বুধবার । ১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ । ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩
পহেলা বৈশাখ ও আমাদের ঐতিহ্য

উৎসবের সূচনা, বিবর্তন ও বাঙালি জাতীয়তাবোধ

ফরহাদ হুসাইন

পহেলা বৈশাখ নববর্ষের এই দিনটি বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য, প্রাণের উচ্ছ্বাস ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক। ধানক্ষেতের সোনালি রং থেকে শহরের লাল-সাদা পাঞ্জাবি, মাটির হাঁড়ির ইলিশ থেকে রঙিন মঙ্গল শোভাযাত্রা— পহেলা বৈশাখ যেন বাঙালির হাজার বছরের লালিত সত্তার এক মূর্ত প্রতীক।

মোগল আমল থেকে চিরায়ত প্রাণ-

পহেলা বৈশাখের উৎসব একদিনে গড়ে ওঠেনি। ইতিহাস বলে, মোগল সম্রাট আকবর ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ নামে নতুন ফসলি বছর চালু করেন। কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। তখন থেকেই বাংলার প্রাণকেন্দ্রে নববর্ষ পালনের রীতি জন্ম নেয়। ‘হালখাতা’ অর্থাৎ নতুন খাতায় ব্যাবসায়িক হিসাব লেখা, দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন করে ব্যাবসা শুরু এসব চর্চা ছিল বাণিজ্যিক শহর ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও কলকাতার প্রাণ। কিন্তু সময়ের স্রোতে পহেলা বৈশাখ কেবল হিসাব-নিকাশের দিন নয়, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের দিনে পরিণত হয়।

চৈত্র-সংক্রান্তির প্রস্তুতি ও বৈশাখের প্রথম প্রহর-

বৈশাখ আসে আবির ও গানের রঙে। তার আগে চৈত্র মাসের শেষ দিনে চৈত্র-সংক্রান্তি উপলক্ষে ‘গাজনের উৎসব’ ও ‘চড়কপূজা’ গ্রামবাংলাকে দোলা দেয়। মানুষ পুরোনো ভুলে, জীর্ণতাকে পুড়িয়ে নতুনকে বরণ করে নেয়। পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা, পান্তা-ইলিশের আয়োজন আর মেহেদি-পানের আয়োজন যেন এক সাংস্কৃতিক জাগরণের সূচনা। গ্রামে গ্রামে জারি, সারি, ভাটিয়ালি গানের আসর বসে। বর্ষবরণের এই আয়োজন বাঙালিকে শুধু আনন্দ দেয় না, বরং ঋতুচক্রের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্কের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

পহেলা বৈশাখ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ : ছায়ানট থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-

আধুনিক প্রেক্ষাপটে পহেলা বৈশাখের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’। ১৯৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে ছায়ানট প্রথম নববর্ষের অনুষ্ঠান আয়োজন করে। পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর যখন আক্রমণ চলছিল, তখন পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে বাঙালির প্রতিরোধের অস্ত্র। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে এই দিনটি স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। এখন রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ (যা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে) সব মিলিয়ে পহেলা বৈশাখ বাঙালির হৃদয়ে এক অবিচ্ছেদ্য স্থান পেয়েছে।

পান্তা-ইলিশ, বউ-ভাত ও বৈশাখি আয়োজনে লোকজ ঐতিহ্য-

পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। খাবারের তালিকায় চিরায়ত পান্তা ভাত, ইলিশ ভাজা, ডাল, বেগুন ভাজা, চিংড়ি মালাইকারি এসব যেন বাঙালির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও নদীমাতৃক সংস্কৃতির আয়না। গ্রামীণ জনপদে ‘বউ-ভাত,’, ‘পুকুরে ভেলা ভাসানো’, ‘গরুকে ঘাস খাওয়ানো’, ‘বৈশাখী মেলা’র প্রচলন রয়েছে। বৈশাখী মেলায় নাগরদোলা, কাঠের খেলনা, মাটির জিনিসপত্র, পাটি-চাটাই, শীতলপাটি, বাঁশের তৈরি নানা উপকরণ সব মিলিয়ে গ্রামীণ শিল্প ও কারুকার্যের এক সমৃদ্ধ প্রদর্শনী ঘটে। এসব মেলা আমাদের ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে বহন করে নিয়ে যায়।

পোশাক, অলংকার ও বৈশাখের রঙিন আবহ-

পহেলা বৈশাখের আর এক চমৎকার দিক হলো পোশাক। পুরুষরা বাঙালির নিজস্ব পোশাক পাঞ্জাবি, পায়জামা বা লুঙ্গি পরে। মেয়েরা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, হাতে শাখা-চুড়ি পরার মধ্য দিয়ে বাঙালিয়ানার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটায়। শহরের রাস্তায় লাল-সাদা পাঞ্জাবি আর শাড়ির ঢেউ খেলে যায়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে ‘শুভ নববর্ষ’ আর ‘বৈশাখের শুভেচ্ছা’র বন্যায় ভেসে যায় ডিজিটাল পৃথিবীও। এ যেন এক বিশাল সামাজিক বন্ধনের অনুষ্ঠান।

চ্যালেঞ্জ ও বাণিজ্যিকীকরণ : আধুনিকতার ছোঁয়ায় সংকট-

ঐতিহ্যের ধারাকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে পহেলা বৈশাখ আজ কিছু জটিলতার মুখোমুখি। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো দিনটিকে বিশাল বিপণনের প্ল্যাটর্ফম বানিয়ে ফেলেছে। ‘বৈশাখী সেল’, ‘বৈশাখী থিম পার্টি’র আড়ম্বরের মধ্যে মূল অনুভব হারিয়ে যাচ্ছে। পান্তা-ইলিশের বদলে রেস্তোরাঁয় প্ল্যাটার ডিনার, মাটির হাঁড়ির বদলে প্লাস্টিকের গ্লাস পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে। অধিকাংশ শহুরে মানুষ এখন আর গান বোনা, নাগরদোলা কিংবা বৈশাখী মেলার প্রকৃত আমেজ অনুভব করতে পারে না। তবে এর মধ্যেও কিছু উদ্যোগ— যেমন ‘মেলা আয়োজনে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ’, ‘পরিবেশবান্ধব সাজসজ্জা’, ‘স্থানীয় শিল্পীদের উৎসাহ’ এসব ইতিবাচক দিক আশার আলো দেখাচ্ছে।

পহেলা বৈশাখের ভবিষ্যৎ : চিরায়ত বনাম পরিবর্তন-

ভবিষ্যতে পহেলা বৈশাখ টিকে থাকবে এবং বাঙালির আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে— এটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের কর্তব্য, এর মূল উপাদান— লোকজ শিল্প, গ্রামীণ সংস্কৃতি, কৃষিভিত্তিক উৎসবের চেতনা যেন আধুনিকতার নামে হারিয়ে না যায়। বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। মিডিয়া শুধু বাণিজ্যিক না করে যেন গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন, গ্রামের মেলার আয়োজন এবং লুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য তুলে ধরে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ যেন পরিবেশবান্ধব, সার্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে নিজের ভিত্তি মজবুত করে।

পহেলা বৈশাখ শুধু ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়; এটি বাঙালির অহংকার, তার হাজার বছরের লালিত চেতনার আরেক নাম। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমরা কে, আমাদের শিকড় কোথায়, আমাদের শক্তি ও সাহসের উৎস কী? বাংলার কৃষক, জেলে, তাঁতি, মাঝি, গায়ক, শিল্পী সবাই মিলে যে বাঙালি জাতি গড়ে তুলেছে, পহেলা বৈশাখ তার পুনরুজ্জীবনের মন্ত্র পাঠ করে। আমাদের দায়িত্ব হবে এই উৎসবকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে গিয়ে যেন এর মূল সুর হারিয়ে না যায়। সব বর্ণ, ধর্ম ও বয়সের মানুষ যখন রমনা বটমূলে একসঙ্গে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ গায়, তখন সত্যিই পৃথিবীর আর কোনো উৎসব হয়ত বাঙালির এই একতা ও সৌন্দর্যকে ছুঁতে পারে না।

শুভ নববর্ষ। চিরায়ত হোক বাঙালির বৈশাখ, চির উজ্জ্বল হোক আমাদের ঐতিহ্য।

লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন