শুক্রবার । ২৯শে মে, ২০২৬ । ১৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

গরু কোরবানিতে শুভেন্দুর ফাঁদে পা দিলেন না মুসলিমরা, কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষ‌তি

মোহাম্মদ সাদউদ্দিন, কলকাতা

২৮ মে ঈদ-উল-আযহা হয়ে গেছে। কিন্তু একটা হিসাব ‌ করা যেতে পারে। বিষয়টার সঙ্গে আর্থিক দিক যুক্ত। আর্থিক লেনদেন যুক্ত দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে।

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের গরু কোরবানি বন্ধ করার নিষেধাজ্ঞা জারি করে মুসলিমদের জব্দ করতে গিয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষ‌তি। এটা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কার্যত গো-পালক ও গরু বিক্রেতা হিন্দু সমাজের পেটে লাথিই মারলেন। এটা একেবারেই মোদ্দা কথা। মুসলিমরা অশান্তি এড়াতে গরুর পরিবর্তে ছাগল, খাসি, ভেড়া বা উটকে কোরবানি করার জন্য বেছে নিয়েছেন বিকল্প হিসাবে। কোনো জটিলতায় জড়াতে চাননি। এতে হিন্দু গরু বিক্রেতাদের মাথায় হাত। তারাই আজ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে রাস্তায়। এছাড়া কলকাতা হাইকোর্টের শরণাপন্ন।

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার এশিয়ার বৃহত্তম গরুর হাট জেলার বেলডাঙাতে অবস্থিত। সেই হাটে‌ কোনো গরু বিক্রি হচ্ছে না। হিন্দু মা-বোন-ভাইয়েদের‌ কাছে একমাত্র সম্বল চোখের পানি। তারা আজ‌ শুভেন্দুর বিরুদ্ধে রাস্তায়। বেলডাঙার মতো ছোটো-বড়ো-মাঝারি হাটের সংখ্যা ১০০০ খানেক। এই হাটগুলি এখন কার্যত ফাঁকা।

১৯৫০ সালে তৎকালীন ভারতের কংগ্রেস সরকার পশু বলিদান আইন তৈরি করেছিল কৃষি কার্যের সহায়ক‌ গরুর সংখ্যা যাতে কমে না যায়। পাশাপাশি গরু দুধ সরবরাহ ও জোগানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। একটা নিয়ন্ত্রণ রেখা ও রীতিনীতি করতে‌ তখন বাধ্য হয়েছিল ভারত সরকার। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ সরকারও। কিন্তু এখন তো কৃষিকাজ ট্রাক্টরের সাহায্যে হচ্ছে। এখন তো মাদার ডেয়ারি তৈরি করে বিকল্প‌ হিসাবে দুধের জোগান দেওয়া হচ্ছে। তাই ১৯৫০ সালের আইন অনেকটাই‌ শিথিল হয়ে যায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন সাধারণ হিন্দুদের পেটে লাথি মেরে মাংস সরবরাহকারী ভারতের বৃহত্তম করপোরেট হাউসগুলির হাতে গরুগুলোকে তুলে দিতে চান শুভেন্দু অধিকারী ও নরেন্দ্র মোদী। এই মাংস সরবরাহকারী সংস্থাগুলির মালিক হিন্দু। অর্থাৎ বিজেপি করপোরেট হিন্দুদের স্বার্থকে রক্ষা করতে চায় গরীব হিন্দু গো-পালক ও গরু বিক্রেতাদের পেটে লাথি মেরে। আর বিদেশি পয়সা কামাতে চান? কলকাতার বুকে গড়ে উঠা উপমহাদেশের বৃহত্তম চর্মনগরী বানতলাকে কি মোদী ও শুভেন্দু আদানি-আম্বানির হাতে তুলে দিতে চান? এটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গে হাজার হাজার কসাইখানা থেকে গরুর মাংসের কাঁচামাল অ্যালোপ্যাথিক ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ওষুধ তৈরি হয়। সেগুলো কি বন্ধ হয়ে যাবে? চামড়ার ব্যাগের কারখানা, জুতো কারখানা ও চপ্পল কারখানা কি বন্ধ হয়ে যাবে? গরুর চামড়ার সঙ্গে যুক্ত আনুষঙ্গিক শিল্প ও ব্যবসাগুলি কি আজ বন্ধ হয়ে যাবে? বিশেষজ্ঞ মহল আজ এই প্রশ্নই তুলেছেন।

শুভেন্দু অধিকারী যখন তৃণমূলের মন্ত্রী ও নেতা ছিলেন তখন মুসলিমদের বাড়িতে গিয়ে পেয়ালা পেয়ালা গরুর মাংস খেয়েছেন, যা ঐতিহাসিকভাবে সত্য। তার খাওয়ার স্বাধীনতাকে আমি কোনোদিন কটাক্ষপাত করব না। খাদ্যাভ্যাস একেবারে নিজস্ব ও রুচির উপর নির্ভর। অথচ আজ বিজেপির মুসলিম বিদ্বেষী নীতিকে কার্যকর করতে ও‌ হিন্দু ভোটকে মেরুকরণ করতে এই অনমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছেন। যাতে মুসলিমরা প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরো একটি দাঙ্গা পশ্চিমবঙ্গে লাগলে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি আরো সাফল্যমণ্ডিত হবে। এটাই বিজেপি-অমিত শাহ – নরেন্দ্র মোদী-শুভেন্দুর মূল টার্গেট বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। কিন্তু মুসলিম সমাজ সেই সমাজ বিজেপির সেই ফাঁদে মোটেই পা দেননি।

তবে ঈদের নামাজ রেড রোড থেকে ব্রিগেড ময়দানে নিয়ে যাওয়াটা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ফোর্টউইলিয়ামের।

মুসলমানদের কুরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে কত টাকার ব্যবসা হয়? গরু ব্যবসায়ীদের মধ্যে হিন্দু মুসলমানদের সম্ভাব্য শতাংশ কত? এটাই দেখে নেওয়া যেতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে, ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ) উপলক্ষে পশুর হাটে আনুমানিক ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ কোটি টাকার অর্থনীতি বা লেনদেন হয়ে থাকে। এই বিশাল ব্যবসার প্রায় ৮০ শতাংশ গবাদি পশু উৎপাদনকারী এবং বিক্রেতা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ (যাঁরা মূলত গ্রামীণ এলাকার ডেইরি খামারি বা গোয়ালা গোষ্ঠীর), আর এর সিংহভাগ ক্রেতা হলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।

এই বিশাল অর্থনীতির বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১) অর্থনৈতিক লেনদেন এবং আকার :মোট লেনদেন : বিভিন্ন হিসাব ও বাজারের অনুমান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসবে প্রায় ১২ লাখেরও বেশি গরু, খাসি ও অন্যান্য পশু কেনা-বেচা হয়। একে কেন্দ্র করে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকারও বেশি (প্রায় ১০০ বিলিয়ন রুপি) একটি অস্থায়ী গ্রামীণ অর্থনীতি তৈরি হয়।
পশুর দাম : জাত, আকার এবং ওজনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি পশুর দাম ৫০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ২-৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
সম্পর্কিত খাত : শুধু পশু কেনা-বেচা নয়, এর সাথে গো-খাদ্য, পরিবহন, এবং চামড়া শিল্প জড়িত, যা বহু গ্রামীণ পরিবারের সারা বছরের আয়ের প্রধান উৎস।

২)ব্যবসায়ী ও খামারিদের মধ্যে অনুপাত :হিন্দু সম্প্রদায় : গবাদি পশু লালন-পালন ও বিক্রির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ হিন্দু সম্প্রদায়ের। বিশেষ করে ঘোষ (গোয়ালা) এবং অন্যান্য প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলো সারা বছর গরু পালন করে এই মৌসুমের জন্য প্রস্তুত থাকেন।

মুসলিম সম্প্রদায় : পশু ব্যবসায়ীদের মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশের কাছাকাছি। তবে মৌসুমি ব্যাপারী বা দালাল হিসেবে অনেকে যুক্ত থাকেন এবং মূল ক্রেতা হিসেবে মুসলিমরাই সর্বাধিক পশু কোরবানি করে থাকেন।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পশু জবাই এবং কেনাবেচার নিয়মে কড়াকড়ি আরোপ করায়, কোরবানির বাজারে সামগ্রিকভাবে এক গভীর সংকট ও ব্যবসায়িক মন্দা দেখা দিয়েছে।

ভারতের বিজেপি সরকারের নতুন আইনে পশ্চিমবঙ্গে কোরবানির গরু সংকট ১৮ মে ২০২৬— পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের নতুন পশু জবাই নির্দেশিকায় ঈদুল আজহার আগে গরু কেনাবেচায় তৈরি হয়েছিল গভীর সংকট। মুসলিম ক্রেতাদের অনীহা, খামারিদের আর্থিক ক্ষতি।

খায় মুসলমানরা আর কামিয়ে অর্থ উপার্জন করে হিন্দুরা।

পুরো আর্থিক স্বার্থ মারা গেল হিন্দুদের। তাই না? পুরো পেটে লাথি হিন্দু বিক্রেতাদের। এর দায় নেবেন কে? শুভেন্দু, না মোদী? এটাই এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন