামী মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রামী বীর শহিদ অধ্যাপক খালেদ রশীদের নাম। খুলনার শহিদ হাদিস পার্কে স্বাধীনতার বিজয় পতাকা ১৭ ডিসেম্বর উত্তোলন করা হয়, এই পার্কের শহিদ মিনারের ভিত্তি স্থাপনকারী ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিটে তিনি ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। পাক-চীন মৈত্রী সমিতির খুলনা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)-এর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

খুলনা জেলা কমিটির সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য। খুলনার বাইতিপাড়া এলাকার তালতলা রোড থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘সেতু’ পত্রিকার সম্পাদক ও ‘সন্দীপন’ নামের মাসিক পত্রিকার যুগ্ম-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন। হত দরিদ্র পরিবারের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের উদ্দেশ্যে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে জনমত গঠনের লক্ষে এ পত্রিকা দু’টিতে প্রবন্ধ ও নিবন্ধ ছাপা হতো। ছাপা হত খালিশপুর ও রূপসা অঞ্চলের শ্রমিকদের দুর্দশার কাহিনি। শোষণমুক্ত সমাজ গঠনই ছিল পত্রিকা দু’টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও বর্গা চাষীদের অত্যাচার-নির্যাতনের কাহিনি প্রকাশ পেত ‘সেতু’ ও ‘সন্দীপন’ পত্রিকার পাতায়। তিনি ‘সন্দীপন’ পত্রিকার ‘আলকেমি’ ছন্দ নামে লিখতেন (ড. শেখ গাউস মিয়া রচিত আলোকিত মানুষের সন্ধানে)।

১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেঃ আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনের ঢেউ খুলনায় এসে পড়ে। বিশেষ করে ঢাকায় আসাদের মৃত্যুর পর খুলনায় এ আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। খুলনা শহরে শহিদ মিনার স্থাপনের দাবি জোরালো হয়। এ দাবি বাস্তবায়ন করতে অধ্যাপক খালেদ রশীদকে আহ্বায়ক করে একুশ উদ্যাপন কমিটি গঠন করা হয়। আগেই বলা হয়েছে স্থানীয় শহিদ হাদিস পার্কের শহিদ মিনার স্থাপনে তিনিই অন্যতম উদ্যোক্তা। ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে খালেদ রশিদের নেতৃত্বে খুলনার ডুমুরিয়ার শোভনা অঞ্চলে বিপ্লবী গেরিলা বাহিনী সশস্ত্র ট্রেনিং শুরু করে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ঐতিহ্যবাহী শোভনা অঞ্চল। সেখানে বিচরণ কৃষক মজুরের সংগ্রামী নেতা মাওলানা আহমদ আলীর। ডুমুরিয়ার শোভনা অঞ্চলকে অধ্যাপক খালেদ রশিদ আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিলেন।

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল রেডিও পাকিস্তান খুলনা কেন্দ্র দখলের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যর্থ অভিযান এবং চুকনগরের পাকবাহিনীর গণহত্যায় ডুমুরিয়ার মানুষ ফুঁসে উঠে। খালেদ রশিদের নেতৃত্বাধীন গেরিলা বাহিনী সদা প্রস্তুত। তখনকার দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুরূহ। পাক হানাদার বাহিনীর দুই/তিনটা গানবোট ডুমুরিয়ার নদীতে টহল দিত। পাক বাহিনী গেরিলাদের হাতে ২/১ বার পরাজিত হওয়ার পর শোভনা এলাকায় গেরিলাদের ঘাঁটি ও অবস্থান জেনে নেয়। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের কথা। পাকিস্তান বাহিনী দুটি গানবোট নিয়ে শোভনা অঞ্চলের গেরিলাদের ওপর আক্রমণ চালায়। গানবোট দু’টিতে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও প্রচুর গোলাবারুদ ছিল। অধ্যাপক খালেদ রশিদের নেতৃত্বে গেরিলা বাহিনী মরণপন রাতভর যুদ্ধ করে। পাক বাহিনীর একটি গুলিতে অধ্যাপক খালেদ রশিদের মৃত্যু হয়। বামপন্থী রাজনীতিক হায়দার আকবার খান রনো লিখেছেন, আব্দুল হকের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট অংশটির যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর। তবুও এই অংশটি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসী যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, বিশেষত বৃহত্তর যশোর, খুলনা ও কুষ্টিয়া জেলায়।

খুলনা জেলায় আব্দুল হকের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ যে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল মজিদ, আব্দুর রউফ, কামরুজ্জামান লিচু, হাফিজুর রহমান, আজিজুর রহমান ও অধ্যাপক খালেদ রশিদ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী যুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তার লাশ পাওয়া যায়নি। ১৯৩৪ সালে সিরাজগঞ্জে তার জন্ম হয়। তার পিতার নাম বাহাদুর সরদার, পেশায় ব্যবসায়ী। খালেদ রশিদ সিরাজগঞ্জ থেকে এসএসসি পাশ, পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে বিএসসি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে এমএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে খুলনা মহিলা কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এই কলেজটি সরকারি হলে পদত্যাগ করে সুন্দরবন আদর্শ মহাবিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এই মহাবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নে তিনি উপাধ্যক্ষ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সন্দীপনের মাধ্যমে সারা দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের তিনি ছিলেন প্রাণ পুরুষ।

আনোয়ারা বেগম রানু

চুয়াত্তর বছর আগে খুলনা শহরের ছাত্রীরা রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল না। ছাত্র সংগঠনেও মেয়েরা সম্পৃক্ত ছিল না। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে ছাত্র নিহত হওয়ার প্রতিবাদে শহরের আর কে গার্লস কলেজের ছাত্রীরা মিছিল বের করে। আরকে গার্লস কলেজের নিজস্ব ভবন ছিল না। করোনেশন গার্লস লেই ক্লাস হত। এই মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আনোয়ারা বেগম রানু অন্যতম। কলেজের শিক্ষকরা এই মিছিলে সহযোগিতা করে। করোনেশন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা তসলিমা আবেদ মিছিলকারীদের বাধা দেন।

তিনি ভারতের মেদিনীপুরে ১৯৩১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ আব্দুল মজিদ তার মায়ের নাম নূর নীহার খাতুন। পৈতৃক ভিটে খুলনা শহরের খালিশপুর এলাকায়। ভারতে মেদেনীপুর জেলার চাম্বলি থানার পাঠশালায় ১৯৩৫ সালে শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৫০ সালে খুলনার আর কে কলেজ থেকে আইএ, একই কলেজ থেকে বিএ ও ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাশ করেন। ১৯৫০ সালে ছাত্রী থাকাকালীন সময়ে খুলনা রেলওয়ে বালিকা বিদ্যালয়ে এবং ১৯৫৩ সালে করোনেশন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।

লেখাপড়া শেষে ১৯৫৫ সালে খুলনা মহিলা মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপিকা হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬২ সালের মার্চে একই কলেজের সহ অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সনে মহিলা মহাবিদ্যালয় বয়রায় স্থানান্তর এবং ৬৮ সালে সরকারীকরণ হয়। ১৯৬৮-৭২ পর্যন্ত খুলনা সরকারি মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯৬০ সালের ১০ নভেম্বর উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এ বি নূরউদ্দীন আহমেদের সাথে তার বিয়ে হয়। ১৯৭৫ সনে ঢাকায় সহকারী জনশিক্ষা পরিচালক, ১৯৮১ সালে কুমিল্লা সহকারী মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ ও ১৯৮৩ সালে ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট ইন্তেকাল করেন।

অধ্যক্ষ মোঃ রুহুল আমিন

খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষা প্রসারে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। কর্মজীবনের বেশির সময় পার করেছেন নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষার দ্যুতি ছড়াতে। দক্ষিণাঞ্চলের অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের জন্য তার দরদ ও আন্তরিকতা অনস্বীকার্য। ১৯৬৩ সালে পাইকগাছা উপজেলার বেতবুনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আরজান সরদার মায়ের নাম কাঞ্চন বিবি। ১৯৪৮ খুলনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৫১ সালে দৌলতপুর বিএল কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন এবং ১৯৫৩ সালে উক্ত কলেজ থেকে বিএ পাস করেন।

অতঃপর ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত বিএল কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত আজম খান কমার্স কলেজের অধ্যাপনা ও অধ্যক্ষ পদে দায়িত্বরত ছিলেন। ১৯৬৫ সালে খুলনার প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী এসএমএ মজিদ-এর ঐকান্তিক উৎসাহ ও প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় খুলনা সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং সমগ্র কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মোহাম্মদ রুহুল আমিনকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দান করা হয়।

প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে কয়েকজন শিক্ষক, কিছু সমাজসেবকের প্রবল আগ্রহ ও আন্তরিক চেষ্টা ছাড়া সহায় সম্বল বিশেষ কিছু কলেজটির ছিল না। সেই অবস্থা থেকে কলেজটিকে একটি সম্মানজনক অবস্থায় পৌঁছানোর সব ধরনের প্রচেষ্টা মূলত অধ্যক্ষ রুহুল আমিনের। এমনকি মজিদ-এর মৃত্যুর পর অধ্যক্ষ রুহুল আমিন নিজ উদ্যোগে তৎকালীন জেলা প্রশাসক ওয়ারেশ আলী চৌধুরীর সহযোগিতায় শিক্ষানুরাগী মজিদ-এর স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য তৎকালীন সিটি কলেজের নাম ‘মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজ’ হিসেবে নামকরণ করেন। একজন শিক্ষানুরাগী ও কর্মবীর ছিলেন। তার কর্মজীবনে শিক্ষার প্রসারে বিশেষ করে খুলনার দক্ষিণ অঞ্চলের অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের জন্য দরদ ও আন্তরিকতা অনস্বীকার্য। শুধু সিটি কলেজ নয় জীবনের বাঁকে বাঁকে বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহে যখন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যে তার ডাক পড়েছে অথবা তিনি নিজেই উদ্যোগী হয়ে ছুটে গেছেন এমন ঘটনাও বিরল নয়। পরবর্তীতে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু কলেজে’ অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৬৭ সালে সিটি কলেজে কর্মরত অবস্থায় তিনি তার নিজ উপজেলা পাইকগাছায় ‘পাইকগাছা কলেজ’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৮৬ সালে বিশিষ্ট সমাজসেবী ও গড়ুইখালি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহর আলী গাজীর অনুরোধে তার মুক্তিযুদ্ধে শহীদ দুই সন্তানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ‘শহীদ আইয়ুব-মুসা কলেজের’ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর পাঁচ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে পরবর্তীতে কলেজটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এছাড়াও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তিনি ভূমিকা রেখেছেন। এর মধ্যে শাহপুর মধুগ্রাম কলেজ, বাজুয়ার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ, কপিলমুনি কলেজ আজ সুপ্রতিষ্ঠিত।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন