ভাগ্য বলি কারে! কুকুরটি মরেও অমর হয়ে রইলো। শেষ পর্যন্ত কুকুরটির মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ভাগ্য কাকে বলে! একেই বলে ঠেলার নাম বাবাজি! দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলীয় জেলা বাগেরহাটের ঘটনা। প্রায় পাঁচশত বছরের পুরোনো বাগ কেটে জনপদ গড়ে ওঠা বাগেরহাটের খানজাহান আলী মাজারের দক্ষিণ পাশের দিঘিতে বেঁচে থাকা একমাত্র কুমির ধলা পাহাড় একটি অসহায় কুকুর এবং তাকে নিয়ে কুমির নামক জম ও জীবনের টানাটানির কাহিনি। কুকুরটির নিঃসন্দেহে বলতে হবে দুর্ভাগ্য এবং খানজাহানের দিঘির কুমিরের বর্তমান খাদ্য গ্রহণের রুচির চিত্র এটি। এক সময় ধর্ম অন্ধ মানুষ মান্নত করত যেকোন ব্যাধি নিরাময় হলে খানজানের মাজারে ছাগল কিংবা হাঁস মুরগি দিত। মাজারের খাদেমরা সারাদিন যা উপঢৌকন পেতো তা থেকে দু’চারটে ধলা পাহাড় এবং কালাপাহাড় নামক কুমিরদের ডেকে তাদের আহারের জন্য দিঘির পানিতে নিক্ষেপ করতো। সে দৃশ্য ওই মাজারে আসা শ’ শ’ দর্শনার্থীরা দারুণ আগ্রহে উপভোগ করতো।
প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো খানজাহানের মাজার এবং মাজার সংলগ্ন দিঘি, আবার ষাট গম্বুজ মসজিদ এবং ঘোড়া দিঘি এসব নিয়ে অনেক কথা আছে। কেউ কেউ বলেন, জিনদের সহযোগিতা নিয়ে শাসক পীর খান জাহান আলী এসব দিঘি খনন করেছিলেন। স্থাপত্য শিল্পগুলো আমাদের এই অঞ্চলে তৎকালীন শাসকদের জনহিতকর বহু স্মৃতি কীর্তির স্বাক্ষর বহন করে। তাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সে সব প্রসঙ্গ পরে বলবো। আজকের প্রসঙ্গ খানজাহানের মাজারে কর্তৃপক্ষের ভাষায় আতঙ্কগ্রস্ত কুকুরের উপস্থিতি এবং খাদ্য অভাবে বুভুক্ষু কুমির ধলা পাহাড়ের ওই কুকুর ভক্ষণের একটি হৃদয়বিদারক ছবি। গুজব সৃষ্টিকারীদের মতে, ইতরামি করে একটি কুকুরকে খানজাহানের দিঘিতে নামিয়ে দিয়ে ক্ষুধার্ত কুমিরকে দিয়ে ভক্ষণ করানোর কৌতূহল উদ্দীপক ছবি সারা দেশে ভাইরাল হয়েছে। কাহিনিটি ডালপালার গুজব ছড়িয়ে শেষ পর্যন্ত একটি হৃদয়বিদারক রূপ পরিগ্রহ করে। সেখানে বলা হয়, রুচির কী দুর্ভিক্ষ! আগে মাজারে ধলা পাহাড় কালাপাহাড়ের খাদ্য ছিল হাঁস মুরগি এবং গৃহপালিত সুস্থ ছাগল। এখন তার রুচি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিশ্বস্ত প্রভু ভক্ত কুকুরকে তৈরি করা হলো ধলা পাহাড়ের গ্রাসের সামগ্রী হিসেবে।
জনমনে প্রশ্ন, ওই কুমিরদের বেঁচে থাকার জন্য ম্যান সম্মত দৈনিক কোনো খাদ্য বরাদ্দের ব্যবস্থা কি সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে আছে? কত ক্ষুধার্ত থাকলে একটি হিংস্র কুমির কর্তৃপক্ষীয় ভাষায় একটি জলাতঙ্কগ্রস্থ কুকুরকে খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করে! বিচিত্র দেশ বটে!
সর্বশেষ বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবর হচ্ছে সরকারি বয়ান। সেখানে কুকুরটিকে অসুস্থ এবং নিয়তির পরিহাস বলে দেখানো হয়েছে। আর খাদক কুমিরটিকে যেকোনো সময় আক্রান্ত হতে পারে সে উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
খবরটি একটু খুলে বলি। একটি অসহায় কুকুর। খানজাহান আলীর দিঘির ক্ষুধার্ত কুমির আর জনগণের দৃষ্টি উপভোগের কাহিনি বেশ কিছুদিন যাবৎ নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এ সম্পর্কে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন একটি সুশৃঙ্খল সুন্দর মার্জিত বয়ান দিয়েছেন। ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য/মাজারে কুমিরের আক্রমণে মারা যাওয়া কুকুরটি জলাতঙ্ক রোগে ভুগছিল।’ সত্যিই বায়ানটি খুব সুন্দর। একেই বলে সঠিক তদন্তের দেশ বাংলাদেশ! একটি হতভাগ্য কুকুরের বাহ্যিক জীবন ট্র্যাজেডি পরে যে সারাদেশের মানুষের উৎসুক্যের দিক গুলোকে স্পর্শ করবে তা বুঝে উঠা যায়নি।
বাগেরহাটের খানজাহানের মাজারের পাশের দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে মারা যাওয়া কুকুরটির ভাগ্য এতই রাজকীয় যে তার মৃত্যুর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। বলা হয়েছে, সরকারি বয়ান অনুযায়ী : বাগেরহাটের শাসক পীর খান জাহান আলী রহমাতুল্লাহ-এর মাজার সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে মারা যাওয়া কুকুরটি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত ছিল। যাদেরকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দংশন করেছে প্রত্যেকেই জলাতঙ্ক রোগের উচ্চতর ঝুঁকিতেই আছেন। সরকারি বয়ানে বলা হয়েছে, কুকুরটিকে ইচ্ছে করে কুমিরের মুখে দেওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের করা তদন্ত প্রতিবেদনে এ ধরনের তথ্য উঠে এসেছে। ১৬ই এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার তিন সদস্য বিশিষ্ট ওই কমিটি একটি স্বচ্ছ প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে দাখিল করেন।
১৮ এপ্রিল ২০২৬ বিকেলে মাজারের প্রধান ঘাট থেকে একটি কুকুরকে মুহূর্তে শিকার করে নিয়ে যায়, দিঘিতে থাকা একমাত্র কুমির ধলা পাহাড়। কুকুরকে আস্তে আস্তে কুমিরের গ্রাসের শিকার হওয়া ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশ জুড়ে উষ্ণ আলোচনার ঝড় বয়ে যায়। কুকুরের মৃত্যুর কারণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের সত্যতা জানতে বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আতিয়া খাতুনকে প্রধান করে জেলা প্রশাসন ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি গঠনের দুইদিন পর ১১ এপ্রিল ২০২৬ বিকেলে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে মাজার এলাকায় কুকুরের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্তের পর কুকুরটির মাথাটি ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সংক্ষেপে সিডি আইএল) পাঠানো হয়। গত ১৫ এপ্রিল বুধবার জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ ঢাকায় পাঠানো কুকুরের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট টি হাতে পায় এবং রিপোর্টটি বর্ণনা করেছে, কুকুরটি জলাতঙ্ক রোগে ভুগছিল। বাগেরহাট জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা সাহেব আলীর কথা সি ডি আই এল এর (অর্থাৎ সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরি) থেকে পাওয়া ময়না তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী কুকুরটি জলাতঙ্ক রোগে ভুগছিল। কুকুরটি যাদের দংশন করেছে তারাও জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে কুকুর দ্বারা আক্রান্ত যাদের সাথে কথা হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই ভ্যাকসিন নিয়েছেন। কুকুরকে আক্রমণ করা কুমির জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চতর ঝুঁকিতে রয়েছে কিনা জানতে চাইলে মোহাম্মদ সাহেব আলী বলেন, “কুমিরের আসলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নেই। কারণ কুমির হিংস্র প্রাণী তাই তার জলাতঙ্ক আক্রান্ত হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই।
তিনি জানান, তবে যে সব মানুষকে ওই কুকুর দংশন করেছে তাদেরকে টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিয়া খাতুন বলেন, “ঘটনা স্থল পরিদর্শন, তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ এবং অধিকতর তদন্ত শেষে আমরা জেলা প্রশাসনে রিপোর্ট জমা দিয়েছি। বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে কুকুরকে ইচ্ছা করে কুমিরের মুখে দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কুকুরটি দুর্ঘটনাবশত দিঘির পানিতে পড়ে যায়। কুকুরটি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত ছিল। মাজারের নিরাপত্তা প্রহরী ফুরকান টিকা নিয়েছে তাও হাসপাতালে তদন্তে পাওয়া গেছে।”
এ ধরনের ভাষ্যের পর অভিযোগগুলো বেকসুর খালাস হওয়া ঠিক। তবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ওই কুকুর যাদেরকে দংশন করেছে তাদের একজনেরও নাম কিংবা সাক্ষাৎকার এই তদন্তে পাওয়া যায়নি। আরো মজার ব্যাপার ঐ কুকুরটি ইচ্ছাকৃতভাবে ওখানে কীভাবে গেল সে প্রশ্নটিও রয়ে যায়? প্রশাসনের তদন্তে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, সেখানে এই কুকুরটি সম্পর্কে এতদিন পর্যন্ত এলাকায় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করার হেতু কী? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল এই কাহিনিটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলে বোধ হয় সত্যিকার ভাবে মূল ঘটনা অর্থাৎ থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতো বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখানে যদি ইতি টানেন তাহলেও প্রশ্ন থাকে কুকুরটিকে কে বা কারা এতদিন পর পানির কাছে নিয়ে গেল? সেতো এর আগেও অনেক মানুষকে দংশন করে এলাকা ত্রাস সৃষ্টি করেছে! কোথায় যেন একটা ফাঁক রয়েই গেল! এখানে ইতি টানলাম।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

