বুধবার । ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ । ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ : বাঙালির শেকড় সন্ধানের মহোৎসব ও জাতিসত্তার পরিচয়

শেখ মাহবুব আলম

সময় বহমান, আর সেই সময়ের স্রোতে ভেসে আসে নতুনের আহ্বান। বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ শুধু একটি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, আর আত্মপরিচয়ের এক অবিনাশী মহাকাব্য। ২০২৬ সালে আমরা বাঙ্গালিরা যখন বাংলা সন ১৪৩৩-এর প্রথম প্রভাতকে বরণ করে নিচ্ছি, ঠিক তখনই আমাদের মনে পড়ে যায় সেই শিকড়ের কথা, যা আমাদের বাঙালি জাতিসত্তাকে টিকিয়ে রেখেছে শত প্রতিকূলতার মাঝেও। এটি এমন এক উৎসব, যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি বাঙালির হৃদস্পন্দনকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়।

বাংলা সনের প্রবর্তন এক অসাধারণ প্রশাসনিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানগত উদ্ভাবন। মুঘল সম্রাট আকবর যখন ভারত শাসন করছিলেন, ঠিক তখন ভূমি রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে একটি জটিলতা দেখা দেয়। সে সময় প্রচলিত ছিল হিজরি সন, যা চন্দ্রমাস ভিত্তিক। ফলে প্রতি বছর ফসল কাটার সময়ের সাথে খাজনা আদায়ের সময়ের মিল থাকত না। কৃষকদের এই দুঃখ ঘোচাতে সম্রাট আকবর তাঁর রাজ জ্যোতিষী আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে একটি নতুন পঞ্জিকা তৈরির নির্দেশ দেন।

১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সৌর ও চন্দ্র বছরের সংমিশ্রণে তৈরি হয় ‘ফসলি সন’, যা আজ আমাদের বাঙালিদের প্রিয় বাংলা সন। হিজরি ৯৬৩ সনকে ভিত্তি ধরে এই সনের গণনা শুরু হয়। বৈশাখ ছিল নতুন বছরের প্রথম মাস, কারণ এই সময়েই বাংলার কৃষকরা মাঠের সোনালি ফসল ঘরে তুলতেন। সম্রাটের সেই প্রশাসনিক সংস্কার আজ বাঙালির ঐতিহ্যের প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।

বাঙালির নববর্ষের সাথে জড়িয়ে আছে ‘হালখাতার এক অনন্য সংস্কৃতি। এক সময় গ্রামবাংলার হাট-বাজার থেকে শুরু করে শহরের গদিঘর পর্যন্ত সবখানে লাল রঙের কাপড়ে মোড়ানো খাতা খোলার ধুম পড়ত। ব্যবসায়ীরা গত বছরের বকেয়া মিটিয়ে গ্রাহকদের সাথে নতুন বছরের হিসাব শুরু করতেন। এটি কেবল পাওনা আদায়ের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং ছিল সামাজিক মেলবন্ধনের একটি মাধ্যম। মিষ্টিমুখ করানো, কুশল বিনিময় এবং বিশ্বাসের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপনই ছিল হালখাতার মূল উদ্দেশ্য। যদিও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় হালখাতার জৌলুস কিছুটা কমেছে, তবুও এর আবেদন বাঙালির হৃদয়ে এখনো অম্লান।’

পহেলা বৈশাখের প্রাণ হলো বৈশাখি মেলা। গ্রামের বটতলায় বা নদীর তীরে বসা এই মেলাগুলো যেন বাংলার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রদর্শনী। মাটির পুতুল, বেতের ঝুঁড়ি, শীতল পাটি, আর বাঁশের বাঁশি— সবই যেন শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। নাগরদোলায় চড়ে শিশুর হাসি আর বাতাসা-মুড়লি-খয়ের গন্ধে মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। মেলায় শুধু কেনা-বেচা হয় না, এখানে মিলিত হয় সাধারণ মানুষের মন। কবিগান, যাত্রাপালা আর লাঠি খেলার আয়োজন গ্রামীণ জনপদকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

শহরকেন্দ্রিক নববর্ষ উদ্যাপনে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ এখন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হওয়া এই পদযাত্রা আজ ইউনেস্কোর ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃত। নানা রঙের মুখোশ, বিশালাকার পাখি আর লোকজ মোটিফের মাধ্যমে সমাজ থেকে অন্যায় ও অশুভ শক্তিকে দূর করার প্রার্থনা জানানো হয়। এটি প্রমাণ করে যে, বাঙালির সংস্কৃতি শুধু উৎসবের নয়, বরং প্রতিরোধের এবং সত্যের পথে চলার হাতিয়ার।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে পহেলা বৈশাখ পেয়েছে নতুন মাত্রা। রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুভেচ্ছার জোয়ার সবই যেন বাঙালিয়ানার নতুন বহিঃপ্রকাশ। পান্তা-ইলিশের স্বাদ গ্রহণ এখন কেবল একটি রীতি নয়, বরং নিজের শেকড়কে ছুঁয়ে দেখার একটি আকুতি। শহর ও গ্রামের এই মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে, বিশ্বায়নের যুগেও বাঙালি তার নিজস্বতাকে হারায়নি।

পুরাতন বছরের জরা, গ্লানি আর দুঃখকে ধুয়ে মুছে দিয়ে নতুনের আবাহন করাই হলো বৈশাখের মূল মন্ত্র। বিগত বছরগুলোতে আমরা অনেক চড়াই-ওতরাই পার করেছি। কিন্তু প্রতিটি বৈশাখ আমাদের শেখায় ঘুরে দাঁড়াতে। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই ভোরে আমাদের অঙ্গীকার হোক— হিংসা, বিদ্বেষ আর সংকীর্ণতা ভুলে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তোলা।

আমাদের পূর্বপুরুষরা যে ঐতিহ্যের মশাল জ্বালিয়ে গেছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির যে অমোঘ শক্তি, তাই হোক আমাদের উন্নয়নের চালিকাশক্তি।

পহেলা বৈশাখ আসে আমাদের মনে করিয়ে দিতে যে— আমরা বাঙালি। এই পরিচয়টি আমাদের গর্বের, আমাদের অহংকারের। বাংলা সনের এই নতুন প্রভাত প্রতিটি ঘরে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ ও সমৃদ্ধি। মেঠো পথের ধুলো আর বৈশাখি ঝড়ের মাঝে আমরা যেন খুঁজে পাই আমাদের আত্মিক শান্তি। আসুন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আমরাও গেয়ে উঠি :
‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো ’
‘শুভ নববর্ষ ১৪৩৩’

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন