বুধবার । ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ । ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩

বৈশাখী বাতায়নে বসেছি সংগোপনে

মিনু মমতাজ

আমার জন্ম ষাট দশকে। ৭০ দশকের মুক্তিযুদ্ধ যেমন প্রত্যক্ষ করেছি তারও আগে পাকিস্তানি আবহাওয়ায় ইংলিশ মিডিয়ামে ফাতিমা হাই স্কুলে পড়াকালীন সময়ে উর্দুভাষী সহপাঠীদের সঙ্গে প্রচুর ওঠাবসাও করেছি। উপরন্তু মিশনারি স্কুলের বদৌলতে ইতালি থেকে আগত সিস্টার, মাদার, ফাদারদের প্রভাবও আমার পর কিছু কম ছিল না, যার কারণে দিনগুলো ছিল বৈচিত্র্যমুখর। সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলির মতো।

অন্যদিকে আমার পরিবার অনেকটাই ভারতীয় কায়দায় চলতো। বাবা বীরভূম মা নদীয়া। অতঃপর মামা খালাদের আগমনে একান্নবর্তী পরিবারের ছত্রছায়ায় শরৎ বাবুর গল্প উপন্যাসের মতো আমরাও বেশ হইচই করেই দিন কাটাতাম।

মনে পড়ে, আমি যখন ক্লাস ফোর ফাইভে পড়ি, তখন আমার একবার পক্স হয়েছিল। তখনকার আমলে মুরুব্বিরা পক্স হলে চারিধারে নিমপাতা দিয়ে তাকে পৃথক বিছানায় শুইয়ে রাখত। আমাকেও সেভাবে শুইয়ে রাখা হলো। ভাগ্যক্রমে সেই ঘরে আমাদের পারিবারিক লাইব্রেরিটি ছিল এবং আমার কাছেই ছিল বইয়ের আলমারিগুলোর চাবি। ছোটদের তখন যেকোনো বই পড়তে দেওয়া হতো না। নভেল নাটক তো দূরের ব্যাপার।

সবাই ভাবলো মিনু অসুস্থ। ওকে ডিস্টার্ব করা যাবে না। মাঝেমধ্যে অবশ্য মা অথবা কেউ এসে একটু দেখাশোনা করে যেত। ব্যাস, সেই সুযোগে জীবনের সবচাইতে বিস্মিত এবং আবেগমথিত জগৎ আমার সামনে খুলে গেল। আমি যেন বিশাল এক জ্ঞানের সমুদ্রে ডুব দিলাম। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র, জরাসন্ধ, নীহার রঞ্জনগুপ্ত, আশুতোষ, বঙ্কিমচন্দ্র, যাযাবর, শীর্ষেন্দু, আশাপূর্ণা দেবী, বিমল মিত্র, শামসুর রহমান, ফররুখ আহমেদ, বেগম রোকেয়া প্রমুখ লেখক লেখিকাদের লেখার সঙ্গে একদিকে যেমন পরিচিত হয়ে উঠলাম অন্যদিকে আমার চেতনার জগৎ যেন অভূতপূর্ব এক অনাবিল আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। মনে হলো জীবনে আমি যেন এক রত্নের খনি আবিষ্কার করেছি।

অদ্ভুত সেই উপলব্ধি মহা সমুদ্রের আহ্বানের মতো আমায় প্রতিনিয়ত জ্ঞানের মহাসমুদ্রে আহ্বান করতে লাগলো যা আজও আমায় প্রচণ্ডভাবে তাড়িত করে। আমার মনো জগৎকে বিচিত্র রঙে, বৈভবে, গভীর চিত্তমনস্কতায় দেখতে শেখায়।

সেই ৬০ দশক থেকে এই ২০২৬ পর্যন্ত বিচিত্র আঙ্গিকে, অন্তহীন ভাবনায় আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বর্ণ বৈচিত্রে, সংঘাতে, বিক্ষোভে, সম্ভাবনা-সংকটে, অভূতপূর্ব ঘূর্ণিপাকে যেন বেঁধে রাখলো। দেখতে শেখালো জীবন, পরিবেশ, মানুষ, মনুষ্যত্বের সংকট, স্বার্থপরতা, দেশদ্রোহিতা, মানবিক বিপন্নতা প্রভৃতি। দেখার যেন কোনো শেষ নেই।

অন্তহীন এই দেখার অলি গলির অন্ধকার আমায় যেন প্রতিনিয়ত আঘাত করলো। জটিল প্রশ্নগুলো কেবলই ধাক্কা দিল মনের গভীরে। প্রশ্নবিদ্ধ করলো বিবেককে,
আমি আগে মানুষ, না আগে আল্লাহর বান্দা? আমি আগে বাঙালি না বাংলাদেশি?

আমার পিতা প্রবীণ আলোক চিত্র শিল্পী মোহাম্মদ রফিক সেই ৪৭ এর দেশবিভাগের পর খুলনায় চলে আসেন। তিনি ব্রিটিশ শাসন আমল দেখেছেন, রক্তাক্ত রায়টে হিন্দু মুসলিম সংঘাত দেখেছেন, ভারতীয়দের দেশপ্রেম আর বাংলাদেশিদের দুর্বল চরিত্র দেখেছেন।

দাউ দাউ আগুনের বীভৎস হিংসা আর স্বার্থের হীনম্মন্যতার মধ্যে দিয়ে খুলনা মহানগরীর হাদিস পার্কে (আগে গান্ধী পার্ক বলা হতো) একদিন তিনি ভাগ্যান্বষনে রিফিউজি নাম কিনেছিলেন। সেই গন্ধ তিনি বহুকাল বয়ে বেরিয়েছেন। তারপরেও এদেরকে ভালোবাসতে চেয়েছেন। আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন বাংলার মাটিকে। কোন বাংলা? ভারতের পশ্চিমবঙ্গকেও বাংলা বলা হয়। আমার পিতার মতো যারা সব খুইয়ে ভারত থেকে শূন্য হাতে বাংলাদেশে এসে এ দেশকে আপন করতে চেয়েছেন তারা তো বাংলা বলতে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্টি কালচার সমৃদ্ধ জীবনকেই বোঝেন। এদেশের পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক জীবন তারা কিছুতেই বুঝতে পারেন না। পারেন না ইসলামের তওহীদি জীবন, পবিত্র ফজরের আযান, আর নামাজের সেজদারত কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিঃশব্দ আকুতি।

সেই ৭০ দশকে আমাদের কয়লাঘাটের মোড়ে অবস্থিত পূজা মণ্ডপের সামনে বেশ বড়সড় বৈশাখী মেলা বসতো, আর বসতো তারেক পুকুরের মোড়ে যাকে এখন শান্তিধামের মোড় বলা হয়। এই দুই স্থানেই ছোটবেলায় আমি যাওয়ার জন্য কান্না করতাম। ঘাড় নাড়ানো বুড়ো, চরকা, মাটির সুন্দর সুন্দর ছোট ছোট পুতুল, বর বউ, চানাচুর, পাঁপড়ভাজা, দেলবাহার, আমসক্ত, মোয়া, গজা, চিনির সুতো দিয়ে ঝুলানো আম জাম, ঘুঙুর পায়ে ঘটি গরম চানাচুর, মুড়ি মশলা, বায়োস্কোপ দেখা প্রভৃতি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই। কিছুই তো ভুলিনি। কিছুই তো হারাইনি অথচ এখন পহেলা বৈশাখ নিয়ে গুঞ্জনের শেষ নেই। বাংলার হালখাতার প্রাচীনতম ঐতিহ্যও এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

বেশ কয়েক বছর আগে রূপসা নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠ চক্রের এক বৈশাখী অনুষ্ঠান বেশ জাকঁজমক করে হচ্ছে। ইসলামী দলের সাহিত্যমনা কয়েকজন সাহিত্যকর্মী উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য মতাদর্শের নব্য কিছু হেদায়েতপ্রাপ্ত সাহিত্য সাংস্কৃতিক বর্ষীয়ান কর্মীও তাদের চোখমুখ ঢেকে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আমার জানামতে ষাটোর্ধ্ব মহিলাদের অত কঠোর পর্দা না করলেও চলে। যাই হোক, এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। সব ধরনের লেখক লেখিকাদের নিয়েই নন্দিনীরা চলতে চেষ্টা করে। যার প্রেক্ষাপটে উক্ত বৈশাখী অনুষ্ঠানের খেলায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় পুরস্কার পর্যন্ত তুলে দিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী সবার জন্যই উপহারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কারণ কথিত আছে পুরস্কারের এই শ্রেণিকরণে যারা পুরস্কার পায় না তাদের মনঃকষ্টের প্রতি সমবেদনায় নাকি ইসলাম খেলাকেই নিরুৎসাহিত করেছে। বিষয়টি ভালোভাবে আমি জানি না তবে এভাবেই শুনেছি।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে তাহলে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজাল্ট না দিয়ে একচেটিয়া পাস করিয়ে দিলেই তো ভালো হয়। কারো মনে কোন কষ্ট হবে না।

বহুৎই চেষ্টা করা হয়েছিল সেই বৈশাখী অনুষ্ঠানটিকে শিরক মুক্ত রেখে নির্ভেজাল বিনোদনে উপস্থাপন করা। এসো হে বৈশাখ এসো এসো/মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি প্রভৃতি গানগুলো খালি গলাতেই গাওয়া হয়েছিল। পুরস্কারের ব্যবস্থা বাতিল করে সবাইকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। পুতুল, মূর্তি, ছবি অর্থাৎ বিতর্কিত কোনো উপহারও কেনা হয়নি। অনুষ্ঠানের শুরুতে কিরাত আর অনুষ্ঠানের শেষে মোনাজাত করে পুরাতন বছরের ভুল ত্রুটির জন্য মহান আল্লাহপাকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা হয়েছিল। যদিও এতে শেষ রক্ষা হয়নি। মিনু আপা কেন পয়লা বৈশাখ করল? এটা বেদাত এবং অইসলামিক। মানুষটাকে এটা মানায় না।

ভাবতে ভারী অবাক লাগে, ইংরেজি বছরের ৩১ংঃ উবপবসনবৎ পবষবনৎধঃরড়হ, বাংলা বছরের পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন, জন্মদিনে কেক কাটা, একুশের পুষ্প স্তবক অর্পণকে বেদাত বলে আখ্যায়িত করে কোন সংস্কৃতির মধ্যে আমরা আমাদের জাতীয় চেতনাকে উজ্জীবিত করব। বিশ্বজনীন সত্যকে অস্বীকার করে জাতীয় উন্নয়ন কখনো হয় না। তাই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়েই নিজস্ব অস্তিত্ব গঠন করতে হবে।

মা ১৯৯৩ সালে মারা গেলেন। বাস্তবতার ধাক্কায় সেই সময় থেকেই কঠিন মাটিতে পা রাখতে হয়েছে। সে বিরূপ সময়ে আল্লাহর স্মরণ থেকেও যেন মা-কে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছি অনেক বেশি। দৌড়ে গিয়েছি ইসলামী স্কলারদের কাছে, আকুল হয়ে বলেছি,‘ভাই কী করব? পেশা, সংসার, সাংস্কৃতিক অঙ্গন ইত্যাদি করতে করতেই তো সময় চলে গেল। মার জন্য তো কিছুই করা হলো না। এখন মার জন্য কী করি?

সবাই বলল, নামাজ পড়ে দোয়া কর। সেই সঙ্গে আরও একটু যুক্ত হলো, হিজাব ছাড়া কিন্তু নামাজ কবুল হবে না। বলতে গেলে মার জন্যই নামাজ পড়ার স্বার্থে হিজাব ধরতে হলো। আল্লাহর সন্তুষ্টি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তার চাইতে সত্য কিছু নেই। তখনও সেই মর্মে নিজেকে পুরোপুরি ধাতস্থ করতে পারিনি তবু আপাদমস্তক সাংস্কৃতিক ঋদ্ধ মিনু মমতাজকে হিজাব বা বোরখা ধারণ করতে হলো। আল্লাহর সেই আলোক উজ্জ্বল পথে খুলনার এক ইসলামীমনস্ক মহান বুদ্ধিজীবী আমায় বললেন, ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে, এমন পোশাক পরেছ কেন? তোমাকে কি এটা মানায়?’

মানায় কী মানায় না সেটা ভেবে দেখিনি তবে স্বর্ণপদক বিজয়ী সাংস্কৃতিক খ্যাতিতে চৌচির মানুষ মিনু মমতাজকে ঢোকে ঢোকে পানি খেতে হয়েছে। কখনও লম্বা হাতা ব্লাউজ, মাথায় শাড়ির আঁচল। কখনো বা মাথায় বড় ওড়না, কখনো বা গাউনসহ স্কার্ফ, শেষমেষ সহজ উপায় ঘোরতর কালো বোরখা। সংগীত প্রিয় সাংস্কৃতিক অঙ্গন বিসর্জনসহ সাহিত্য অঙ্গনকে আঁকড়ে ধরা। নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া পাবলিক ফাংশন থেকে। অনাকাক্সিক্ষত পুরুষদের ভিড়ভাট্টা থেকে। গ্যাঞ্জাম ফ্যাসাদ থেকে। তারপরও সংগীতের সুর, বাউলের একতারা, ক্লাসিক্যাল নৃত্য, গণসংগীত, গীতিকার সুরকারের সৃজনশীলতা, কলেজের সাংস্কৃতিক সপ্তাহের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারিনি। বলতে পারিনি, ‘আমি পারবো না’। প্রসঙ্গত আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন সহকর্মী অধ্যাপিকা সুরাইয়া বেগম খুলনা বেতারের প্রথম কণ্ঠশিল্পী, নাটকের নায়িকা, আবৃত্তিকার, অভিনয় শিল্পী প্রভৃতিতে তৎকালীন সময়ে সাড়া জাগানো এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, তিনিও খানিকটা আমারই মতো সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ডিগবাজি খেয়ে নন্দিনী- বনলতা -লেখিকা সংঘসহ সব কালচারাল অঙ্গনকে বিদায় জানিয়ে হজব্রত পালন করে তসবির মালা জপতে জপতে চুপি চুপি আমায় বলল, “মিনু, তুমি আমার হারমোনিয়ামটা নিয়ে যাও। ও শয়তানের বাক্স আমার ঘরে আমি আর রাখবো না। ও আমি কুড়াল দিয়ে কাট বানিয়ে চুলায় জ¦ালিয়ে দেব।” আপা “আস্তাগফিরুল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ” পড়তে লাগলেন। আমি যেহেতু আপার মতো অতটা ডিগবাজি খাইনি, তাই পরের দিনই হারমোনিয়ামটা নিয়ে এসে মেরামত করিয়ে রূপসা নন্দিনীদের হারমোনিয়ামের সংকট মিটিয়েছিলাম। ঊর্ধ্বাকাশে তাকিয়ে ভাবলাম! হায়, ছোটোবেলায় লতা মঙ্গেশকরের মতো সংগীত শিল্পী হতে চেয়েছিলাম। দশ বছর নাড়া বেঁধে ওস্তাদ আব্দুল মালেক চিশতী এবং ওস্তাদ সাদতকি স্যারের কাছে রাগসঙ্গীতে পারদর্শী হয়েছিলাম, সবই বুঝি ভস্মে ঘি ঢালা হলো।

বিখ্যাত জিহ্বা কবিতার কবি হাসান মাহমুদ একবার আল্লামা কামাল উদ্দিন জাফরী হুজুরকে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আচ্ছা স্যার, “গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ আমার মন ভুলায় রে” এ গান গাইলে অসুবিধা কোথায়? এ ধরনের গান গাওয়াও কি হারাম? জাফরি হুজুর অত্যন্ত হাসিমাখা মুখে বলেছিলেন, তা হবে কেন? যে সংগীতের মধ্যে শিরক, অশ্লীলতা, নেশা এবং নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা থাকে না, সুস্থ বিনোদনের জন্য কল্যাণমুখী সংগীত ইনশাল্লাহ গাওয়া যাবে।

এ ধরনের কথোপকথন আমাদেরকে উৎসাহিত করে, সাংস্কৃতিক চর্চায় আমাদের এগিয়ে দেয়। যদিও কিছু অস্বস্তি, কিছু অসংগতি, কিছু বিব্রতকর পরিস্থিতি আজও আমাদেরকে পেছনের দিকে টেনে ধরে।

মেয়েদের পায়ে পায়ে দোষ। সেইখানে সম্মিলিত সমাবেশে কিছু সৃষ্টিশীল কার্যক্রম করতে গেলে তাদের অত সহজে কেউ ছাড় দেয় না। বিভিন্নভাবে মেয়েরা বিঘ্নিত হয়। সচিব পর্যায়ের একজন বুদ্ধিজীবী অনলাইন থেকে লিখলেন, “মিনু আপা নিজেরা নিজেরাই অনুষ্ঠান করবেন, আপনাদের অনুষ্ঠানে আমাদের ডাকবেন না? ডাকার হলে মেয়েরা ডাকবে, না ডাকলে অযাচিতভাবে এ উক্তির কী প্রয়োজন?”

বাংলাদেশ একটি রক্ষণশীল ধর্মীয় চেতনায় সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাঁচতে চায়। সেজন্য নারী শিক্ষা/নারী উন্নয়ন প্রেক্ষিত পরিবেশ ও মানসিকতা তৈরির ক্ষেত্রে জাতীয় ভাবনায় পুরুষদের এগিয়ে আসতে হবে।

পরস্পর ভাব বিনিময়, সমঝোতা এবং আন্তরিকতা কে পাশ কাটিয়ে তসলিমা নাসরিন মার্কা নারী সংস্কৃতির বলয় থেকে বেরিয়ে প্রকৃত মূল্যবোধে নারী-পুরুষ উভয়কেই সচেতন হতে হবে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, উপজাতিসহ সব ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণির জন্য রক্ষণশীলতা আমাদের জাতীয় চেতনার অংশ হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। তাই পহেলা বৈশাখে সুস্থ বিনোদন, আচার অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার নতুন নতুন আঙ্গিক নির্মাণ করা একান্ত দরকার।

বিশ্বের ভাষাভিত্তিক একমাত্র দেশ বাংলাদেশ। বাংলা ভাষার জন্য আমরা বিশ্ব নন্দিত। একুশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গর্বিত জাতীয় পতাকা, সুদীর্ঘ ৫০ বছরের উত্থান পতনের রক্তাক্ত ইতিহাস সবই আমাদের। জুলাই আগস্টের অর্জন আমাদের হৃদয়ের এবং বিবেকের দ্বার উদ্ঘাটন করে। দৃষ্টির প্রসারিত অঙ্গনে প্রস্ফূটিত করে হাজার গোলাপ। মুগ্ধ, আবু সাঈদ, পোড়া দালানের সেই ঝুলন্ত ছোট্ট শিশুর প্রতি অঙ্গীকার এদেশের সকলের। সকলের প্রতি সম্মান এবং সহনশীলতার মাঝেই আসবে প্রকৃত বিজয়। হাজার বছরের পথপরিক্রমায় হাঁটছে বাঙালি। যুদ্ধ করছে বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা।

বাংলাদেশের কৃষ্টি কালচারের উপর ভারতের যাচিত বা অযাচিত প্রভাব আজকের নয়। বাংলাদেশ জন্মেরও আগে। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও সংগীত এদেশের সংস্কৃতিমনা জনগণের মানসিকতায় এখনো ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

খুব ছোটবেলায় দেখেছি খুলনা মহানগরীর উল্লাসিনী, সোসাইটি ও পিকচার প্যালেস সিনেমা হলগুলোতে ছবি প্রেমিক অজস্র দর্শকের ঢল। বিশেষ করে ন’টা-বারোটা শো-এর সিনেমায়। জুটি শবনম, রহমান, জেবা, মোহাম্মদ আলীর সিনেমা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতাম। নূরজাহান, রুনা লায়লার গান শুনতাম। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীনের পর ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ‘আলোর মিছিল’, ‘জীবন থেকে নেওয়া’, প্রভৃতি সিনেমাগুলো আমার চেতনায় সাতরঙা রংধনু মতো বিচিত্র আলো জে¦লে দিত। খুলনার খালিশপুর এ অবস্থিত নেভিদের হলে দেখানো ভারতীয় বাংলা ছবি হারানো সুর, সাগরিকা, গৃহদাহ, রামের সুমতি, মায়ামৃগ, বসু পরিবার, পৃথিবী আমারে চায়, চাপা ডাঙার বউ, ইন্দিরা, বিপাশা, তাসের ঘর প্রভৃতি সিনেমাগুলো আমার চেতনার গভীর প্রদেশ ছুঁয়ে যেত। সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশের নাট্য জগৎ, সাহিত্য, চলচ্চিত্রও কম জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।

সূর্যদীঘল বাড়ি, পিচ ঢালা পথ, নীল আকাশের নিচে, অবুঝ মন, জননী, মনের মতো বউ, অধিকার, সাত ভাই চম্পা, ময়নামতিসহ বহু বাংলাদেশের ছবি আমাকে বিমোহিত করেছে। এমনকি ভারত বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগেও বহু ছবি নির্মাণ হয়েছে। হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিনিময় সর্বাপেক্ষা তুঙ্গে ছিল। ফলশ্রুতিতে দুই দেশের ভিন্ন ভিন্ন কালচার আমে দুধে মিলেমিশে একাকার হতে দেখেছি, যা মনোমুগ্ধকর হলেও স্বাস্থ্যকর নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারকহীন এইসব প্রচারমাধ্যমগুলো দেশের জাতীয় চেতনায় বিজাতীয় প্রভাব ফেলেছে যার কুফল অনস্বীকার্য।

ইদানীং বিয়ে বাড়ি, বাসর শয্যা, ভিডিওতে গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে সব ধরনের সামাজিক সাংস্কৃতিক উপস্থাপনায় ভারতের কালচার পরিলক্ষিত হয় যা বাংলাদেশের অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নয়।

অপরপক্ষে মুসলিম প্রবক্তারা পর্যন্ত আলেমদের বহু পুরাতন গতানুগতিক বয়ান নির্ভর প্রচারণার অন্তঃসারশূন্য মানোত্তীর্ণ সাংস্কৃতিক প্রবাহ বাংলাদেশের মাটিতে জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টায় প্রবলভাবে রত রয়েছেন। বাংলাদেশের প্রকৃত চেতনার সাথে যা মোটেও যায় না। একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে বাদ্যযন্ত্র ছাড়া সংগীত পরিবেশিত করার পথকে আমি স্বাগত জানাই কিন্তু বাংলাদেশের মূল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বাউল, ভাটিয়ালি, রবীন্দ্র- নজরুলগীতি, লালনগীতি, হারানোদিনের গান প্রভৃতি যা বাংলাদেশের জনসাধারণের আত্মার খোরাক জোগায়, তা পাশ কাটিয়ে কেবল জিহাদী তওহিদী জনতার হুংকার দিয়ে এ দেশের মাটির গন্ধকে রাতারাতি বদলে দিতে চাইলে তা পঙ্গুর গিরিশৃঙ্গে আরোহণ বৈ আর কিছুই হবে না। এমনকি তৎকালীন সময়ে রসুলে করিম সাঃ এর ইসলাম প্রচারকে সংগীতের নামে কিছু অশ্লীল নৃত্য- গীত পটীয়সী নর্তকী নারীদের দ্বারা কাফেররা উত্ত্যক্ত করত সেটা অবশ্যই বর্জনীয়। কিন্তু তার পাশাপাশি তৎকালীন সময়ের মাটির কাটার গান, তৌহিদ গান, গজল, বংশ-পরম্পরা স্তুতিমূলক গান যা হরহামেশাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহিসালামের সময় প্রচলিত ছিল তা তিনি নিষেধ করেননি। সেসব গান বাদ্যযন্ত্র সহকারেই প্রচলিত ছিল যা এখনো সুস্থ বিনোদন ও উদ্দীপনামূলক সংগীত হিসেবে প্রয়োজনের দাবি মিটায়।

হারমোনিয়াম সংগীতের একটি মৌলিক বিষয় যা বিশ্বব্যাপী সংগীত সাধনার প্রয়োজনীয় উপকরণ। অথচ এ বিষয়ে জ্ঞানহীন, বকলম কিছু ইসলামী শায়খবৃন্দের হাস্যকর বয়ান আমাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে। ইউটিউবে প্রচারিত এক ইসলামী জলসায় এক মহান শায়খ বলছেন, “সারেগামাপাধানির মধ্যে সা-রে একজন মেয়ে, গা-মা একজন পুরুষ আর পা-ধা-নি হলো অবৈধ সম্পর্ক। আহা!”

অপরপক্ষে যারা আমাদের শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, নাট্য নিকেতন, চলচ্চিত্র নির্মাতারা, তাদের অধিকাংশ আবার কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান রাখেন না। ফলে সকল পরিশ্রমই পণ্ডশ্রম ছাড়া আর কিছুই হয় না। এহেন দুই পক্ষের অদৃশ্য যুদ্ধের অহংকারে বাংলাদেশের জাতীয় চেতনা খান খান হয়ে ভেঙে পরছে। এর সমাধান সুদূর পরাহত। গায়ের জোরে কিছু হয় না। ধৈর্য, অনুশীলন, আন্তরিকতা, পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা, দক্ষতা, প্রচেষ্টা প্রভৃতি বিষয়গুলি যতদিন আমরা অনুধাবন করব না ততদিন এভাবেই চলতে থাকবে। পরিবর্তন এবং বিবর্তন এক কথা নয়। ফুলের কুড়ির কাছে বন্দুক ধরে হাজারবার যদি বলা হয়, তুমি ফোটো। সেকি ফুটবে?

স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও বাতাসে বারুদের গন্ধ। আকাশে ক্ষুধার্ত চিল। পদ্মা মেঘনায় রক্তের স্রোত। অনিশ্চয়তা, বিপন্নতা, স্বার্থের লুটপাট, কেবলই হাহাকার। কিছুই ভালো লাগে না।

নিঃশব্দ গভীর অরণ্যের মাঝে পয়লা বৈশাখকে উদ্যাপন করতে ইচ্ছে করে। মনের মধ্যে সেই গান গুঞ্জরিত হয় –
“ও মাঝি, বাইয়া যাও রে
অকূল দরিয়ায় মাঝি
আমার ভাঙা নাও রে মাঝি
বাইয়া যাও রে।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন