জ্বালানি সংকট এখন আর কোনো দেশের একক সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট বেড়ে চলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কার্যকর, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেয়া এখন সময়ের দাবি।
সম্প্রতি জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকারি ভাবে কিছু প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে- যেমন, সাপ্তাহিক ছুটি তিন দিনে উন্নীত করা এবং স্কুলে অনলাইন ক্লাস চালু করা। তবে গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাপক ক্ষতিকর।
প্রথমত, সাপ্তাহিক ছুটি তিন দিন করা হলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেওয়া উৎপাদনশীলতা হ্রাসের কারণ হতে পারে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে নিয়মিত কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। তিন দিনের ছুটি মানুষের মধ্যে কর্মবিমুখতা তৈরি করতে পারে এবং শিল্প-কারখানা ও সেবা খাতে ধীরগতি আনতে পারে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে কাজের দিন না কমিয়ে বরং সময় ব্যবস্থাপনাকে দক্ষ করে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস চালু করার প্রস্তাব বাস্তবতার সঙ্গে মোটেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলে এখনো নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা, পর্যাপ্ত ডিভাইস এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। অনলাইন শিক্ষার জন্য যে অবকাঠামো দরকার, তা এখনও সবার কাছে সমান ভাবে পৌঁছেনি। ফলে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা আদৌ সম্ভব হবে না।
শুধু তাই নয়, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকেও এটি ক্ষতিকর। দীর্ঘ সময় মোবাইল বা স্ক্রিনের সামনে থাকলে চোখের সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মনোযোগের ঘাটতি তৈরি হয়। পাশাপাশি মোবাইল আসক্তি বাড়ার ঝুঁকি থাকে, যা তাদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। সামাজিক মেলামেশা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই অনলাইন ক্লাস কোনো ভালো সমাধান নয়।
এর পরিবর্তে একটি কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে- দিনের আলোকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা। বিজ্ঞানসম্মত ভাবে প্রমাণিত, মানুষের শরীরের জৈবিক ঘড়ি (পরৎপধফরধহ ৎযুঃযস) সূর্যের আলো অনুযায়ী কাজ করে। সকালে কাজ শুরু করলে শরীর ও মস্তিষ্ক বেশি সক্রিয় থাকে, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং রাতে দ্রুত ঘুম আসে, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
সুতরাং স্কুলে মর্নিং শিফট চালু করা যেতে পারে- সকাল ৭টায় ক্লাস শুরু এবং অফিস-আদালত সকাল ৮টায় শুরু করে বিকেল ৪টার মধ্যে শেষ করা যেতে পারে। এতে দিনের আলো বেশি ব্যবহার করা যাবে, বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে এবং মানুষের জীবনযাত্রা অধিক স্বাস্থ্যকর হবে।
রাত ৮টার পর শপিংমল ও অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত যৌক্তিক। বর্তমানে দেখা যায়, অপ্রয়োজনীয় ভাবে গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা হয়, আলো জ্বালিয়ে আড্ডা দেওয়া হয়, যা বিদ্যুতের অপচয় ঘটায়। অথচ দিনের বেলায় অনেক দোকান দেরিতে খোলা হয়, ফলে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহারের সুযোগ নষ্ট হয়। এই অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে।
একই ভাবে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা সজ্জায় অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বন্ধ করা, সাইনবোর্ডে অপ্রয়োজনীয় আলোর ব্যবহার সীমিত করা দরকার। এসব পদক্ষেপ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও অপচয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, অপচয়কারী শয়তানের ভাই। অর্থাৎ, অপ্রয়োজনীয় ভাবে সম্পদ নষ্ট করা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, নৈতিক দিক থেকেও ভুল। তাই জ¦ালানি সাশ্রয় শুধু একটি অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও।
তবে শুধু নিয়ম তৈরি করলেই হবে না- তা কার্যকর ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আইন কঠোর ভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং জনগণকে সচেতন করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে, আজকের সাশ্রয়ই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। অপ্রয়োজনীয় মোটরসাইকেল ব্যবহার, অকারণে আলো জ্বালিয়ে রাখা- এসব অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় আমাদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যা বাস্তবসম্মত, বিজ্ঞানসম্মত এবং সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে উপকারী। তিন দিনের ছুটি বা অনলাইন ক্লাসের মতো অকার্যকর পদক্ষেপের পরিবর্তে সময় ব্যবস্থাপনা সচেতনতা এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই হতে পারে টেকসই সমাধান।
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

