ডুমুরিয়া উপজেলায় জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি টাকা ব্যয়ে খাল খনন শুরু হলেও এর কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল। তাদের অভিযোগ, যেসব খাল পুনঃখনন করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই আগে থেকেই সচল ও পর্যাপ্ত গভীর ছিল। অথচ জলাবদ্ধতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত নদীগুলো বছরের পর বছর পলি জমে ভরাট হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস-তেলিগাতী ও কৃষ্ণনগর-নিমতলা এলাকায় প্রায় সাড়ে ৮ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরই মধ্যে ঠিকাদারকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, খাল খননের পরিবর্তে শৈলমারীসহ এলাকার প্রধান নদীগুলো খনন করা হলে জলাবদ্ধতা নিরসনে আরও কার্যকর ফল পাওয়া যেত।
দেড়ুলী গ্রামের কৃষক তারক মণ্ডল বলেন, শুরু থেকেই অনেক মানুষ এ প্রকল্পের বিরোধিতা করেছিলেন। খালে কোটি টাকা ব্যয়ের চেয়ে এ টাকা দিয়ে নদী খনন করলে এলাকার মানুষ বেশি উপকৃত হতো।
খয়রামারি বিল সংলগ্ন কালিরঘাট খাল খনন নিয়েও দেখা দিয়েছে বিতর্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, ৩১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয়ে খালটি এমন সময় খনন করা হয়েছে, যখন সেখানে পর্যাপ্ত পানি ছিল এবং কয়েক বছর আগেই এর একটি অংশ পুনঃখনন করা হয়েছিল।
পাহাড়পুর গ্রামের কৃষক দিনেশ মিস্ত্রি বলেন, “তিন বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড গেটসংলগ্ন প্রায় এক কিলোমিটার অংশ খনন করেছিল। এরপরও নতুন করে খাল খননের প্রয়োজনীয়তা ছিল না।”
টিয়াবুনিয়া মৌজায় ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দে ২ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। অথচ এ খালের পানি যে পথে নিষ্কাশিত হবে সেই সালতা নদী ভরাট হয়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতা আব্দুর রব আকুঞ্জি বলেন, “মূল নদী পুনঃখনন না করে অপেক্ষাকৃত গভীর খাল খননে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এতে বাস্তবে কতটা সুফল মিলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”
তবে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের দাবি, “খাল পুনঃখননের ফলে এলাকার পানি নিষ্কাশন ও নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে।”
রঘুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনোজিত বালা বলেন, “কৃষ্ণনগর-নিমতলা খাল পুনঃখননের ফলে অভয়নগরের রাজঘাট, বিল ডাকাতিয়া ও বারান্দার বিলসহ বিস্তীর্ণ এলাকার পানি নিষ্কাশন সহজ হবে। কৃষকরাও মাঠ থেকে সবজি, মাছ ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে সুবিধা পাচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “শৈলমারী নদী পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিকল্প হিসেবে এখনও কালিঘাট রেগুলেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ভারী বৃষ্টিপাত হলে আবারও প্লাবনের ঝুঁকি রয়েছে।”
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মোঃ আবুল বাশার জানিয়েছেন, “৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে শৈলমারী নদী পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।” এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিল ডাকাতিয়াসহ আশপাশের এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, খাল বা নদী খননের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তব প্রয়োজন, পানি প্রবাহের ধরন, কৃষি উৎপাদন এবং জলাবদ্ধতার প্রকৃত কারণ নিয়ে সমন্বিত সমীক্ষা জরুরি। অন্যথায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কাক্সিক্ষত সুফল থেকে বঞ্চিত হতে পারে সাধারণ মানুষ।
খুলনা গেজেট/এনএম

