আমার স্বপ্নের বেলাভূমিতে নতুন সূর্যোদয় হলো। অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম, লোকাল টায়ার অফ গভর্নমেন্টের একটা পরিবর্তন হওয়া উচিত। এভাবে চলতে পারে না। একটি স্বাধীন দেশের দেখতে দেখতে ৫৫ বছর কেটে যাচ্ছে। অবস্থা চলছে সেই মানদাত্তা আমলের পুরোনো পদ্ধতিতে।
কথাগুলো একটু খুলে বলি। এতদিন চলে আসা একটি অসম বিষয়ের উপর মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছে। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতক অর্থাৎ ডিগ্রি পাস হতে হবে। এ ধরনের নিয়ম নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
দেশের হাইকোর্ট এই বলে রুল জারি করেই বক্তব্য শেষ করেননি। বরং একই সঙ্গে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণে ব্যর্থ ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২৬ ধারা সংবিধানের সঙ্গে কেন সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট।
গত সুপ্রিম কোর্টের দুইজন আইনজীবীর করা রিট প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চে শত : প্রণোদিত হয়ে এই রুল জারি করেন। রুলে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯ এর ধারা ২৬ এর অধীনে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা কমপক্ষে স্নাতক বা ডিগ্রি পাস নিশ্চিত করার জন্য কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা’ স্পষ্টভাবে জানতে চেয়েছেন।
এ ব্যাপারে, এলজিআরডি সচিব, আইন সচিব এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কেন স্নাতক ন্যূনতম হবে না, এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টে দুই আইনজীবী যথাক্রমে কাজী ফেরদাউসুল হাসান এবং মোহাম্মদ তানভীর আহমেদ খান।
আইনজীবী কাজী ফেরদৌসুল হাসান বলেন, “লোকাল টায়ার অফ গভর্নমেন্ট-এ একজন চেয়ারম্যানকে নানা ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারক হিসেবে গ্রাম আদালত পরিচালনার ক্ষমতা। একজন চেয়ারম্যান সেখানে তিন লাখ টাকা মূল্যের মামলা পরিচালনা করতে পারেন! অথচ এই ক্ষমতা যে ম্যাজিস্ট্রেটের রয়েছে, তাকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (সংক্ষেপে বিসিএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। অপরদিকে এখানে একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না! তাই ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯ এ চেয়ারম্যান-এর যোগ্যতা সংক্রান্ত ২৬ ধারা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। আমরা চেয়ারম্যানের যোগ্যতা ন্যূনতম স্নাতক পর্যন্ত চেয়েছি।”
হাইকোর্টের রুলের আলোকে কিছু কথা আমাদেরও বলা দরকার। একজন চেয়ারম্যান স্থানীয় সরকার গভর্নমেন্ট ব্যবস্থায় যেকোনো নাগরিকের মানপত্র, সনদপত্র, ওয়ারিশ কায়েম সনদপত্রসহ নানা বিষয়ক পরিচয়ের কর্তা। সেখানে সেই ব্যক্তিটি যদি ‘না পাস’ হন, তাহলে কীভাবে চলে? দেশের সচেতন বিবেকবান মানুষ– এই প্রশ্নটি এখন মুখে মুখে বলছেন। সত্যি কথা বলতে কি, একজন চেয়ারম্যান গ্রামীণ জীবনে একটা ইউনিয়নে কমপক্ষে দেড় দু’লাখ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন, মোট ৯টি ওয়ার্ড মিলে। তার সাথে থাকেন ৯ জন-জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত মেম্বার। আরও তিনজন মহিলা মেম্বার। মোট ১২ জন মেম্বারের সমন্বয়ে একজন চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার সার্বিক উন্নয়ন, নানা প্রকার প্রকল্প গ্রহণ, জন্ম মৃত্যুর হিসাব নিবন্ধন, জেলা, বিভাগীয় প্রশাসনিক সহ সরকারের উচ্চ মহলে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ এবং ২৯ প্রকারের সুযোগ-সুবিধাভোগী ব্যক্তিটির অবশ্যই শিক্ষাগত যোগ্যতার মান স্নাতক পর্যন্ত ন্যূনতম হওয়া একান্তভাবে জরুরি।
এদিকে নির্বাচন কমিশন থেকে সাজো সাজো রব শোনা যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, চলতি জুলাই বা আগস্টেই প্রথম ধাপের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। আগামী অক্টোবর, ২০২৬ থেকে সারাদেশে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সাংবাদিক সম্মেলনে এমনই একটি বক্তব্য দিয়েছেন দেশবাসীর উদ্দেশ্যে।
গত ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আর মাত্র দুই মাস পর আগামী অক্টোবর ২০২৬ থেকে সারাদেশে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে বর্তমান (ইসি) নির্বাচন কমিশন। এর অংশ হিসেবে চলতি জুলাই কিংবা আগস্ট-এর মধ্যেই প্রথম ধাপের নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। গত বুধবার ২২শে জুলাই বিকেলে সাংবাদিকদের কাছে এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, “যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি নেই, অর্থাৎ কোনো চেয়ারম্যান নেই এবং যেগুলোর আইনি মেয়াদ ইতোমধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, সেগুলোর প্রথম ধাপে নির্বাচনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।”
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের মতে, স্থানীয় পর্যায়ের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সুবিধাজনক স্থানে প্রয়োজন বোধে উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন একই সঙ্গে আয়োজন করা হতে পারে। তবে প্রবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের সুবিধা আপাত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে থাকছে না।
এছাড়া প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার মানদণ্ড সিদ্ধান্ত এখনো না হলেও আদালতের নির্দেশনা ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। নির্বাচন কমিশনার আনারুল ইসলাম সরকার অবশ্য একটি বিষয়ে জোর দিয়ে বলেছেন, প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করলে নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিদ্যমান আইনেই অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করা শতভাগ সম্ভব হবে। তাঁর মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্পষ্টতা দূর করতেই কিছু কিছু পর্যবেক্ষক সহ বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে। সংশোধিত আইন কার্যকর হলে নতুবা ওই আইনেই সময়মতো ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
এই প্রেক্ষাপটে আমরা মনে করি, স্থানীয় সরকারের প্রথম টায়ার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্নটিকে অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ ব্রিটিশ আমলে প্রণীত নিয়ম-কানুন সংশোধন না হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত চেয়ারম্যান ম্যাজিস্ট্রেটের মতো ক্ষমতার অধিকারী হয়েও ‘এলেবেলে’ বা ‘না পাস’ ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়া অত্যন্ত দৃষ্টিকটু।
আমরা সঠিক সময়ে হাইকোর্টের দেওয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীর ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতক উত্তীর্ণ রিট জারীকে অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী বলে মনে করি। আশা করি এ ব্যাপারে, স্থানীয় সরকার, আইন ও বিচার বিভাগ সচিব এবং নির্বাচন কমিশন একমত হয়ে বৃহত্তর জনস্বার্থে বাধ্যতামূলকভাবে দুই হাজার নয় সালের নির্বাচনী বিধিমালা ২৬ ধারা বাস্তবায়নে আন্তরিক হবেন এবং সার্বিক জনকল্যাণে সময় উপযোগী পদক্ষেপ নেবেন।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

