বৃহস্পতিবার । ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩

পৃথিবী দিবসে পৃথিবীর জন্য আমরা কী করছি?

আল শাহারিয়ার

ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে আবার এসেছে পৃথিবী দিবস। দিনটি এলেই আমরা হঠাৎ করে খুব পরিবেশসচেতন হয়ে উঠি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবুজ গাছের ছবি দিই এবং বড় বড় কথা বলে স্ট্যাটাস লিখি। কিন্তু দিন শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের কী কখনো প্রশ্ন করি, সত্যিই পৃথিবীর জন্য আমরা কী করছি? আমাদের এই উদযাপন শুধুই কী এক ধরনের আত্মতুষ্টির মহড়া? বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। আমাদের প্রতিদিনের যাপিত জীবনের ছোট ছোট ভুলের এক বিশাল যোগফল এই সুন্দর গ্রহটিকে একটু একটু করে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আমাদের রোজকার সকালের কথাই ধরা যাক। প্লাস্টিকের টুথব্রাশ, পলিথিন ব্যাগ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের কাপ আর দাঁত ব্রাশের সময় অবলীলায় ছেড়ে রাখা পানির কল। এই সাধারণ কাজগুলোই মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অপচনশীল প্লাস্টিক ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক হয়ে আমাদের রক্তে মিশছে। আমাদের খাদ্যাভ্যাসও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। উৎপাদিত খাবারের বিশাল অংশ ডাস্টবিনে ফেলে দিই আমরা, যা থেকে নির্গত মিথেন গ্যাস মারাত্মক ক্ষতিকর। অন্যদিকে ফাস্ট ফ্যাশনের মোহে সস্তা পোশাক কিনে দ্রুত ফেলে দিচ্ছি, অথচ একটি সুতির টি-শার্ট তৈরিতে প্রায় আড়াই হাজার লিটার পানি লাগে। নতুন গ্যাজেটের প্রতি আসক্তি পাহাড়সম বিষাক্ত ই-বর্জ্য তৈরি করছে।

শহরের জীবনযাত্রায় আমরা গাছ কেটে কংক্রিটের জঙ্গল বানাচ্ছি। যাতায়াতে গাড়ির কালো ধোঁয়া বাতাসকে বিষাক্ত করছে। একটু স্বস্তির জন্য ঘরে ঘরে এসি লাগাচ্ছি, অথচ এসির নির্গত ক্ষতিকর গ্যাস বাইরের তাপমাত্রাকে আরও বাড়িয়ে মারাত্মক দুষ্টচক্র তৈরি করছে।

পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন আমরা পরিবেশ বাঁচানোর জলবায়ু সম্মেলন করছি, অন্য প্রান্তে তখন চলছে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। চলমান যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত কেবল মানবসভ্যতার জন্যই নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য চরম অভিশাপ। আধুনিক যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলাবারুদ, মিসাইল ও ড্রোন হামলা বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। যুদ্ধট্যাংক ও সামরিক বিমানের কার্বন নিঃসরণ যেকোনো সাধারণ হিসাবকে হার মানায়। বোমার আঘাতে মৃত্তিকায় মিশে যাওয়া সীসা, ইউরেনিয়াম এবং মারাত্মক রাসায়নিক বর্জ্য মাটির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট করে দিচ্ছে।

আমাদের বুড়িগঙ্গা বা কর্ণফুলীর মতো নদীগুলো আজ কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যে মৃতপ্রায়। কৃষিকাজে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সরাসরি খালবিলে পড়ে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের রূঢ় বাস্তবতায় মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশগুলো আজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সমস্যাগুলো জানা থাকলেও সমাধানে আমাদের চরম অনীহা। পরিবেশ বাঁচানোর দায় শুধু সরকারের নয়। পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজের ঘর থেকে। প্লাস্টিকের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামানো, বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় রোধ এবং গাছ লাগানোর মতো ছোট অভ্যাস বড় প্রভাব ফেলতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ডাইনোসর বিলুপ্ত হলেও পৃথিবী নিজেকে ঠিকই সারিয়ে তুলেছে। পরিবেশ ধ্বংস করলে মানবজাতিই বিলুপ্ত হবে, পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মে সেজে উঠবে। তাই শুধু একদিনের পরিবেশ প্রেমী না হয়ে, অস্তিত্ব রক্ষায় আসুন প্রতিদিন নিজেদের বদভ্যাস গুলো বদলাই।

লেখক : শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। পরিবেশবাদী লেখক, সংগঠক ও কলামিস্ট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন