বুধবার । ১৩ই মে, ২০২৬ । ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩

দু’দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব হোক ভারসাম্যপূর্ণ

বাপি সাহা

‘ব্রিগেড’ পশ্চিম বাংলার অনেক স্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী। ফোর্ট উইলিয়াম নির্মাণের সময় জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে ব্রিগেড-এর সৃষ্টি। ভারতবর্ষের নেতারা এখানে এসেছেন বহুবার কথা বলেছেন। পশ্চিম বাংলার শাসকগোষ্ঠী বা বিরোধীদল এই ‘ব্রিগেড’ ব্যবহার করেছেন। সেই ব্রিগেড-এ শপথ গ্রহণ করেছেন পশ্চিমবাংলার মূখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উপস্থিত ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ মন্ত্রিসভার হেভিওয়েট সদস্যবৃন্দ। রাজনীতিতে শেষ শব্দ বলে কোনো কিছু নেই। মমতার হাত ধরে তিনি এখন বিজেপি’র পশ্চিম বাংলার মূখ্যমন্ত্রী। ভারতীয় জনতা পার্টি বাংলা জয়ের কাজটি শুভেন্দু কে দিয়ে করিয়ে নিলেন। জায়েন্ট কিলার হিসাবে তিনি ইতোমধ্যে খ্যাতি অর্জন করেছেন। ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন চমক সৃষ্টি করতে মোদি সরকার বেশ কৌশলী সেটা বোঝা যাচ্ছে। শপথ মঞ্চে নতজানু হয়ে প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবাংলার মানুষকে কৃতজ্ঞতা জানাতে দেরি করেননি। ২৫ বৈশাখ বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনকে বেছে নিলেন শপথ গ্রহণের দিন হিসাবে।

পশ্চিম বাংলা জয়ের মাধ্যমে তিনি তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের মিশন সফলতার একধাপ এগিয়ে নিলেন। বিজেপির এই জয় নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে এর প্রভাব কি বাংলাদেশে পড়বে? মজার বিষয় হচ্ছে ভারতের পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করে দিল্লি, কোনো রাজ্য সরকার নয়। দিল্লি এখন বাংলাদেশকে নিয়ে অনেকটা সিরিয়াস। বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার কাজের মেয়াদ সমাপ্তির পথে নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়েছে। দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে যার ঘোষণা ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছেন। দিল্লির সাউথ ব্লক অনেক হিসাব করে দীনেশ ত্রিবেদীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। সাউথ ব্লক কোনোভাবে হিসাবে ভুল করতে আগ্রহী নয়।

দীনেশ ত্রিবেদী বাংলা বোঝেন এবং জানেন। এই নিয়োগটি প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির নিজস্ব পছন্দের কারণ বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত অনেক আগ্রহী। টেক্সাস বিশ^বিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েশন সমাপ্ত করা এই মানুষটি একজন প্রশিক্ষিত পাইলট। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করেছেন। ১৯৭১ সালের পর থেকে ভারত একজন রাজনীতিবিদ হিনাবে নিয়োগ প্রদান করেছে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদীকে। দীনেশ ত্রিবেদী তৃণমূলের রাজনীতির থেকে উঠে এসেছেন, এখন তিনি বিজেপির রাজনীতির সাথে সক্রিয়। সাধারণত কুটনৈতিক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম আসে না। ‘বাংলাদেশ ইজ ফাস্ট’ এই চিন্তা ভাবনা থেকে এই উদ্যোগ।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পৃক্তা চালিয়ে যাওয়ার বার্তা পাঠিয়েছিল ভারত সরকার। এরই অংশ হিসেবে ঢাকা সফরও করেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। যিনি ভারতের সাথে চীনের সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিলেন। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় রূপ নেয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, “বাংলাদেশ-মায়ানমার ডিভিশনের আমরা কাজ করতে চেয়েছি। আমরা এই সরকারের সঙ্গেও কাজ করতে চাই।” গণমাধ্যমে বিক্রম মিশ্রি ইতোমধ্যে বলেছেন, “বাংলাদেশের জনগণ যাকে নির্বাচন করবে তার সঙ্গেই ভারত কাজ করবে। সরকার যে রাজনৈতিক দলেরই হোক না কেন আমরা কাজ করব।” জনগণ সরকার নির্বাচন করবে। সম্পর্ক উন্নয়নের কাজ চলমান প্রক্রিয়া।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শোক জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর তারেক জিয়ার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন ঢাকায়। শোকে পরিবারের পাশে তথা দেশের পাশে ছিলেন তিনি। বিগত দিনের বেগম খালেদা জিয়ার সাথে কাজের স্মৃতিচারণও করেছিলেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পীকার ওম বিড়ালা এসেছিলেন। ভারত মনে করে লোকসভার স্পীকার সর্বজন শ্রদ্ধেয়। সরকার এবং বিরোধী দলের কাজে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এই গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি ভারতের তাই তিনি বহন করে এনেছিলেন ভারতে প্রদান মন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা এবং ভারত সফরের আমন্ত্রণ। দিল্লি এখন বাংলাদেশ সরকারে সাথে আলোচনায় আগ্রহী তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। ভারত দ্বিপক্ষীয় কাঠামোগুলো সচল করার চেষ্টা করে চলছে।

ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় দাবি করে তাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্ভবত প্রথম বিদেশি নেতা যিনি নির্বাচনের পর তারেক রহমানকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অসাধারণ সমর্থন নিয়ে তারেক রহমান ক্ষমতায় এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়ালা অংশ নিয়েছেন। ভারতের লোকসভার স্পিকার সাধারণত এ ধরনের সফর করেন না। ভারতের সব পক্ষের প্রতিনিধি হিসাবে তিনি বাংলাদেশে সফর করেছিলেন। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সকল রাজনৈতিক দল সম্পর্কের উন্নয়ন চায় সেটি প্রমাণ করার একটি প্রচেষ্টা। সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ভারতে জ¦ালানি সংকটের সময়ও বিবৃতি ছাড়া ইন্দো-বাংলা মৈত্রী পাইপলাইন দিয়ে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ করছে ভারত। ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহও চলছে। রাশিয়া থেকে আমদানি করা তেল সরবরাহ বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।

সংকট রয়েছে পানি বণ্টন নিয়ে। দুই দেশের পানিসম্পদ বিষয়ে দুই দেশ আশাবাদী। ভারত মনে করের ‘দুই দেশের মধ্যে ৫৪ টি অভিন্ন নদ-নদী আছে। পানি বণ্টন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বহুবার। অগ্রগতি সত্ত্বেও এখানে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’

৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা চুক্তি দুই দেশের মধ্যে ফলপ্রসূ সহযোগিতার একটি ভালো উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করে থাকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে আগামী ডিসেম্বরে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এ বিষয়ে দুই দেশের আলোচনা জন্য যৌথ কমিশন (জেআরসি) আছে। সেখানে আমরা আলোচনা করতে পারি। পশ্চিম বাংলার নির্বাচনের পর কথিত অবৈধ অভিবাসী নিয়ে বেশ কথা শোনা যাচ্ছে এই বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুখ খুলেছে। কথিত অবৈধ অভিবাসীদের ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “সেগুলো বিদ্যমান আইন অনুযায়ী হয়েছে। জাতীয়তা পরিচয় যাচাইয়ের অগ্রগতি হয়নি। তিন জানান হাজারের মতো ঘটনা ঝুলে আছে। এমনকি পাঁচ বছর আগের অর্থাৎ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সময়ের অনুরোধও এখনও ঝুলে আছে। এ বিষয়ে অগ্রগতির উপায় হলো নাগরিকত্ব যাচাই করা।

কোভিডের সময় সহায়তা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “শুধু বাংলাদেশ নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর দুর্যোগে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ভারত দ্বিতীয়বার চিন্তা না করেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। আমরা চাই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্ক হোক বন্ধুত্বের। বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত থাকুক। সম্পর্ক যত ভালো হবে ততই মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসবে সকলের জন্য।”

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপির জয় প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গণমাধ্যমকে বলেন, “অনেক বছর পর এবার এমন পরিস্থিতি আসছে, যখন ভারতের কেন্দ্রে ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে একই দলের সরকার থাকবে। পররাষ্ট্র নীতি ঠিক হয় রাজধানীতে। ২০২৪ সালের জুলাই- আগস্টের ঘটনাগুলোর পর পর্যটক ভিসা কার্যক্রম সীমিত করা হয়। এখনও আলোচনা চলছে। মেডিক্যাল ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। বাংলাদেশ হাইকমিশন ভারতীয়দের ভিসা প্রদান করে চলেছে। সেক্ষেত্রে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশিদের জন্য সকল প্রকার ভিসা উন্মুক্ত রাখবে। এটি প্রত্যাশা। ভিসা জটিলতা দূর হবে। মেডিকেল ভিসার ক্ষেত্রে ভারতীয় হাইকমিশন ও সহকারী কমিশনগুলি মানবিকতার সাথে ভিসা দেওয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা করে চলেছে। তাদের ধন্যবাদ দিতে হয় কাজের জন্য। সীমান্ত হত্যা দুই দেশের সম্পর্কের জায়গায় জটিলতা তৈরি করছে। সীমান্তে যাতে হত্যাকাণ্ড না ঘটে সেদিকে সকলকে নজর দিতে হবে।”

আমরা চাই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক হোক ভারসাম্যপূর্ণ, গঠনমূলক, যাতে দুই দেশের জনগণের লাভ হয়। ভারত আমাদের জ¦ালানি যে সহযোগিতা করেছে সংকটকালীন সময়ে তার আমরা কৃতজ্ঞ। ঠিক তেমনি বন্ধুত্বের জায়গাটি হোক ভারসাম্যপূর্ণ।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন