সরকারি প্রাথমিক স্কুল ফিডিং দুর্নীতি, নিম্নমানের খাবার পরিবেশন ও নানা অনিয়ম সংক্রান্ত তথ্যবহুল সংবাদ প্রথম প্রকাশ করে খুলনার প্রথম সারির পত্রিকা দৈনিক খুলনা গেজেট। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ সংক্রান্ত খবর স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। ধারাবাহিক খবর প্রকাশে প্রশাসনের টনক নড়লেও মূল ফোকাসটি পড়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের উপর। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাই দুর্নীতিগ্রস্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যার ফলে সরকারের এ প্রকল্প নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন শুরু হয়েছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে স্কুল ফিডিং প্রকল্প।
এদিকে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলে মায়েদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে গার্ডিয়ান কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। গতকাল সোমবার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সভাকক্ষে মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে এক জরুরি সভায় তিনি এমন নির্দেশনা দেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মিড-ডে মিল কার্যক্রম বাস্তবায়নে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম, গাফিলতি বা মানহীনতা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকারমূলক দায়িত্ব। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সভায় পাঁচ দফা নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, মিড-ডে মিল কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনুমোদিত নমুনা অনুযায়ী নির্ধারিত প্যাকেজিং কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হবে না। সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পণ্য সরবরাহকারী চালক এবং জাতীয় পরিচয়পত্রধারী ব্যক্তি একই হতে হবে এবং সরবরাহের সময় বাধ্যতামূলকভাবে পরিচয় যাচাই করা হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো অবস্থাতেই সাব-কনট্রাক্ট বা উপ-ঠিকাদারি দেওয়া যাবে না এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে স্বাক্ষরিত অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হবে। মিড-ডে মিল কার্যক্রমের মান ও গুণগতমান নিশ্চিত করতে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা প্রতি মাসে দুইবার আকস্মিকভাবে কারখানা পরিদর্শন করবেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তা ও সেবার মান তদারকিতে বিদ্যালয় পর্যায়ে মায়েদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ গঠন করা হবে। এ কমিটিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটির একজন সদস্য এবং তিনজন অভিভাবক মা সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র মতে, আগামীতে দেশের সরকারি সব প্রাথমিকে খাবার দিতে ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে চায় সরকার। গতকাল একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুসন্ধানের পর এ বিষয়ে খতিয়ে দেখতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাকে তাগিদ দেওয়ার পাশাপাশি কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্কুল ফিডিং প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সোমবার টেলিভিশনে সংবাদ প্রচার হয়, যেখানে উঠে আসে এই প্রকল্পে শিশুদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া হচ্ছে।
১১ উপজেলায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সপ্তাহে কলা ও ডিম-বানরুটি থেকেই লোপাট হচ্ছে ১৭ কোটি টাকা। নিম্নমানের এসব খাবার খেয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। অবশেষে দীর্ঘদিন পর হলেও ঠিকাদারদের তলব করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ সংক্রান্ত জরুরি বৈঠকও ডাকেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এমনকি অনিয়মকারীদের কার্যাদেশ বাতিল করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, সারাদেশে প্রায় ১৫০ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক স্কুল ফিডিং প্রকল্পটি চলছে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বর্তমানে ৫ প্রকার খাবার দেওয়া হচ্ছে শিশুদের। তালিকায় রয়েছে, ডিম, বানরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট। তবে অভিযোগ উঠেছে এই প্রকল্পে শিশুদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানের পর দেখা গেছে, ১২০ গ্রাম ওজনের বন রুটির দাম ধরা হয়েছে ২৪ টাকা পর্যন্ত। এমনকি ওজন ঠিক রাখতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে রুটি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রুটির ভেতরের বাতাস থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধ বের হয়, যা খাওয়ার অযোগ্য করে তোলে। তাই শিশুরা অনেক সময়ই সেটা ফেলে দেয়। নিয়ম অনুযায়ী ডিম দিতে হবে ন্যূনতম ৬০ গ্রাম ওজনের। প্রতি পিসের দাম ১৪ টাকা পর্যন্ত। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একেকটি ডিমের ওজন ৩৫ কিংবা ৪০ গ্রামের বেশি নয়। ৬০ গ্রাম না দিয়ে কম ওজনের ডিম দেওয়া হচ্ছে।
খুলনার স্থানীয় খামার মালিকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ছোট ডিমে এক থেকে দেড় টাকা কম লাগে। তারা আরও জানান, ৫৫ গ্রামের ডিমগুলো বড় ক্যাটাগরিতে পড়ে, দামও বেশি। এসব কারণেই প্রতিদিন ২৯ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ জন শিক্ষার্থীর বাজেটে এক টাকা কম করেও দেওয়া হলে সারাদেশে প্রতিদিন নিয়মবহির্ভুতভাবে কর্মকর্তাদের পকেটে ঢুকবে লাখ টাকা, সপ্তাহে কোটি টাকা। শুধু কম ওজন আর দামে সস্তা নয়, ঠিকঠাক সিদ্ধ না করা আর পচা ডিম সরবরাহের অভিযোগও আছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, এই ডিম খাওয়া যায় না, তেমনি পচাও থাকে।
সরেজমিনে গিয়ে খুলনার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, কলার ওজন ৮০/৯০ গ্রাম। তবে সেখানে ১০০ গ্রাম ওজনের কলা দেওয়ার কথা ছিল সরবরাহকারীদের। চুক্তি অনুযায়ী ১০০ গ্রাম ওজনের প্রতিটি কলার দাম সাড়ে ১০ টাকা পর্যন্ত।
দাম যাচাইয়ে বাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একেকটি কলার দাম পড়ে ৪/৫ টাকা। এমনকি ওজনভেদেও দামের তারতম্য দেখা যায়। কলার বাজেটে শিক্ষার্থীর জন্য প্রতি কলায় ৭ টাকা বরাদ্দ থাকলে, সেই হিসাবে প্রতি সপ্তাহে অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে কোটি টাকা ঢুকছে। এসব নিম্নমানের কলা, রুটি, ডিম খেয়ে বিভিন্ন স্থানে অসুস্থ হয়েছেন তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। তবে সবচেয়ে বেশি অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অ্যাকশন আমাদের নিতে হবে। কারণ আসলে কোমলমতি বাচ্চাদের এই খাবারের বিষয়ে আমরা কোনো প্রকার ছাড় দিতে রাজি নই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, উপাদানগুলো যদি ক্ষতিকর হয়, তাহলে তা শিশুদের লিভারের ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর যদি তা বাসি বা পচা হয়, তবে ডায়রিয়া, জন্ডিস, হেপাটাইটিস- ‘এ’ ও ‘ই’ হতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, এখন থেকে প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজমেন্ট কমিটি খাবার কমিটিতে থাকবে, তারা বিষয়টি বুঝে নেবে, এমনই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

