কোথায় সেই অত্যাচারী নীলকর গোষ্ঠী?

নূরুল হাই মোহাম্মদ আনাছ

১৭ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে গিয়েছিলাম খুলনা বড়বাজার এলাকার রেলওয়ে নিক্সন মার্কেটের পিছনে পরিত্যক্ত চার্লি নীলকুঠি দেখতে। প্রায় ২২৫ বছরের প্রাচীন এই কুঠি দেখে মনে হয়েছে ধ্বংসস্তূপ দেখার জন্য এসেছি। আমার কৌতূহল হলো- ১৯২২ সালে সরকার কর্তৃক প্রকাশিত সিএস রেকর্ডে চার্লি কুঠি বাড়ির অস্তিত্ব অনুসন্ধান করা। অবাক হয়ে দেখলাম, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের রেকর্ডে চার্লি নীলকুঠির অস্তিত্ব নেই। সিএস রেকর্ড জায়গাটি East জায়গাটি East Bengal Railway এর অনুকূলে অধিগ্রহণকৃত।

ইতিহাস পর্যবেক্ষণের জন্য ‘বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর খুলনা (প্রাকৃতিক ও আর্থ-সামাজিক ইতিহাস) ১৯৯৬ খ্রি.’ সংখ্যাটি পড়তে থাকি। ৪৮ পৃষ্ঠায় যে বর্ণনা পেলাম তার কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

“নীলকরদের দৌরাত্ম্য বস্তুত ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই শুরু হয়। খুলনার ভৈরব নদীর পাড়ে অবস্থিত তালিমপুরে উইলিয়াম রেনী নামে একজন ইংরেজ নীল ব্যবসায়ী বসবাস করতেন। তাঁর অত্যাচারের বিরুদ্ধে জমিদার শিবনাথ ঘোষের নেতৃত্বে প্রজাদের অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠে। দু’পক্ষের মধ্যে দাঙ্গা হাঙ্গামা সব সময় লেগেই থাকে। অকারণ রক্তপাত বন্ধ করার জন্য সরকার সেনের বাজারের পূর্ব প্রান্তে নয়াবাদ এলাকায় একটা থানা স্থাপন করেন। এ থানা নয়াবাদ থানা নামে পরিচিত ছিল। এ থানা স্থাপন করার পরও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় সরকার ১৮৪২ সনে নয়াবাদ থানাকে মহকুমায় উন্নীত করে। খুলনা জেলার নীল বিদ্রোহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়ক রহিমুল্লাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। খুলনার মোরেলগঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ইংরেজ নীলকর মোরেল ও তার অনুচরদের অত্যাচার, উৎপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে রহিমুল্লাহর নেতৃত্বে বারুইখালীর গ্রামবাসীরা রুখে দাঁড়ায় এবং নীলকরদের লাঠিয়াল বাহিনীর আকস্মিক আক্রমণ প্রতিহত করতে রহিমুল্লাহ ও আরও অনেকে মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীকালে বিচার প্রহসনে কুখ্যাত নীলকররা মামলা থেকে বেকসুর খালাস পায়”।

নীলকরদের বিরুদ্ধে শুধু সশস্ত্র সংগ্রাম নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনেও আন্দোলন গড়ে উঠে। দীনবন্ধু মিত্র লিখেন বিখ্যাত প্রতিবাদী নাটক ‘নীলদর্পণ’। ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি ইংরেজি অনুবাদ করতে সহায়তা করেন কৃষকদের দুর্দশার প্রতি সহানুভূতিশীল রেভারেন্ড জেমস লং। এই অপরাধে ১৮৬১ সালে কলকাতার সুপ্রিম কোর্টে জেমস লং এর বিচার হয়। তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০০০ টাকা জরিমানা এবং এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়াও দেশীয় পত্রিকাগুলো নীলকরদের শোষণ অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরে নীলকরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন জাগিয়ে রাখেন।

১৮৫৯-১৮৬০ সালে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। কৃষকগণ সম্মিলিতভাবে ঘোষণা করে তারা আর নীল চাষ করবে না। ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে ১৮৬০ সালে “নীল কমিশন” গঠন করে। জোর করে নীল চাষ না করানোর নীতি জারি করা হয়। আন্দোলনের মুখে অল্প কিছু দিনের মধ্যে নীলকর গোষ্ঠী এ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়।

পরিশেষে, নীলকরদের অত্যাচারের ইতিহাস আমাদেরকে শিখায়-অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন কখনো স্থায়ী হয় না। সময়ের স্রোতে এবং মজলুমের ক্রন্দন ও দ্রোহের আগুনে জালিম নিঃশেষ হবেই। জালিমের অধঃপতন অবধারিত। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- “History Repeats Itself”

তথ্য সূত্র :
১। বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর খুলনা (প্রাকৃতিক ও আর্থ-সামাজিক ইতিহাস) ১৯৯৬ খ্রি.
২। বৃহত্তর খুলনার ইতিহাস , মোহাম্মদ রেজওয়ানউল হক

লেখক : অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, খুলনা।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন