পেশায় শিক্ষক, আবার স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে মানুষের জীবন বাঁচানো তার ব্রত। কিন্তু অন্যের সেবা আর সামাজিক কাজে ব্যস্ত এই মানুষটিই হঠাৎ টের পেলেন, তার অজান্তে শরীরে থাবা বসিয়েছে এক নীরব ঘাতক। খুলনার রায়ের মহল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং ‘খুলনা ব্লাড ব্যাংক’-এর যুগ্ম সম্পাদক কমলেশ চন্দ্র বাছাড়ের গল্পটি কেবল নিজের সুস্থ হওয়ার লড়াই নয়, বরং ফ্যাটি লিভার নিয়ে সচেতনতার এক জ্যান্ত উদাহরণ।
মাত্র মাস পাঁচেক আগের ঘটনা। কমলেশ চন্দ্র হঠাৎ তীব্র হজমজনিত সমস্যায় পড়েন। কিছু খেলেই পেট ফুলে দম আটকে আসার উপক্রম হতো, নিয়মিত পেট পরিষ্কার হতো না। ভেবেছিলেন সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, কিন্তু ওষুধেও মিলছিল না উপশম। অবশেষে শরণাপন্ন হলেন গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি (লিভার ও পরিপাকতন্ত্র) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আল্ট্রাসনোগ্রামে ধরা পড়লো তিনি ‘ফ্যাটি লিভার’-এ আক্রান্ত। আর লিভারে চর্বির পরিমাণ পৌঁছে গেছে মারাত্মক ‘গ্রেড-৩’ পর্যায়ে!
স্মৃতিচারণ করে কমলেশ চন্দ্র বাছাড় বলেন, পাঁচ মাস আগে যাই খেতাম, তাতেই গ্যাস হতো। বাথরুম ক্লিয়ার হতো না। চিকিৎসক আল্ট্রাসনো করাতে দিলে দেখি লিভারে চর্বির পরিমাণ গ্রেড-৩ এ চলে গেছে। খবরটা শুনে ভয় পেয়েছিলাম।
তিনি জানান, ভয় না পেয়ে চিকিৎসকের নির্দেশমতো জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনেন। ওষুধ সেবনের পাশাপাশি প্রতিদিন নিয়ম করে শরীরচর্চা ও হাঁটা শুরু করেন। খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেন ক্ষতিকর উপাদান। ফল মেলে হাতেনাতে। মাত্র এক মাসের কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় তার লিভারের চর্বি কমে গ্রেড-২ এ নেমে আসে। পরবর্তীতে চিকিৎসকের পরামর্শে এবং আরও নিশ্চিত হতে তিনি ভারতের চেন্নাই যান। সেখানে ফাইব্রোস্ক্যান ও আল্ট্রাসনোসহ নানা উন্নত পরীক্ষায় দেখা যায়, তার ফ্যাটি লিভার কমে গ্রেড-১ এ চলে এসেছে! লিভারের ব্যাপক উন্নতি দেখে চিকিৎসকরা তাকে আর নতুন কোনো ওষুধ দেননি, কেবল সঠিক নিয়ম মেনে চলতেই পরামর্শ দেন।
বর্তমানে পুরোপুরি সুস্থতার পথে থাকা শিক্ষক কমলেশ চন্দ্র বাছাড় জানান, তার খাদ্যতালিকায় আনা আমূল পরিবর্তনের কথা। দৈনিক মাত্র ৫ গ্রাম লবণ এবং সর্বোচ্চ ১৫ গ্রাম তেল খাওয়ার নিয়ম মেনে চলছেন তিনি। বাদ দিয়েছেন লাল মাংস (গরু-খাসির মাংস), অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার ও কোমল পানীয়। নিয়ম মেনে খাওয়া-দাওয়া করা এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় হাঁটা ও শরীরচর্চা করা। এসব নিয়ম মানার কারণে তিনি এখন সুস্থ।
নিজের এই পথচলা থেকে শিক্ষা নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে শিক্ষক কমলেশ চন্দ্র বলেন, লিভারের সমস্যা প্রাথমিক অবস্থায় সহজে বোঝা যায় না। তবে ঘন ঘন গ্যাস হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, খাবারে অরুচি বা ঠিকমতো হজম না হলে অবহেলা না করে লিভারের পরীক্ষা করানো উচিত। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়ম মেনে চললে ফ্যাটি লিভার জয় করা সম্ভব।
নগরীর রেলিগেট এলাকার বাসিন্দা একরামুল হোসেন বলেন, ক্ষুধামন্দা ও পেট ভার হয়ে যেতো। ভেবেছিলাম গ্যাসের সমস্যা। পরবর্তীতে চিকিৎসকের শরনাপন্ন হলে পরীক্ষা-নীরিক্ষায় ফ্যাটি লিভার গ্রেড-১ ধরা পড়ে। তবে কখনোই বুঝতে পারিনি ফ্যাটি লিভার হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শরীর চর্চা ও খাদ্যাভাস পরিবর্তন করেছি। এখন কিছুটা সুস্থ অনুভব করছি।
খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. হিমেল ঘোষ বলেন, ফ্যাটি লিভার, হেপাটাইসিস বি ও সি এগুলোর খুব দ্রুত লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ধীরগতি সম্পন্ন। প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ তৈরি করে না বলে একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। ফ্যাটি লিভার একটি মহামারী আকার ধারণ করছে। আমাদের লাইফস্ট্যাইলের খুবই খারাপ অবস্থা। শরীর চর্চা ও খাদ্যাভাস ঠিক নেই। তৈলাক্ত খাবার এবং তেলে ভাজাপোড়া খাবার বেশি খাওয়ার কারণে এটি বাড়ছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেপাটোলজি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. মো. কুতুব উদ্দিন মল্লিক বলেন, ফ্যাটি লিভার সারা দেশে একইভাবে বাড়ছে। ১০ বছরে ২৫ শতাংশ মানুষের ফ্যাটি লিভার ছিল। অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে ২৫ জনে। কিন্তু বর্তমানে তা বেড়ে ৩৩ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। যথেষ্ট বেশি হারে আক্রান্ত হচ্ছে। আগে মানুষ সচেতন ছিল কম, বর্তমানে সচেতন হয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এর সংখ্যা বাড়ছে। ফ্যাটি লিভার বাড়ার মূল কারণ হচ্ছে ইনএকটিভিটি। খাব, ঘুমাবো আর কোনো কায়িক পরিশ্রম করতে চাই না। যার কারণে ফ্যাটি লিভারের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রথমত, যারা বসে থেকে কাজ করি তাদের প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শারীর চর্চা করা উচিত। একটু জোরে জোরে হাঁটতে হবে। এটা কিন্তু প্রতিদিন করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, খাদ্যাভাস। মানুষের যে পরিমাণ খেতে হবে তার চাইতে বেশি কার্বহাইডেট খাবার খেয়ে ফেলছে। ফাস্টফুড, কোমলপানীয় ও জাঙ্কফুড-এসব খাবারের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেশি।
ডা. মো. কুতুব উদ্দিন মল্লিক বলেন, তরুণ বয়সীদের ফ্যাটি লিভার আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধদের আক্রান্তের সংখ্যা কম। পুরাতন জেনারেশনের ভেতরে ফ্যাটি লিভারের সংখ্যা কম। তারা খুবই পরিশ্রমি এবং হার্ডওয়ার্ক করতেন। যারা কায়িক পরিশ্রম করেন তাদের ফ্যাটি লিভার হয় না। রিকশাচালকরা ফ্যাটি লিভার নিয়ে আসছে-এমন আগে কখনো দেখিনি। কিন্তু এখন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের কায়িক পরিশ্রম হচ্ছে না। ফলে ফ্যাটিলিভারে আক্রান্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, প্রথম দিকে ফ্যাটি লিভারের কোনো লক্ষণই থাকে না। মানুষ টেরই পায় না। লিভারের ফ্যাট সাধারণত একটু বেশি জমে গেলে অল্পতে ক্লান্তিবোধ হয়। কাজের ফাঁকে বোঝাও যায় না। লিভার বড় হলে পেটের ডান দিকে ভারী অনুভব হওয়া বা ব্যথাও হতে পারে। এগুলো প্রাথমিক সমস্যা। পরবর্তী জটিলতা হচ্ছে, ফ্যাটি লিভারের কারণে আস্তে আস্তে হ্যাপাটাইটিস হতে পারে। হেপাটাইটিসের কারণে লিভারের প্রদাহ হয়। এরপর আস্তে আস্তে লিভার শুকিয়ে লিভার সিরোসিস হতে পারে। লিভার সিরোসিস থেকে লিভার ক্যান্সার হতে পারে।
তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, ২০৩০ সালের পর বিশ্বে যত লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট (প্রতিস্থাপন) হবে, তার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে এই ফ্যাটি লিভার। ফ্যাটি লিভার মহামারি আকারে আমাদের সমাজে খুব দ্রুত চলে আসছে। যেমন এখন আছে, সেটা দিনে দিনে আরও বেশি বাড়ছে।
খুমেক হাসপাতালে রোগীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ডা. মো. কুতুব উদ্দিন মল্লিক বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৭ সালে লিভার বিভাগের কার্যক্রম শুরু করেছি। আইটডোর সুবিধা রেখেছি। সপ্তাহে তিন দিন আউটডোরে রোগীদের সেবা দেওয়া হয়। আর আন্তঃবিভাগে ১২টি ওয়ার্ড রয়েছে। এখানে ফ্যাটি লিভার, হেপাটাইসিসসহ অন্যান্য রোগীরাও আসেন। সারা দেশে ফ্যাটি লিভার রোগীদের যেসব সুবিধা দেওয়া হয় খুলনাতেও একই সুযোগ-সুবিধা বা চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। খুলনায় প্রতি রবিবার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার এই তিন দিন রোগী দেখা হয়। দৈনিক অন্তত ৪৫-৫০ জন রেফার্ড রোগীকে সেবা প্রদান করা হয়। এসব রোগীদের দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসার দরকার হয়। ৫২ সপ্তাহের চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন হয়।
তিনি বলেন, ফ্যাটি লিভার ম্যাটাবলিক ডিজিজ। সাধারণত ডায়াবেটিস, হাইপার টেনশন, রক্তে চর্বি অথবা স্থুলতার সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক অনেক বেশি। এসব রোগ যাদের আছে, তাদেরই মূলত ফ্যাটি লিভার থাকে। প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে তিনি বলেন, লাইফস্ট্যাইল সঠিক রাখতে হবে। নিয়মিত শরীর চর্চা করতে হবে। খাওয়া-দাওয়া ঠিক রাখতে হবে। লো-কার্ব হাইডেড খাবার খেতে হবে। হাই ফাইবারযুক্ত খাবার খেতে হবে। যেসব খাবারে ফ্যাটি লিভারের সম্ভাবনা রয়েছে জাঙ্কফুড, ফাস্টফুড, স্ট্রিটফুড এবং কোমলপানীয় এড়িয়ে চলতে হবে। এক কথায় ডায়াবেটিকস রোগীরা যেসব খাবার খায় সেসব খাবার যদি গ্রহণ করতে পারি তাহলে কিন্তু ফ্যাটি লিভার থেকে ভালো থাকা সম্ভব। কিছু কিছু ওষুধ আছে সেগুলো সেবনে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। ডায়েট এবং এক্সারসাইজের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা করা সম্ভব। কিছু কিছু রোগীর ওষুধ লাগে। তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করতে পারে।
খুলনা গেজেট/এনএম

