খুলনা আজ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভাগীয় শহর হলেও মূলত খুলনার পরিচিতি শিল্প-বাণিজ্য ও বন্দরকে কেন্দ্র করে। এর প্রেক্ষিতেই গড়ে উঠেছে বিশাল জনগোষ্ঠীর এক জনপদ। কিন্তু শিল্প ও বাণিজ্য কেন্দ্রিক বিভাগীয় শহর ও সদর হলেও এখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য- বিশুদ্ধ পানি, যোগাযোগ ও চলাচলের কাক্সিক্ষত সুযোগ থেকে আমরা তথা খুলনা অঞ্চলের নাগরিকগণ বঞ্চিত। বিশেষ করে খুলনা নগরী, কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় আজও পানির সংকট নিরসন হয়নি। এই বঞ্চনা একদিনে সৃষ্ট হয়নি, বরং একের পর এক বঞ্চনার শিকার করে সমস্যার পাহাড় তৈরি করা হচ্ছে। যার গহ্বরে খুলনার মানুষ অন্ধকারে ভিন্ন কোনো আলোর দিশা দেখছে না।
বাংলাদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবে তার ভৌগোলিক অবস্থান ভিত্তিক সুষম উন্নয়ন আশা করে। শুধু আশা নয়, স্বাধীন দেশের মানুষ হিসেবে উন্নয়নের সুফল ভোগ করার সুযোগও অধিকার তাদের পাওনা। সুষম উন্নয়নের পরিকল্পনা মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব সরকারের। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই আমরা খুলনার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর দাবি তুলছি। খুলনা উন্নয়নের আন্দোলন কোনো আঞ্চলিকতার আন্দোলন নয়, কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, উন্নয়ন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে চাই। এ কারণেই খুলনার উন্নয়নে আন্দোলনের প্রশ্নে দলমত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধ।
ব্যক্তিগতভাবে সমন্বয় কমিটির, সদস্যদের কেউ কেউ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারেন, তবে কমিটির সাথে খুলনা উন্নয়নের প্রত্যাশা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নেই। জাতীয় স্বার্থেই খুলনার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
মংলা সমুদ্র বন্দর উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বাভাবিক পোতাশ্রয়। এ বন্দরকে সচল রাখার জন্যে স্থায়ীভাবে ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন মংলা বন্দর দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী সামুদ্রিক বন্দর বিধায় জাতীয় অর্থনৈতিক বিকাশে অবদান রেখে আসছে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতি আমদানি নির্ভর হওয়ায় এবং মংলা বন্দরকে রপ্তানির পাশাপাশি আমদানি বন্দর হিসেবে ব্যবহার না করায় বন্দরের আয় দেশের অন্য সামুদ্রিক বন্দরের তুলনায় সীমিত। দেশের বেশিরভাগ এলাকার সাথে নৌ-পথে মংলা বন্দরের যোগাযোগ চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়েও ভালো। মংলা বন্দরের সত্যিকার অর্থে প্রথম শ্রেণির পোতাশ্রয় হিসেবে গড়ে তোলার স্বার্থে মংলা বন্দরকে আমদানি বাণিজ্যের জন্য ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে আকরাম পয়েন্টে বন্দর সম্প্রসারণ করা জরুরি দরকার। স্বাধীনতার পূর্বে তৎকালীন পাকিস্তান আমলে ফুলতলা, আটরা-গিলাতলায় ১৯৬৭ সালে বিমান বন্দরের জায়গা স্থান নির্ধারণ করা হয় এবং সেখানে কিছু কাজ হয়। কিন্তু পরবর্তীতে যশোর বিমানবন্দর থেকে ফুলতলা বিমান বন্দরের আকাশপথের কম দুর্গতের অজুহাতে সে প্রকল্প বাতিল হয়ে যায়। ১৯৯২ সালে রূপস-মোংলা মহাসড়কের পার্শ্বে রামপালের ফয়সাল বিমানবন্দরের কাজ শুরু হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য আজ পর্যন্ত ১০ ভাগ কাজ ছাড়া বাকী ৯০ ভাগ কাজ অসমাপ্ত। খুলনায় বিমান বন্দর স্থাপন কোনো বিলাসিতার ব্যাপার নয়। খুলনায় বিমান বন্দর স্থাপিত হলে পর্যটন ক্ষেত্রে স্থানীয় সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে। পর্যটকদের কাছে সুন্দরবনের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী, ও হিং¯্র প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার এ বনের অন্যতম প্রাণী। চিত্রল হরিণের বসবাস সুন্দরবনে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। সুন্দরবন সংলগ্ন সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান হতে পারে। কিন্তু যাতায়াতের ক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থার জন্য পর্যটকরা খুলনা মুখী হতে চায় না। রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত (ইপিজেড) এলাকা হিসেবে খুলনা-মংলা সর্বোৎকৃষ্ট স্থান, তার প্রথম কারণ হলো দেশের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্রিক সামুদ্রিক বন্দর খুলনার মংলায় অবস্থিত। দ্বিতীয় কারণ হলো সুন্দরবনের কারণে খুলনা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিপদ থেকে অপেক্ষাকৃত মুক্ত। এ এলাকায় বন্যা সমস্যা নেই বললে চলে। অথচ বাংলাদেশে মংলায় রপ্তানি প্রক্রিয়াজাত এলাকায় সবচেয়ে বেশী জমি ৪৬০ একর জমি নিয়ে গঠিত হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা এদিকে শিল্প স্থাপনে অগ্রাধিকার দেয়নি। চিংড়ি চাষ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর বেশিরভাগ রাজস্ব খুলনা থেকে আয় হয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ হলে এখানে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ইতোমধ্যেই ভেনামি নামে চিংড়ি চাষ পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থে সাতক্ষীরায় মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন সময়ের দাবি মাত্র। খুলনা-মাওয়া-ঢাকা সড়ক নির্মাণের সাথে সাথে মাওয়ায় পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হয়েছে। রাজধানীর সাথে খুলনার যাতায়াতের সময় যেমন সাশ্রয় হবে, তেয়নি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি খরচ কমে যাবে। পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় খুলনায় সরবরাহের সম্ভাবনা অনেকখানি উজ্জ্বল। খুলনায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হলে এ অঞ্চলে আরও কলকারখানা গড়ে তোলা সম্ভব হবে এবং তা জাতীয় অর্থনৈতিক বিকাশে অবদান রাখবে।

