সোমবার । ৪ঠা মে, ২০২৬ । ২১শে বৈশাখ, ১৪৩৩

‘কাজির গরু কেতাবে, নেই গোয়ালে’

আবদুল কাদের খান

“মুখ থেকে ওরা রুটি কেড়ে নেয়
বলতে দেয় না কথা,
অথচ আমারই রক্ত ও ঘামে
গড়া এই সভ্যতা !”

প্রতিবাদী নিপীড়িত শ্রমিকের রক্তে ভেজা পহেলা মে ছিল শুক্রবার। এ দিনটিকে ঘিরে অনেক ইতিহাস। অনেক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে অর্জিত এ দিবস! এই দিনে বিশ্বের সকল শ্রমিকের হাত উত্তোলিত হয় – একটিই স্লোগানে মুখরিত হয়ে – শোষণ, বঞ্চনা লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও!’ মেহনতি মানুষের সংগ্রাম চলছে চলবে। শ্রমজীবীর মানুষের লড়াই চলছে, চলবে। ‘খড়হম ষরাব ড়ঁৎ ৎবাড়ষঁঃরড়হ.’ আমাদের লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। পেছনের দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই; এই মে দিবস এসেছে কঠিন আত্মত্যাগের বিনিময়ে। সারা দুনিয়ায় বিশেষ করে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের সূচনা লগ্নে শ্রমিকদের ২৪ ঘণ্টা দিনরাত্রির মধ্যে ২২ ঘণ্টা শ্রম দিতে হতো মালিকের কারখানা এবং খামারে। নিপীড়ন নিগ্রহ চলতো সমান তালে। শ্রমিকের পুঁজি দুইখানা হাত আর দুটি পা এবং শ্রম বিক্রি করা ছাড়া তাদের মালিকানায় আর কিছু ছিল না। চরম নিগ্রহ ভোগ করতে হতো শ্রমিকদের। মালিকের শোষণ ও লুণ্ঠনের শিকার শ্রমিকরা বিশ্রামই পেত না বলা চলে। তারা ছিল মালিকের কারখানার দাস। কিন্তু ইতিহাস থেমে থাকেনি…

১৮৮৬ সালের কথা। ফেলাডেলফিয়ার জুতা ধর্মঘটের শ্রমিকদের মাধ্যমে জানা যায় তাদেরকে দিনরাত্রি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মালিকের কারখানায় ১৮ থেকে ২২ ঘণ্টা শ্রম দিতে হয়। অসহনীয় এ দুরবস্থার অবসান কামনা করে পশ্চিমা দুনিয়ার এ সমস্ত শ্রমিকরা জোট বাঁধে, এক হয়ে কারখানা মালিকদের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকে। শোষিত নিগৃহীত শ্রমিকরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে একতাবদ্ধ হয়। মালিক শ্রেণির বিরুদ্ধে শ্রমিকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

আট ঘণ্টা শ্রম। আট ঘণ্টা বিনোদন। আট ঘণ্টা বিশ্রামের দাবিতে ১৮৮৬ সালের পহেলা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের ‘হে মার্কেট’ এ কর্তৃপক্ষের সকল বিধি নিষেধ অমান্য ও উপেক্ষা করে সংগ্রামী মোর্চা গঠন করে, মালিকের জুলুমের বিরুদ্ধে ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে একতাবদ্ধ হয়।

নিরীহ সেই সমাবেশের উপর মার্কিন পুলিশ গুলি বর্ষণ করে মুহূর্তে স্পিংস, ফিশারসহ সাতজন শ্রমিক প্রাণ হারান। অকাতরে জীবন দিয়ে শহীদ হন। এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের দাবি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তারপর থেকে আট ঘণ্টা কাজের শ্রমজীবী মানুষের এই অধিকার আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস হিসেবে পহেলা মেকে চিহ্নিত করা হয়।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর স্বৈরশাসক শেখ মুজিব ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার কেড়ে নেয়। স্বাধীন দেশে শ্রমিকের অধিকার স্তব্ধ হয়ে যায়। কল কারখানা নিজস্ব দলীয় লোকের নেতৃত্বে সকল প্রকার দর কষাকষি, আন্দোলন কিংবা দাবি আদায়ের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিব-এর পতনের পর পট পরিবর্তন হয়। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান। ১৯৮০ সালের পহেলা মে থেকে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মে দিবস হিসেবে এই দিনটি স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশেও তখন থেকে এই দিনটি পালন হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস পহেলা মে তখন থেকে পালিত হয়ে আসছে।

মে দিবসের ওই দিনটি আসলে অবশ্যই আমরা বজ্রমুষ্টি উত্তোলন করি, গলা ফুলিয়ে গলা কাঁপিয়ে দিনটির ইতিহাস ও মহিমা সগৌরবে প্রকাশ করি, এসবই সত্য। তবে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অল্প কিছু সংগঠন আট ঘণ্টা শ্রম দানের অধিকার ভোগ করলেও অনেক জায়গায় রয়ে গেছে দারুণ অন্ধকার।

হোটেল শ্রমিক দোকান শ্রমিক ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা কোনোভাবেই আট ঘণ্টা শ্রম দানের সুযোগ পায় না। বরং উদয়াস্ত তাদের শ্রম দিতে হয় মালিকের প্রতিষ্ঠানে। গভীর রাত্রে ঘুম চোখে ঘরে ফেরে আবার ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই জীবন জীবিকার জন্য মালিকের প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসতে হয়। অনেকে সাপ্তাহিক ছুটি ও পায়না। পত্রিকার পাতা উল্টালেই প্রতিদিন এ সংক্রান্ত বহু বেদনাদায়ক গ্লানিকর সংবাদ চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

গেল পহেলা মে ২০২৬ শুক্রবার খুলনা গেজেট-এর শীর্ষ সংবাদটি ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং দারুণ পীড়াদায়ক। শিরোনামটি ছিল… ‘মে দিবসের ছোঁয়া লাগে না হিমায়িত চিংড়ি শিল্পের শ্রমিকদের’-এই ব্যানার নিউজটি সত্যিই অত্যন্ত বেদনার ও পরিহাসের! খবরে বলা হয় : স্বল্প বেতনের এইসব শ্রমিকদের আট ঘণ্টার স্থলে ডিউটি করতে হয় ১২ ঘণ্টা। সারা বিশ্বে কাজের সময়সীমা আট ঘণ্টা বেঁধে দেওয়া হলেও দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খুলনাসহ পাশের রূপসায় অবস্থিত দ্বিতীয় বৃহত্তর রপ্তানি খাত হিমায়িত চিংড়ি শিল্পাঞ্চলে এখনো ১২ ঘণ্টা রয়েছে কাজের সময় সীমা। সেই সাথে নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে না তাদের প্রাপ্য ন্যায্য মজুরি! মে দিবসে নেতারা গালভরা বক্তৃতা দেন শ্রমজীবী মানুষের প্রতি দরদ সহানুভূতি প্রকাশ করেন। কিন্তু শ্রমিকের রক্ত ঘাম শ্রম লুণ্ঠন আজও চালিয়ে যাচ্ছে সেখানকার মালিক কর্তৃপক্ষ। এ শিল্পে পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি এবং তারাই হচ্ছে দারুণভাবে ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত এবং প্রতারিত। এ সম্পর্কে যেন বলার কেউ নেই!

বিষয়টি স্পষ্ট করে বলি। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রপ্তানি খাত চিংড়ি শিল্প প্রতিষ্ঠানে মূলত দুই ক্যাটাগরির শ্রমিক রয়েছে।

এক. গ্রুপ কোম্পানির মালিকপক্ষের নিয়োগ প্রাপ্ত এবং অপার শ্রমিক গ্রুপ টি ঠিকাদারদের অধীনে। মালিকের অধীনে মৌখিক বা নিয়োগপ্রাপ্ত যেসব শ্রমিকরা কাজ করেন তারা অবশ্যই বেতনভুক্ত হলেও কাজের সময় এরা নানা প্রতারণা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, প্রতারিত হচ্ছে পদে পদে। একটু খুলে বলা যাক –চাকরির শুরুতে সবকিছু মিলে এদের বেতন ধার্য করা হয় ৭২০০ টাকা। বছরে বোনাস বলতে কোন কোন কোম্পানি শ্রমিকদের দুই ঈদের একটিতে ফুল এবং অপর ঈদে হাফ বা অর্ধেক বোনাস দিয়ে থাকে। তবে বেশিরভাগ মালিক পরিচালিত কোম্পানিতে পূর্ণ বোনাসের বদলে হাব বোনাস বিয়ের শ্রমিকদের সাথে দায়সারা গোছে তারা দায়িত্ব পালন করে। মালিকদেরকে কোনো সংগঠন বা সরকারের পক্ষ থেকে কেউ কোনো কথা বলে না এসব অবিচারের বিরুদ্ধে। মজার ব্যাপার হলো কাগজে কলমে শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কাজ দেখানো হলেও তাদের কাছ থেকে ১২ ঘণ্টা শ্রম আদায় করা হয় বাধ্যতামূলকভাবে। সারাদেশের সরকারিভাবে ঈদের ছুটি তিন দিন হলেও তাদের ছুটি মাত্র একদিন। কী বিচিত্র ব্যবস্থা!

কোনো অনিবার্য কারণে শ্রমিক তার কর্মস্থলে দুই এক দিন অনুপস্থিত থাকলে মাস শেষে কর্তন করা হয় অনুপস্থিতির বেতন। কোনো ক্ষেত্রে ভয়ংকর একটি ঘটনা ঘটে—কোনোভাবে শ্রমিকদের নিজের ইচ্ছা দাশ করতে না পারলে এইসব শ্রমিকদের অজ্ঞাত রহস্যজনক কারণে চাকরিরচ্যুত করা হয়, হর হামেশা। এক হুকুমেই বলে দেওয়া হয়, কাল থেকে আর আসতে হবে না। এমনই খামখেয়ালি স্বেচ্ছাচারিতা চলছে হিমায়িত চিংড়ি শিল্পের শ্রমিকদের ভাগ্যে। এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা, খামখেয়ালিপনা অনাচারের প্রতিকারের জন্য কেউ নেই! এই চিংড়ি শিল্পে শ্রমিকদের জন্য কোনো বাড়তি সুবিধা দূরের কথা, ৮ ঘণ্টার স্থলে ১২ ঘণ্টা খাটালেও ওদের কোনো ওভার টাইম অ্যামাউন্স দেওয়া হয় না। একেই বলে উপরে সাইনবোর্ডের আড়ালে নিচে মে দিবসের শ্রমিক অধিকারের কী সুন্দর আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস! অপরদিকে ঠিকাদারদের অধীন কর্মরত শ্রমিকরা অধিকাংশই নূন্যতম বেতনে আবার কেউ কেউ কাজের উপর ভিত্তি করে বেতন পেয়ে থাকেন। এরা অবশ্য উৎপাদন বিভাগে কর্মরত শ্রমিক। এদের কাজ হচ্ছে মাছ গ্রেড, ঘাট লেবার ই এবং ক্যাজুয়ালি হিসেবে কাজ করা। পুরো যে চিত্রটি এই শিল্পে উঠে এসেছে তা অত্যন্ত বিড়ম্বনার। কাগজে পত্রে দেখানো হয় ৮ ঘণ্টা অথচ বাস্তবে কাজ করিয়ে নেওয়া হয় ১২ ঘণ্টা। প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে সারপ্লাস ৪ ঘণ্টা ফাঁকি দেওয়া হয়। এই শিল্পে সাপ্তাহিক ছুটি বলে কিছু নেই। মালিক এবং তাদের নিয়োজিত কর্মকর্তারা বা প্রতিনিধিরা এই শিল্পের শ্রমিকদের সাথে নানা অব্যক্ত স্বেচ্ছাচারিতা নোংরামি করে থাকে, যা কোনোদিন জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না।

এদিকে বছর পর বছর মে দিবস পালিত হচ্ছে অথচ শ্রমিকদের পাওনার দাবিতে শ্রম আদালতে বছরের পর বছর ঝুলছে অজস্র মামলা। মালিকপক্ষ নিগৃহীত শ্রমিকদের হয়রানি করার জন্য মামলাগুলো হাইকোর্টে রিট করে রেখেছে। যেসব মিলের প্রমিকা হয়রানির শিকার হচ্ছে সেগুলো হচ্ছে :

জেজে আই, ক্রিসেন্ট, ইস্টার্ন, প্লাটিনাম, আলিম ও আফিল। মজার ব্যাপার, খুলনা বিভাগের দশটি জেলার পরম বিরোধ সম্পর্কিত মামলা নিষ্পত্তির জন্য একমাত্র আদালত নগরীতে অবস্থিত। এ আদালতে আকাশি সম্পর্কিত এবং ৮৫ টি ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। এ বছরে গত চার মাসে অর্থাৎ এপ্রিল পর্যন্ত ৭৮ টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। মিল মালিকরা উচ্চ আদালতে রিট করে ২২টি মামলার বিচার কাজ স্থগিত করে রেখেছে। ফ্রম অধিদপ্তর-এর সঠিক তদারকির অভাবে সাতটি ট্রেড ইউনিয়নের মামলা বিচারাধীন পড়ে রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য মামলাগুলো হচ্ছে রূপসা হকার্স ইউনিয়ন, কেসিসি কর্মচারী ইউনিয়ন, শিরোমণি বাজার বণিক সমিতি ও আলম নগর বাজার বণিক সমিতির। আদালত সংশ্লিষ্ট মোহাম্মদ আলী আশরাফ প্রতি মাসে ঘরে ১৯ টি মামলা নিষ্পত্তির একটি পরিসংখ্যান দিয়েছে। তিনি বলেছেন, এখানে দায়ের কৃত বেশিরভাগ মামলা শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি দাবিতে। মালিকপক্ষ গা বাঁচানোর জন্য শ্রমিকদের বঞ্চিত রাখার জন্য হাইকোর্টে রিট করে মামলাগুলো স্থগিত করে রেখেছে। মালিকরা শ্রমিকদের বঞ্চিত করছে বছরের পর বছর ধরে। শ্রম আইনের মামলাগুলো হচ্ছে : নিয়োগ পত্র, বেতন বই এবং পরিচয়পত্র না থাকা। এছাড়া অনেক মিলে নিরাপত্তা সরঞ্জামই নেই। আমাদের দেশে শ্রম আইন থাকলেও মামলা নিষ্পত্তির অভাবে কচ্ছপ গতিতে চলার জন্য শ্রমিকরা আজও নিগৃহীত হচ্ছে। আমরা আশা করবো, সরকারের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নেবেন। অন্যথায় শ্রমিকরা এই বৈষম্য থেকে কোনদিনও বের হতে পারবে না।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন